স্মার্টফোন বা কম্পিউটারে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে গিয়ে অনেকেই একটি বিষয় লক্ষ্য করেছেন—দিনের বেলায় যে সংযোগটি তুলনামূলক ধীরগতির মনে হয়, রাত গভীর হলে সেটিই অনেক দ্রুত কাজ করতে শুরু করে। ভিডিও দ্রুত লোড হয়, বড় ফাইল ডাউনলোডের গতি বেড়ে যায় এবং ওয়েবসাইটও আগের তুলনায় দ্রুত খোলে। কিন্তু কেন এমন হয়?
আসলে এর পেছনে রয়েছে ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের ব্যবহার পদ্ধতি, ব্যান্ডউইথ বণ্টন এবং ব্যবহারকারীদের অনলাইন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি প্রযুক্তিগত কারণ।
আরও পড়ুন-ইন্টারনেট ব্যবহার না করলেও কেন মোবাইল ডাটা দ্রুত শেষ হয়ে যায়?
ইন্টারনেট সেবাদাতারা নির্দিষ্ট পরিমাণ ব্যান্ডউইথ বা ডেটা পরিবহন সক্ষমতা নিয়ে কাজ করে। একটি এলাকায় হাজারো ব্যবহারকারী একই সময়ে অনলাইনে থাকলে সবাইকে সেই ব্যান্ডউইথ ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়। দিনের ব্যস্ত সময়ে, বিশেষ করে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ ব্যবহারকারীরা একসঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। ফলে নেটওয়ার্কের ওপর চাপ অনেক বেড়ে যায়।
সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত সময়কে সাধারণত ‘পিক আওয়ার’ বলা হয়। এ সময়ে অনেকে ভিডিও স্ট্রিমিং, অনলাইন গেমিং, ভিডিও কল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন। একই সঙ্গে স্মার্ট টিভি, মোবাইল, ল্যাপটপ ও অন্যান্য ডিভাইসও নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকে। ফলে অনেক এলাকায় ইন্টারনেটের গতি কিছুটা কমে যেতে পারে।
তবে রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। মধ্যরাতের পর ধীরে ধীরে অনেক ব্যবহারকারী অফলাইনে চলে যান। নেটওয়ার্কে চাপ কমে আসে এবং একই ব্যান্ডউইথ কমসংখ্যক ব্যবহারকারীর মধ্যে ভাগ হয়। ফলে প্রত্যেকে তুলনামূলক বেশি গতি পেতে পারেন।
ব্রডব্যান্ড সংযোগের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন বেশি লক্ষ করা যায়। কারণ একটি এলাকার অনেক গ্রাহক একই নেটওয়ার্ক অবকাঠামো ব্যবহার করেন। ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমে গেলে ডেটা আদান-প্রদানের গতি স্বাভাবিকভাবেই উন্নত হতে পারে।
মোবাইল ইন্টারনেটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা দেখা যায়। একটি মোবাইল টাওয়ার নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যবহারকারীকে সেবা দিতে পারে। দিনের ব্যস্ত সময়ে টাওয়ারের ওপর চাপ বেড়ে গেলে ইন্টারনেটের গতি কমতে পারে। কিন্তু গভীর রাতে ব্যবহারকারী কমে গেলে একই টাওয়ার থেকে দ্রুততর সংযোগ পাওয়া সম্ভব হয়।
আরেকটি কারণ হলো নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণ। অনেক ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান মধ্যরাতের পর বিভিন্ন প্রযুক্তিগত আপডেট, রাউটিং অপ্টিমাইজেশন বা নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনার কাজ সম্পন্ন করে। কিছু ক্ষেত্রে এসব কাজের পর সংযোগ আরও স্থিতিশীল ও দ্রুত মনে হতে পারে।
কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক (CDN) এবং ক্যাশিং প্রযুক্তিও এখানে ভূমিকা রাখে। জনপ্রিয় ভিডিও প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ওয়েবসাইটগুলো ব্যবহারকারীর কাছাকাছি সার্ভারে তথ্য সংরক্ষণ করে। যখন নেটওয়ার্কে চাপ কম থাকে, তখন এসব সার্ভার থেকে ডেটা দ্রুত সরবরাহ করা সম্ভব হয়।
তবে সব ক্ষেত্রেই যে রাতে ইন্টারনেট দ্রুত হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিছু এলাকায় উল্টো রাতেই গতি কমে যেতে পারে, বিশেষ করে যদি ওই সময়ে অনেক মানুষ ভিডিও স্ট্রিমিং বা বড় ফাইল ডাউনলোডে ব্যস্ত থাকেন। এছাড়া রাউটারের মান, ওয়াই-ফাই সিগন্যাল, ডিভাইসের সক্ষমতা এবং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর ওপরও গতি নির্ভর করে।
অনেক ব্যবহারকারী মনে করেন ইন্টারনেট কোম্পানিগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে দিনের বেলায় গতি কমিয়ে দেয়। বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিষয়টি নেটওয়ার্কের ব্যবহারকারীর সংখ্যা এবং ব্যান্ডউইথ বণ্টনের সঙ্গে সম্পর্কিত। একই নেটওয়ার্কে যত বেশি ব্যবহারকারী সক্রিয় থাকবেন, সবার জন্য উপলব্ধ সম্পদ তত বেশি ভাগ হয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি নির্দিষ্ট সময়ে নিয়মিত ইন্টারনেট ধীর হয়ে যায়, তাহলে রাউটার রিস্টার্ট করা, ওয়াই-ফাই চ্যানেল পরিবর্তন করা, ডিভাইস আপডেট রাখা এবং প্রয়োজনে ইন্টারনেট সেবাদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। অনেক ক্ষেত্রে নেটওয়ার্ক আপগ্রেড বা ভালো রাউটার ব্যবহার করেও সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়।
প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে, রাতের বেলায় ইন্টারনেটের গতি বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো নেটওয়ার্কে ব্যবহারকারীর চাপ কমে যাওয়া। কম ব্যবহারকারী মানে বেশি উপলব্ধ ব্যান্ডউইথ, আর সেটিই অনেক সময় দ্রুততর ইন্টারনেট অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
সূত্র: ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা।
আরও পড়ুন-ফ্রি রাউটারসহ বাংলালিংক ওয়াইফাই অর্ডার করার নিয়ম, মাসিক খরচ ও প্ল্যান বিস্তারিত










