বিদ্যুৎ আসার পর একসঙ্গে সব যন্ত্র চালালে কী হতে পারে?
লোডশেডিংয়ের পর একসঙ্গে সব যন্ত্র চালু না করে ধাপে ধাপে চালু করা নিরাপদ
লোডশেডিংয়ের পর বিদ্যুৎ ফিরে এলে স্বাভাবিকভাবেই স্বস্তি আসে। অনেকেই তখন একসঙ্গে ফ্রিজ, এসি, টিভি, কম্পিউটার, পানির পাম্প, ওয়াশিং মেশিনসহ প্রয়োজনীয় সব বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালু করে দেন। কিন্তু বিদ্যুৎ আসার সঙ্গে সঙ্গে এভাবে একসঙ্গে সব যন্ত্র চালু করা সবসময় নিরাপদ নয়। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার পর সরবরাহ ফিরে এলে ভোল্টেজের অস্বাভাবিক ওঠানামা বা পাওয়ার সার্জের ঝুঁকি থাকতে পারে। এতে ঘরের বৈদ্যুতিক সার্কিটে অতিরিক্ত চাপ পড়ার পাশাপাশি সংবেদনশীল যন্ত্রপাতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। Power Grid Bangladesh-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ আগস্ট রাত ৮টায় জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৩০৫ মেগাওয়াট, সরবরাহ ছিল ১৬ হাজার ৩৯২ মেগাওয়াট এবং লোডশেডিং ছিল ৯১৩ মেগাওয়াট। এর আগে একই দিনে সন্ধ্যা ৭টায় লোডশেডিং ১ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল।
এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর কিছুটা ধৈর্য ধরে যন্ত্রপাতি চালু করাই নিরাপদ।
একসঙ্গে সব যন্ত্র চালালে কী হতে পারে?
একটি বাসার বৈদ্যুতিক সংযোগের নির্দিষ্ট লোড বহনের ক্ষমতা থাকে। ফ্রিজ, এসি, পানির পাম্প, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ও ইলেকট্রিক ওভেনের মতো যন্ত্র একসঙ্গে চালু হলে মোট বিদ্যুৎ চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে মোটর ও কম্প্রেসরযুক্ত যন্ত্র চালু হওয়ার মুহূর্তে স্বাভাবিক চলমান অবস্থার তুলনায় বেশি কারেন্ট প্রয়োজন হতে পারে। ফলে একই সার্কিটে একাধিক উচ্চক্ষমতার যন্ত্র একসঙ্গে চালু হলে সার্কিট ব্রেকার ট্রিপ করতে পারে বা তার ও সংযোগ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিবার বিদ্যুৎ আসার পর একসঙ্গে কয়েকটি যন্ত্র চালালেই অবশ্যই দুর্ঘটনা ঘটবে। ঝুঁকি নির্ভর করে বাসার বৈদ্যুতিক সংযোগের ক্ষমতা, তারের মান, সার্কিট ব্রেকার এবং একই সার্কিটে কতগুলো যন্ত্র যুক্ত রয়েছে তার ওপর।
ফ্রিজ ও এসির ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা কেন?
