একজনের নামে ৫টির বেশি সিম নয়! নতুন নিয়মে বদলে যাচ্ছে সিম ব্যবহারের হিসাব
নতুন নিয়মে একজনের নামে সিম ব্যবহারের সীমা ৫টিতে নামিয়ে আনার প্রস্তাব।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল সিমের অপব্যবহার, প্রতারণা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে একজন ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা আরও কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ১০টি ব্যক্তিগত সিম রাখতে পারলেও তা কমিয়ে পাঁচটিতে নামিয়ে আনার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে একজন গ্রাহক দুইটির বেশি সিম নিতে চাইলে পুলিশ ক্রাইম ডাটাবেজে তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও সামনে এসেছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় একজনের নামে সিমের সর্বোচ্চ সীমা ১০টি থেকে কমিয়ে পাঁচটিতে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি, একজন গ্রাহক একাধিক সিম নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থা করা হতে পারে। বিশেষ করে দুইটির বেশি সিমের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের তথ্য পুলিশ ক্রাইম ডাটাবেজে যাচাই করার প্রস্তাব রয়েছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—একটি সিম নেওয়ার পর একই গ্রাহক নতুন আরেকটি সিম নিতে চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন সংযোগ পাওয়ার সুযোগ নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাইয়ের জন্য প্রায় সাত দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। অর্থাৎ নতুন সিম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে শুধু বায়োমেট্রিক পরিচয় যাচাই নয়, অতিরিক্ত নিরাপত্তা যাচাইয়ের ব্যবস্থাও যুক্ত হতে পারে।
তবে বিষয়টি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। একজনের নামে পাঁচটি সিমের সীমা এখনো সাধারণ গ্রাহকের জন্য কার্যকর চূড়ান্ত নিয়ম হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। এর আগে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) একজনের এনআইডির বিপরীতে সর্বোচ্চ সিমের সংখ্যা ১৫ থেকে ১০টিতে নামিয়েছিল। পাঁচটিতে নামানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও ২০২৬ সালের শুরুতে নির্বাচন সামনে রেখে এর বাস্তবায়ন স্থগিত করার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
এর আগে ২০২৫ সালে ১৫টি থেকে ১০টি সিমে সীমা কমানোর সিদ্ধান্তের সময় বিটিআরসি জানিয়েছিল, অধিকসংখ্যক সিমের অপব্যবহার এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঠেকানো, গ্রাহকের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। তখন বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের অধিকাংশ গ্রাহকের কাছেই পাঁচটি বা তার কম সিম ছিল।
সিম ব্যবহারের সঙ্গে অপরাধের সম্পর্কের বিষয়টিও নতুন নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এর আগে বলা হয়েছিল, অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হওয়ায় প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে একজনের নামে নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা কমিয়ে আনার উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছিল।
তবে সিমের সংখ্যা কমিয়ে দিলেই সব ধরনের অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে টেলিযোগাযোগ খাতের পক্ষ থেকে ভিন্ন মতও রয়েছে। মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (এমটব) এর আগে এনআইডিপ্রতি পাঁচটি সিমে সীমা নামানোর খবরকে বিভ্রান্তিকর বলেছিল। সংগঠনটির মতে, শুধু সিমের সংখ্যা সীমিত করার পরিবর্তে গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, রিয়েল-টাইম নজরদারি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং উন্নত জালিয়াতি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা বেশি কার্যকর হতে পারে।
নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে যেসব গ্রাহকের নামে বর্তমানে পাঁচটির বেশি সিম নিবন্ধিত রয়েছে, তাদের ওপর। বিশেষ করে ব্যবসা, পরিবারের সদস্যদের ব্যবহার, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ইন্টারনেট ডিভাইস, রাউটার বা অন্যান্য প্রয়োজনের জন্য একাধিক সিম ব্যবহার করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নতুন নিয়মের প্রভাব পড়তে পারে।
এ ক্ষেত্রে গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে নিজের এনআইডির বিপরীতে বর্তমানে কতটি সিম নিবন্ধিত রয়েছে, তা আগে থেকেই যাচাই করে নেওয়া। কারণ অতিরিক্ত সিম থাকলে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সিম রেখে বাকিগুলো বন্ধ, ডি-রেজিস্ট্রেশন বা মালিকানা পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। আগের ১০টি সিমের সীমা কার্যকরের সময়ও অতিরিক্ত সিম ডি-রেজিস্ট্রেশন বা বন্ধ করার প্রক্রিয়া নিয়ে গ্রাহকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থার সারসংক্ষেপ হলো—একজনের এনআইডিতে সর্বোচ্চ পাঁচটি সিম রাখার সীমা, দুইটির বেশি সিম নেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাই এবং নতুন সিম নেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাইয়ের জন্য অপেক্ষার ব্যবস্থা। তবে এসব বিষয় চূড়ান্তভাবে কার্যকর করার আগে বিটিআরসি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা প্রয়োজন।
ফলে এখনই পাঁচটির বেশি সিম থাকা গ্রাহকদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। বরং নিজের নামে নিবন্ধিত সিমের সংখ্যা যাচাই করে অপ্রয়োজনীয় সংযোগ থাকলে তা ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা নিরাপদ। নতুন নিয়ম চূড়ান্ত হলে বিটিআরসি ও মোবাইল অপারেটরদের পক্ষ থেকে কার্যকর তারিখ, অতিরিক্ত সিমের ক্ষেত্রে করণীয় এবং নতুন সিম নিবন্ধনের বিস্তারিত প্রক্রিয়া জানানো হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে সিম নিবন্ধন ও ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে একের পর এক পরিবর্তন আসছে। ১৫টি থেকে ১০টি এবং এখন পাঁচটিতে নামানোর প্রস্তাব—পুরো প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হিসেবে সামনে রয়েছে গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিত করা, সিমের অপব্যবহার কমানো এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে মোবাইল সংযোগের ব্যবহার ঠেকানো। তবে নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগে চূড়ান্ত সরকারি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনাই গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হবে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল
