দায়রা: অপরাধের গল্পে আইন নৈতিকতার কঠিন প্রশ্ন

প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৪৪ অপরাহ্ণ
দায়রা: অপরাধের গল্পে আইন নৈতিকতার কঠিন প্রশ্ন

মেঘনা গুলজারের ‘দায়রা’ সিনেমায় অপরাধের তদন্তের পাশাপাশি আইন, নৈতিকতা ও ন্যায়বিচারের জটিল দ্বন্দ্ব তুলে ধরা হয়েছে।

এক তরুণীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। এরপর সামনে আসে ভয়াবহ এক অপরাধ। ঘটনাটি ঘিরে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। সাধারণ মানুষের দাবি ওঠে অপরাধীর কঠোর শাস্তির। কিন্তু তদন্ত যত এগোয়, ততই বদলে যেতে থাকে ঘটনার সরল হিসাব। অপরাধীর সন্ধানের পাশাপাশি সামনে আসে পুলিশ এনকাউন্টার, অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্দেহভাজন এবং বিচারব্যবস্থার নানা জটিল প্রশ্ন। এমনই এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি দর্শককে দাঁড় করিয়েছে মেঘনা গুলজারের নতুন সিনেমা ‘দায়রা’।

অপরাধ, তদন্ত, আইন, নৈতিকতা ও বিচারব্যবস্থার টানাপোড়েন নিয়ে নির্মিত এই ইনভেস্টিগেটিভ ক্রাইম থ্রিলার শুধু একটি অপরাধের রহস্য উন্মোচনের গল্প নয়। তদন্তের পথে আইন এবং ব্যক্তিগত নৈতিকতার যে সংঘাত তৈরি হয়, ধীরে ধীরে সেটিই হয়ে ওঠে গল্পের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

‘দায়রা’র গল্প শুরু হয় এক তরুণীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা দিয়ে। পরে সামনে আসে ভয়াবহ একটি অপরাধ। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে তৈরি হয় তীব্র ক্ষোভ। তদন্তের দায়িত্ব পড়ে পুলিশের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডিপিসি আজুনি কোহলি ও ডিপিসি রমন কুমারের ওপর। দুজনের লক্ষ্য একই—সত্য উদ্‌ঘাটন করা এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা। কিন্তু সেই সত্যে পৌঁছানোর পথ নিয়ে তাদের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন।

কারিনা কাপুর খান অভিনীত আজুনি কোহলি একজন শান্ত, সংযত ও অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তা। আইনি প্রক্রিয়ার ওপর তার দৃঢ় আস্থা। তার বিশ্বাস, অপরাধ যত ভয়াবহই হোক, তদন্তকারীকে আইনের নির্ধারিত সীমার মধ্যেই থাকতে হবে। কারণ আইনকে পাশ কাটিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত নতুন অন্যায়ের জন্ম দিতে পারে।

অন্যদিকে পৃথ্বীরাজ সুকুমারনের অভিনীত রমন কুমারের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বেশি কঠোর। ভয়াবহ অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত ও কঠোর শাস্তির পক্ষে তিনি। তার কাছে ন্যায়বিচার শুধু দীর্ঘ আদালত প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অপরাধের ভয়াবহতার সঙ্গে শাস্তির মাত্রারও সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

একই মামলার তদন্ত করতে গিয়ে তাই আজুনি ও রমনের অবস্থানের পার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হতে থাকে। তদন্ত যত এগোয়, মামলাটিও তত জটিল হয়ে ওঠে। সামনে আসে একটি বিতর্কিত পুলিশ এনকাউন্টার এবং এক অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্দেহভাজনের সম্পৃক্ততার বিষয়।

এ পর্যায়ে গল্পের প্রশ্নগুলো আরও কঠিন হয়ে ওঠে। গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত কেউ অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে তার জন্য আইনের বিশেষ সুরক্ষা কীভাবে প্রযোজ্য হবে? অপরাধের ভয়াবহতা কি বয়সসংক্রান্ত আইনি বিধানের বাইরে যাওয়ার কারণ হতে পারে? নাকি অপরাধ যত গুরুতরই হোক, বিচারব্যবস্থার নির্ধারিত নিয়ম সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য থাকবে?

এসব প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই দুই পুলিশ কর্মকর্তার দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়। একজনের কাছে আইন ও প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত, অন্যজন অপরাধের ভয়াবহতার সঙ্গে কঠোর ও দ্রুত ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয়তাকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে তদন্তের প্রতিটি ধাপ শুধু অপরাধের রহস্যের নতুন স্তর উন্মোচন করে না, দুই চরিত্রের বিশ্বাসকেও কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করায়।

‘দায়রা’র গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সিনেমাটি এসব প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে না। বরং একটি অপরাধের তদন্তের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র, আইন, নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সংঘাতকে সামনে আনে।

সিনেমাটির গল্পের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার যোগসূত্র নিয়েও আলোচনা রয়েছে। শুরুতে অনেকে ধারণা করেছিলেন, ২০১৯ সালের হায়দরাবাদ ধর্ষণ মামলা এবং পরবর্তী বিতর্কিত পুলিশ এনকাউন্টার হয়তো সিনেমাটির মূল অনুপ্রেরণা। তবে নির্মাতা মেঘনা গুলজার ভারতীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘দায়রা’ কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়নি। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘটে যাওয়া একাধিক বাস্তব ঘটনা, অপরাধ ও আইনি জটিলতার প্রভাব রয়েছে গল্পে।

তাই ‘দায়রা’কে কোনো একটি মামলা বা ঘটনার পুনর্নির্মাণ হিসেবে দেখার চেয়ে বাস্তব জীবনের নানা ঘটনার ভেতর থেকে উঠে আসা বৃহত্তর কিছু প্রশ্নের সিনেমাটিক অনুসন্ধান হিসেবে দেখা যায়। সেই প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে—একটি অপরাধের বিচার করতে গিয়ে রাষ্ট্র, আইন ও ব্যক্তির নৈতিক অবস্থান কোথায় এসে মিলিত হয়?

মেঘনা গুলজারের নির্মাণে বাস্তব ঘটনা, সামাজিক সংকট এবং ব্যক্তিমানুষের দ্বন্দ্ব আগেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ‘দায়রা’তেও কারিনা কাপুর খান ও পৃথ্বীরাজ সুকুমারনের চরিত্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব তাই শুধু দুই পুলিশ কর্মকর্তার মতপার্থক্য নয়; এটি দুটি ভিন্ন বিচারদর্শনের সংঘাত।

একদিকে রয়েছে প্রমাণ, আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া। অন্যদিকে রয়েছে দ্রুত বিচার, কঠোর শাস্তি এবং অপরাধের ভয়াবহতার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। দুজনই নিজেদের অবস্থান থেকে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে চান। আর সেই জায়গাতেই সিনেমাটি দর্শকের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে যায়—ন্যায়ের পথ কি সবার কাছে একই?

গল্প যত এগোয়, দর্শকের প্রশ্নও বদলে যেতে পারে। শুরুতে অপরাধীকে খুঁজে বের করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও পরে সামনে আসে আরও বড় প্রশ্ন—অপরাধী কে, সেটিই কি সব? নাকি তাকে বিচারের মুখোমুখি করার প্রক্রিয়াটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ? ‘দায়রা’ সেই উত্তর নির্দিষ্ট করে না দিয়ে সিদ্ধান্তের জায়গাটি দর্শকের কাছেই রেখে দেয়।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page