ফ্রিজ ও এসির মতো কম্প্রেসরচালিত যন্ত্র বিদ্যুৎ ফিরে আসার সময় বিশেষভাবে বিবেচনা করা উচিত। কম্প্রেসর চালু হওয়ার সময় অতিরিক্ত স্টার্টিং কারেন্ট প্রয়োজন হতে পারে। বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর সরবরাহ স্থিতিশীল না থাকলে বা আবার দ্রুত বিদ্যুৎ চলে গেলে যন্ত্রটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
এ কারণে বিদ্যুৎ ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিজ, এসি ও পানির পাম্প একসঙ্গে চালু না করে ধীরে ধীরে চালু করা ভালো। যেসব যন্ত্রে নিজস্ব compressor delay বা protection system রয়েছে, সেটিকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া উচিত।
বিশেষ করে এসির ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর কয়েক মিনিটের ডিলে দেখা গেলে সেটিকে জোর করে বারবার চালু করার চেষ্টা করা উচিত নয়।
টিভি ও কম্পিউটারেও ক্ষতির আশঙ্কা আছে
বিদ্যুৎ ফিরে আসার সময় শুধু উচ্চক্ষমতার যন্ত্র নয়, টিভি, কম্পিউটার, রাউটার, মনিটর ও অন্যান্য সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক যন্ত্রও ঝুঁকিতে থাকতে পারে।
Electrical Safety Foundation International (ESFI) বলছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পর সরবরাহ ফিরে এলে পাওয়ার সার্জ টিভি, বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র এবং হিটিং ও এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেমের ক্ষতি করতে পারে। সংস্থাটি পাওয়ার সার্জকে অল্প সময়ের জন্য তৈরি হওয়া অতিরিক্ত ভোল্টেজ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে, যা ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ক্ষতি, কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া বা সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়ার কারণ হতে পারে।
তাই কম্পিউটারে গুরুত্বপূর্ণ কাজ চললে UPS ব্যবহার করা এবং বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর সরবরাহ স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্র চালু না করাই ভালো।
সার্কিট ব্রেকার ট্রিপ করতে পারে
একসঙ্গে অনেক উচ্চক্ষমতার যন্ত্র চালু করলে বাসার সার্কিটে নির্ধারিত ক্ষমতার বেশি কারেন্ট প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তখন সার্কিট ব্রেকার নিরাপত্তার জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে।
অনেকেই এটিকে যন্ত্র নষ্ট হওয়ার লক্ষণ মনে করেন। আসলে সার্কিট ব্রেকার ট্রিপ করা অনেক ক্ষেত্রে একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা, যা অতিরিক্ত কারেন্টের কারণে তার বা সার্কিট অতিরিক্ত গরম হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে।
তবে বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর বারবার ব্রেকার ট্রিপ করলে বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। কোন সার্কিটে অতিরিক্ত লোড হচ্ছে তা শনাক্ত করতে দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ানের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ ফিরে এলে কোন যন্ত্র আগে চালাবেন?
বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর প্রথমেই সবকিছু একসঙ্গে চালু না করে ধাপে ধাপে এগোনো ভালো।
প্রথমে একটি বা দুটি সাধারণ লাইট কিংবা ফ্যান চালিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক আছে কি না লক্ষ্য করুন। যদি আলো অস্বাভাবিকভাবে কম-বেশি না হয় এবং বিদ্যুৎ স্থিতিশীল থাকে, এরপর প্রয়োজনীয় রাউটার বা অন্যান্য ছোট যন্ত্র চালু করা যেতে পারে।
এরপর টিভি, কম্পিউটার বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্র চালু করুন। তারপর ফ্রিজ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্র চালু করা যেতে পারে। সবশেষে এসি, পানির পাম্প, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ বা অন্য উচ্চক্ষমতার যন্ত্রগুলো একে একে চালু করা ভালো।
এভাবে চালু করলে একই মুহূর্তে বাসার বৈদ্যুতিক লাইনে বড় ধরনের লোড পড়ার ঝুঁকি কমে।
বিদ্যুৎ বারবার আসা-যাওয়া করলে কী করবেন?
