লোডশেডিংয়ের সময় AC চালানো কি নিরাপদ?

প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ৭:১৪ অপরাহ্ণ
লোডশেডিংয়ের সময় AC চালানো কি নিরাপদ?

লোডশেডিংয়ের পর বিদ্যুৎ ফিরে এলে AC চালানোর আগে সতর্কতা জরুরি

দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে গরমের মধ্যে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার পর হঠাৎ বিদ্যুৎ ফিরে এলে অনেকেই স্বস্তি পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে এসি চালু করে দেন। কিন্তু বিদ্যুৎ যদি স্থিতিশীল না থাকে বা কিছুক্ষণ পরপর আবার চলে যায়, তাহলে এসি চালানোর ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

লোডশেডিংয়ের সময় এসি একেবারেই চালানো যাবে না—বিষয়টি এমন নয়। তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল না থাকলে এসি চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ এসির কম্প্রেসর চালু হওয়ার সময় তুলনামূলক বেশি কারেন্ট প্রয়োজন হয়। আবার বিদ্যুৎ ফিরে আসার সময় ভোল্টেজ সার্জ বা ভোল্টেজ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকলে এসির বৈদ্যুতিক অংশ ও কম্প্রেসরের ওপর চাপ পড়তে পারে। Electrical Safety Foundation International (ESFI) জানিয়েছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পর সরবরাহ ফিরে এলে সার্জের কারণে টিভি, বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র এবং এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তাই লোডশেডিংয়ের সময় এসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম জানা জরুরি।

লোডশেডিংয়ের সময় এসি চালানো কি নিরাপদ?

যদি বাসায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল থাকে এবং এসির জন্য প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবে এসি ব্যবহার করা যায়। কিন্তু বিদ্যুৎ যখন ঘন ঘন আসা-যাওয়া করছে, তখন এসি চালু রেখে দেওয়া ভালো নয়।

বিশেষ করে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক মিনিটের মধ্যে আবার ফিরে এসে আবার চলে গেলে এসির কম্প্রেসর বারবার চালু হওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এ ধরনের দ্রুত পুনরারম্ভ কম্প্রেসরের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

Carrier-এর তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক অনেক এসিতে কম্প্রেসরকে খুব দ্রুত পুনরায় চালু হওয়া থেকে রক্ষা করতে ৩ থেকে ৫ মিনিটের বিল্ট-ইন ডিলে থাকে। এই ডিলে কম্প্রেসরের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করে।

তাই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর এসি সঙ্গে সঙ্গে চালু করার জন্য বারবার রিমোট চাপার প্রয়োজন নেই।

বিদ্যুৎ ফিরে আসার সময় ঝুঁকি কেন বাড়ে?

অনেকেই মনে করেন, বিদ্যুৎ চলে যাওয়াই এসির জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা। কিন্তু বাস্তবে বিদ্যুৎ ফিরে আসার সময়ও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধারের সময় ভোল্টেজে অস্বাভাবিকতা বা সাময়িক পাওয়ার সার্জ হতে পারে। ESFI-এর মতে, পাওয়ার সার্জ হলো স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে হঠাৎ বেড়ে যাওয়া ভোল্টেজ, যা ইলেকট্রনিক ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ক্ষতি করতে পারে। এমনকি বড় বৈদ্যুতিক যন্ত্র, যেমন এয়ার কন্ডিশনার চালু ও বন্ধ হওয়ার সময়ও সার্জ তৈরি হতে পারে।

এই কারণে বিদ্যুৎ ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে এসি চালু করার পরিবর্তে আগে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল হয়েছে কি না দেখা ভালো।

এসির কম্প্রেসর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

এসি ঠান্ডা করার প্রধান কাজটি করে কম্প্রেসর। কম্প্রেসর চালু হওয়ার সময় স্বাভাবিক চলার তুলনায় বেশি স্টার্টিং কারেন্ট প্রয়োজন হতে পারে।

Samsung-এর সাম্প্রতিক সাপোর্ট তথ্য অনুযায়ী, কিছু এসি মডেলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পর কম্প্রেসর পুনরায় চালু হতে প্রায় ৩ মিনিট সময় নেয়। এটি কম্প্রেসর সুরক্ষার জন্য তৈরি করা একটি স্বাভাবিক ডিলে ব্যবস্থা।

অন্যদিকে Samsung-এর তথ্যেই বলা হয়েছে, ভোল্টেজের ওঠানামা থেকে এসিকে সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজন অনুযায়ী ভোল্টেজ স্ট্যাবিলাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে স্ট্যাবিলাইজার প্রয়োজন কি না এবং কোন ধরনের ডিভাইস ব্যবহার করা উচিত, তা স্থানীয় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও এসির মডেলের ওপর নির্ভর করে।

বিদ্যুৎ বারবার আসা-যাওয়া করলে কী করবেন?

যদি আপনার এলাকায় বিদ্যুৎ কয়েক মিনিট পরপর চলে যায় এবং আবার আসে, তাহলে এসি বন্ধ রাখাই ভালো। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ফিরে আসার পরও যদি আলো অস্বাভাবিকভাবে কম-বেশি হতে দেখা যায়, তখন এসি চালু করার তাড়া দেওয়া উচিত নয়।

এ অবস্থায় এসির পাওয়ার সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখাও বিবেচনা করা যেতে পারে। Samsung-এর নির্দেশনায়ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ক্ষেত্রে পাওয়ার ফিরে আসার সময় সম্ভাব্য প্রভাব থেকে ইলেকট্রনিক যন্ত্র রক্ষার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী আউটলেট থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথা বলা হয়েছে।

তবে স্থায়ীভাবে মেইন সংযোগ পরিবর্তন বা বৈদ্যুতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ অবশ্যই দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ানের মাধ্যমে করা উচিত।

বিদ্যুৎ ফিরে এলে কতক্ষণ পর AC চালাবেন?

