ইসলামী “ক্রেডিট কার্ডে” শরিয়াহবহির্ভূত লেনদেন ঠেকাতে নতুন নির্দেশনা

প্রকাশিত: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:১২ অপরাহ্ণ
ইসলামী “ক্রেডিট কার্ডে” শরিয়াহবহির্ভূত লেনদেন ঠেকাতে নতুন নির্দেশনা

বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামী ক্রেডিট কার্ডের নতুন নীতিমালা

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের আওতায় ক্রেডিট কার্ড সেবা পরিচালনার জন্য প্রথমবারের মতো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নির্দেশনায় ইসলামী ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে শরিয়াহবহির্ভূত লেনদেন ঠেকাতে ব্যাংকগুলোকে স্বয়ংক্রিয় মার্চেন্ট ক্যাটাগরি কোড বা এমসিসি ফিল্টারিং ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কার্ড পরিচালনায় সুদ বা রিবা, জুয়া বা মাইসির এবং অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা বা গারার এড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্ট ২৭ সেপ্টেম্বর ‘Guidelines on Islamic Credit Card Operations of Banks’ শিরোনামে এ নির্দেশনা জারি করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সার্কুলার অনুযায়ী, ইসলামী ক্রেডিট কার্ড সেবা দেওয়া ব্যাংকগুলোকে পণ্য, চুক্তি, লেনদেন, ফি, চার্জ, পরিচালন প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম শরিয়াহ নীতিমালা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালনা করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রসার এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তারের ফলে শরিয়াহসম্মত কার্ডভিত্তিক পেমেন্ট সেবার চাহিদা বেড়েছে। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে এ ধরনের কার্ড সেবার জন্য একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি শরিয়াহ গভর্ন্যান্স, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, হিসাব ও তথ্য প্রকাশ এবং গ্রাহক সুরক্ষার বিষয়গুলোও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নির্দেশনাটি জারির সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হয়েছে।

নীতিমালায় ইসলামী ক্রেডিট কার্ড পরিচালনার জন্য দুটি প্রধান কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। এর একটি হলো করজে হাসানা ও উজরাহভিত্তিক মডেল। সাধারণত জামানতবিহীন কার্ডের ক্ষেত্রে এ কাঠামো ব্যবহার করা যাবে। এ ক্ষেত্রে কার্ডের মাধ্যমে মার্চেন্ট পেমেন্ট বা নগদ উত্তোলনকে করজে হাসানা অর্থাৎ সুদমুক্ত ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। গ্রাহকের কাছ থেকে মূল অর্থের বাইরে ঋণের ওপর কোনো সুদ বা মুনাফা নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।

তবে কার্ড ইস্যু, হিসাব পরিচালনা ও সংশ্লিষ্ট সেবার জন্য ব্যাংক উজরাহ বা সার্ভিস ফি নিতে পারবে। এ ধরনের ফি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও নীতিমালায় সীমাবদ্ধতা রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ফি যেন ঋণের পরিমাণ, বকেয়া থাকা বা পরিশোধে বিলম্বের সঙ্গে সুদসদৃশভাবে পরিবর্তিত না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

অন্য কাঠামোটি হলো কাভার্ড বা ক্যাশ কোলাটেরালাইজড কার্ড মডেল। এ ব্যবস্থায় নগদ আমানত বা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য জামানতের বিপরীতে কার্ড দেওয়া যাবে। নির্ধারিত কভার বা জামানতের ভিত্তিতে লেনদেন নিষ্পত্তি হলে করজে হাসানা তৈরি হয় না। ফলে এ ক্ষেত্রে ব্যাংক নির্দিষ্ট ধরনের সার্ভিস ফি নিতে পারবে, যার মধ্যে অনুমোদিত মুনাফার অংশও থাকতে পারে। তবে ফি কার্ডের ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট হতে হবে এবং শুধু ঋণসীমা বা জামানতের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তন করা যাবে না।

শরিয়াহবহির্ভূত খাতে কার্ড ব্যবহার বন্ধ করতেও নতুন ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে স্বয়ংক্রিয় মার্চেন্ট ক্যাটাগরি কোড ফিল্টারিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট ধরনের ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানের লেনদেন শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আটকে দেওয়া যাবে।

এ ধরনের নিষিদ্ধ মার্চেন্ট ক্যাটাগরির মধ্যে মদ বিক্রি, জুয়া, প্রচলিত বিমা, শূকরজাত পণ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং সুদভিত্তিক আর্থিক সেবার মতো খাত অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। সংশ্লিষ্ট নিষিদ্ধ এমসিসি তালিকা প্রতিটি ব্যাংকের শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটির অনুমোদন নিতে হবে এবং ব্যবস্থাটির বাস্তবায়ন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

শুধু প্রযুক্তিগত ফিল্টারিং চালু করাই নয়, এর কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য শরিয়াহ অডিটের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ফলে ব্যাংককে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে যে ইসলামী ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন ও পরিচালন পদ্ধতি সংশ্লিষ্ট শরিয়াহ নীতিমালা মেনে চলছে।

কার্ডের বিল পরিশোধে বিলম্বের ক্ষেত্রেও আলাদা বিধান রাখা হয়েছে। কোনো গ্রাহক সময়মতো পাওনা পরিশোধ না করলে বিলম্ব ফি নেওয়ার সুযোগ থাকলেও সেটিকে ব্যাংকের আয় হিসেবে দেখানো যাবে না। সক্ষম গ্রাহকদের সময়মতো অর্থ পরিশোধে উৎসাহিত বা বিলম্ব নিরুৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের ফি নেওয়া যেতে পারে।

সংগৃহীত বিলম্ব ফি ব্যাংকের মূল আয়ের হিসাবে না রেখে পৃথক দাতব্য হিসাবে সংরক্ষণ করতে হবে। এরপর শরিয়াহ সুপারভাইজরি কমিটির তত্ত্বাবধানে অনুমোদিত দাতব্য কাজে অর্থ ব্যয় করতে হবে। অর্থাৎ বিলম্ব ফি থেকে ব্যাংকের নিয়মিত ব্যবসায়িক আয় তৈরির সুযোগ রাখা হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় শরিয়াহ গভর্ন্যান্সের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলামী ক্রেডিট কার্ড পরিচালনাকারী ব্যাংকগুলোকে তাদের পণ্য, চুক্তি, ফি, চার্জ ও কার্যক্রমের শরিয়াহসম্মত কাঠামো নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর রাখতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়েছে, নতুন নির্দেশনা শুধু ইসলামী ব্যাংকের জন্য নয়; ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করা অন্যান্য নির্ধারিত ব্যাংকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ফলে প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী শাখা বা উইন্ডোর মাধ্যমে দেওয়া ইসলামী ক্রেডিট কার্ড সেবার ক্ষেত্রেও এই কাঠামো অনুসরণ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ২৭ সেপ্টেম্বরের সার্কুলারটি ইসলামী ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্টের IBRPD Circular No. 01 হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিং-সংক্রান্ত অন্যান্য পরিসংখ্যান ও নীতিগত নথিও নিয়মিত প্রকাশ করছে।

নতুন এই কাঠামোর ফলে ইসলামী ক্রেডিট কার্ড সেবার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর জন্য পণ্য নকশা, লেনদেন নিয়ন্ত্রণ, শরিয়াহ তদারকি এবং গ্রাহক সুরক্ষার বিষয়ে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি হলো। এখন ব্যাংকগুলোকে নিজস্ব কার্ড সেবা এই নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য করে পরিচালনা করতে হবে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page