যদি বিদ্যুৎ ফিরে আসার কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক মিনিটের মধ্যেই আবার চলে যায়, তাহলে যন্ত্রপাতি চালু করার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া দরকার।
এমন পরিস্থিতিতে টিভি, কম্পিউটার ও অন্যান্য সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক যন্ত্রের প্লাগ খুলে রাখা যেতে পারে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার পর আবার সংযোগ দেওয়া নিরাপদ হতে পারে।
ESFI-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ফিরে আসার সময় surge থেকে ইলেকট্রনিক যন্ত্র সুরক্ষার জন্য Surge Protective Device বা SPD ব্যবহার করা যেতে পারে। কম্পিউটার ও গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ক্ষেত্রে UPS-ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় আকস্মিক বন্ধ হয়ে যাওয়া থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।
ফ্রিজের ক্ষেত্রে দরজা বন্ধ রাখুন
দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের পর বিদ্যুৎ ফিরে আসা পর্যন্ত ফ্রিজের দরজা অপ্রয়োজনে খোলা উচিত নয়। এতে ভেতরের ঠান্ডা দীর্ঘ সময় ধরে রাখা সম্ভব হয়।
বিদ্যুৎ ফিরে আসার পরও সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিজের দরজা খুলে খাবারের অবস্থা পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই। ফ্রিজ স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হতে কিছুটা সময় নিতে পারে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় খাবারের নিরাপত্তার জন্য দরজা যতটা সম্ভব বন্ধ রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় ভুল—সবকিছু একসঙ্গে চালু করা
লোডশেডিংয়ের পর অনেক পরিবারের সাধারণ দৃশ্য হলো—বিদ্যুৎ আসার সঙ্গে সঙ্গে কেউ এসি চালাচ্ছেন, কেউ পানির পাম্প, কেউ ফ্রিজ, আবার একই সময়ে টিভি, কম্পিউটার ও ওয়াশিং মেশিনও চালু হচ্ছে। এতে বাসার মোট বিদ্যুৎ চাহিদা মুহূর্তেই অনেক বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে পুরোনো বাড়ির তার, দুর্বল সংযোগ বা অপর্যাপ্ত সার্কিট ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে। তাই বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর অন্তত কিছুটা সময় নিয়ে একে একে যন্ত্র চালু করা নিরাপদ অভ্যাস।
মনে রাখুন সহজ নিয়ম
বিদ্যুৎ ফিরে এলে মনে রাখুন—‘একসঙ্গে নয়, একে একে।’
প্রথমে সাধারণ আলো ও ফ্যান দিয়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি দেখুন। এরপর প্রয়োজনীয় ছোট যন্ত্র চালু করুন। তারপর টিভি ও কম্পিউটারের মতো ইলেকট্রনিক যন্ত্র এবং সবশেষে এসি, পানির পাম্প ও অন্যান্য উচ্চক্ষমতার যন্ত্র চালু করুন।
যদি বিদ্যুৎ বারবার আসা-যাওয়া করে বা ভোল্টেজ অস্বাভাবিক মনে হয়, তাহলে সংবেদনশীল যন্ত্র চালু না করাই ভালো।
শেষ কথা
বিদ্যুৎ আসার পর একসঙ্গে সব যন্ত্র চালু করলে প্রতিবারই যে বড় ধরনের ক্ষতি হবে, এমন নয়। তবে একসঙ্গে অনেক উচ্চক্ষমতার যন্ত্র চালু করলে বাসার বৈদ্যুতিক সার্কিটে অতিরিক্ত লোড, সার্কিট ব্রেকার ট্রিপ, ভোল্টেজের সমস্যা এবং বিদ্যুৎ ফিরে আসার সময় পাওয়ার সার্জের কারণে যন্ত্রপাতির ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাই লোডশেডিংয়ের পর বিদ্যুৎ ফিরে এলে তাড়াহুড়া না করে ধাপে ধাপে যন্ত্রপাতি চালু করাই সবচেয়ে নিরাপদ অভ্যাস। বিশেষ করে এসি, ফ্রিজ, পানির পাম্প ও ওয়াশিং মেশিনের মতো উচ্চক্ষমতার যন্ত্র একসঙ্গে না চালিয়ে পর্যায়ক্রমে চালু করলে ঘরের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার ওপর আকস্মিক চাপ কমানো সম্ভব।
বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের সময়ে লোডশেডিং হয়তো সবসময় নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়, কিন্তু বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর নিজের ঘরের যন্ত্রপাতি কীভাবে ব্যবহার করবেন—সেটি অনেকটাই নিজের হাতে। সামান্য সতর্কতাই বড় ধরনের ক্ষতি ও অপ্রয়োজনীয় খরচ থেকে পরিবারকে রক্ষা করতে পারে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
