বর্তমান বাংলাদেশের কোন ব্যাংকে টাকা জমা রাখা নিরাপদ?

reporter
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬, ২:০৫ অপরাহ্ণ
বর্তমান বাংলাদেশের কোন ব্যাংকে টাকা জমা রাখা নিরাপদ?

ব্যাংকে টাকা জমা রাখার আগে আর্থিক সক্ষমতা ও ঝুঁকি যাচাই করা জরুরি।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে সংস্কার ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই ‘কোন ব্যাংকে টাকা রাখলে সবচেয়ে নিরাপদ’—এ প্রশ্নের উত্তর শুধু ব্যাংকের নাম দিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। একটি ব্যাংকের নিরাপত্তা বিচার করতে মূলধন পর্যাপ্ততা, খেলাপি ঋণের হার, তারল্য, প্রভিশন সংরক্ষণ, সুশাসন, লাভজনকতা এবং ক্রেডিট রেটিং—এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে সব তফসিলি ব্যাংক থাকলেও সব ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা এক নয়। সাম্প্রতিক তথ্যেও এ পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে।

২০২৬ সালে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো খেলাপি ঋণ। বিশ্বব্যাংকের জুন ২০২৬-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূলধন-ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ অনুপাতও চাপে ছিল। ফলে আমানতকারীদের জন্য ব্যাংক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু বেশি সুদ বা মুনাফার হার দেখার পরিবর্তে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য যাচাই করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কিছু বেসরকারি ব্যাংক তুলনামূলকভাবে কম খেলাপি ঋণ এবং শক্তিশালী আর্থিক অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকের তথ্যের ভিত্তিতে সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের নিচে ছিল। এর অর্থ এই নয় যে এসব ব্যাংকের কোনো ঝুঁকি নেই; বরং একই সময়ে উচ্চ খেলাপি ঋণে আক্রান্ত অনেক ব্যাংকের তুলনায় এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদের মান তুলনামূলক ভালো ছিল।

ব্র্যাক ব্যাংককে সাম্প্রতিক সময়ে তুলনামূলক শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাংকটির ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর মূলধন-ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ অনুপাত ছিল ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকটির ক্রেডিট রেটিং ছিল AAA। তবে এগুলো ২০২৫ সালের জুনের তথ্য; বর্তমানে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা বিচার করতে সর্বশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনও দেখা প্রয়োজন।

ইস্টার্ন ব্যাংকও তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানের উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংকটি চতুর্থবারের মতো AAA দীর্ঘমেয়াদি ক্রেডিট রেটিং পাওয়ার কথা জানিয়েছে। ক্রেডিট রেটিংয়ে ব্যাংকটির মূলধন, তারল্য, সম্পদের মান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে আমানত রাখার আগে সাম্প্রতিক ক্রেডিট রেটিং ও আর্থিক প্রতিবেদন যাচাই করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

অন্যদিকে, শুধু সরকারি ব্যাংক বলেই সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবচেয়ে নিরাপদ ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। রাষ্ট্রীয় মালিকানা গুরুত্বপূর্ণ হলেও একটি ব্যাংকের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য মূলধন, খেলাপি ঋণ, তারল্য ও ব্যবস্থাপনার মানও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে কোনো বেসরকারি ব্যাংকও শুধু বড় ব্র্যান্ড বা বেশি আমানতের কারণে নিরাপদ হয়ে যায় না। তাই ব্যাংকের ধরন নয়, বরং সামগ্রিক আর্থিক সূচক দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া বেশি যুক্তিযুক্ত।

আমানতকারীদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা। ২০২৬ সালে বাংলাদেশে আমানত সুরক্ষা কাঠামো আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে ছোট আমানতকারীদের সুরক্ষা বাড়ানো, আমানত সুরক্ষা তহবিল শক্তিশালী করা এবং দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর রেজল্যুশন কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ চলছে।

তবে আমানত সুরক্ষা থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে একজন গ্রাহকের পুরো সঞ্চয় যেকোনো পরিস্থিতিতে একইভাবে সুরক্ষিত থাকবে। তাই বড় অঙ্কের টাকা এক জায়গায় না রেখে আর্থিক সক্ষমতা, প্রয়োজনীয়তা ও ঝুঁকি বিবেচনায় বৈচিত্র্য আনা যেতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি এফডিআর করার আগে ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন, ক্রেডিট রেটিং, মুনাফা, খেলাপি ঋণ ও মূলধন পরিস্থিতি যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে বলা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এককভাবে কোনো একটি ব্যাংককে ‘সবচেয়ে নিরাপদ’ ঘোষণা করা নির্ভুল হবে না। তবে প্রকাশিত আর্থিক সূচক ও ক্রেডিট রেটিং বিবেচনায় ব্র্যাক ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংকের মতো কয়েকটি ব্যাংক তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানের উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

তবে ব্যাংকে টাকা রাখার আগে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যাংকের আর্থিক সূচক সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই শুধু বেশি সুদের প্রস্তাব দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে ব্যাংকের মূলধন, খেলাপি ঋণ, তারল্য, ক্রেডিট রেটিং এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নির্দেশনা বিবেচনা করলেই সঞ্চয়ের অর্থ তুলনামূলক নিরাপদভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page