সবার জন্য একই সময় নির্ধারণ করা ঠিক নয়। কারণ বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও মডেলের এসিতে আলাদা সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকতে পারে।

তবে বিদ্যুৎ ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে এসি চালু না করে আগে কিছুক্ষণ বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল কি না লক্ষ্য করা ভালো। অনেক আধুনিক এসিতে নিজস্ব কম্প্রেসর ডিলে থাকে। তাই এসি চালু করার পর সঙ্গে সঙ্গে কম্প্রেসর না চললেও আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

কিছু মডেলে প্রায় ৩ মিনিট এবং কিছু সিস্টেমে ৩–৫ মিনিট পর্যন্ত ডিলে স্বাভাবিক হতে পারে।

সবচেয়ে ভালো হলো আপনার নির্দিষ্ট এসির ব্যবহারবিধিতে দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করা।

এসি চালু করার পর বারবার বন্ধ করবেন না

বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার পর এসি চালু করলে সেটিকে অল্প সময় পরপর রিমোট দিয়ে বন্ধ ও চালু করার অভ্যাসও এড়িয়ে চলা ভালো।

কারণ এসির কম্প্রেসর বারবার চালু ও বন্ধ হলে সিস্টেমের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। ESFI-এর তথ্য অনুযায়ী, বড় বৈদ্যুতিক লোডের অন-অফের সময় পাওয়ার সার্জ তৈরি হতে পারে এবং বারবার ছোট সার্জ দীর্ঘমেয়াদে বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ক্ষতি বা আয়ু কমিয়ে দিতে পারে।

তাই ঘর ঠান্ডা করতে এসি ব্যবহার করলে প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত তাপমাত্রায় চালিয়ে রাখা এবং অযথা বারবার অন-অফ না করাই ভালো।

ভোল্টেজ ওঠানামা করলে কী করবেন?

এসি চালু করার পর যদি লাইট অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, এসি বারবার বন্ধ হয়ে যায়, সার্কিট ব্রেকার ট্রিপ করে, পোড়া গন্ধ পাওয়া যায় বা অস্বাভাবিক শব্দ হয়, তাহলে এসি বন্ধ করে দিন।

Samsung-এর সাম্প্রতিক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এসি চালু করার সময় সার্কিট ব্রেকার ট্রিপ করার অন্যতম কারণ হতে পারে উচ্চ স্টার্টিং কারেন্ট, বৈদ্যুতিক ওভারলোড, তারের সমস্যা বা এসির অভ্যন্তরীণ ত্রুটি।

এ ধরনের সমস্যা বারবার হলে নিজে এসি খুলে পরীক্ষা না করে দক্ষ টেকনিশিয়ানের সাহায্য নেওয়া উচিত।

স্ট্যাবিলাইজার বা Surge Protection কি দরকার?

এটি আপনার এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং এসির নির্দিষ্ট মডেলের ওপর নির্ভর করে। যদি এলাকায় নিয়মিত ভোল্টেজ ওঠানামা করে, তাহলে উপযুক্ত ভোল্টেজ সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে।

তবে বাজার থেকে যেকোনো স্ট্যাবিলাইজার কিনে ব্যবহার করা উচিত নয়। এসির ক্ষমতা, ভোল্টেজ রেঞ্জ ও প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী সঠিক ডিভাইস নির্বাচন করা প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

এ ছাড়া Surge Protective Device (SPD) ব্যবহার করা যেতে পারে। ESFI বলছে, সঠিক surge protection ব্যবস্থা পাওয়ার সার্জের কারণে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

লোডশেডিংয়ের সময় AC ব্যবহারের সহজ নিয়ম

লোডশেডিং শুরু হলে এসি বন্ধ রাখুন। বিদ্যুৎ ফিরে এলে সঙ্গে সঙ্গে আবার চালু না করে সরবরাহ স্থিতিশীল কি না দেখুন। এসিতে নিজস্ব compressor delay থাকলে সেটিকে কাজ করার সুযোগ দিন। বিদ্যুৎ বারবার আসা-যাওয়া করলে এসি চালু না রাখাই ভালো।

আর যদি ভোল্টেজ অস্বাভাবিক মনে হয়, সার্কিট ব্রেকার বারবার ট্রিপ করে বা এসি থেকে অস্বাভাবিক শব্দ ও গন্ধ আসে, তাহলে ব্যবহার বন্ধ করে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিন।

শেষ কথা

লোডশেডিংয়ের সময় এসি চালানো সব পরিস্থিতিতে বিপজ্জনক নয়, কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহ অস্থিতিশীল থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার সময় ভোল্টেজ ওঠানামা বা পাওয়ার সার্জ হলে এসির কম্প্রেসর, কন্ট্রোল বোর্ড ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তাই বিদ্যুৎ চলে গেলে এসি বন্ধ রাখুন এবং বিদ্যুৎ ফিরে এলে তাড়াহুড়া করে চালু করবেন না। কিছুক্ষণ সরবরাহ স্থিতিশীল কি না লক্ষ্য করুন এবং এসির নিজস্ব সুরক্ষা ব্যবস্থাকে কাজ করার সুযোগ দিন। এলাকায় যদি নিয়মিত ভোল্টেজ ওঠানামা করে, তাহলে প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী উপযুক্ত ভোল্টেজ সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো—বিদ্যুৎ আসা মানেই সঙ্গে সঙ্গে এসি চালু করা নয়; আগে নিশ্চিত হতে হবে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল হয়েছে কি না। সামান্য এই সতর্কতাই এসির মতো দামি যন্ত্রকে অপ্রয়োজনীয় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page