লোডশেডিংয়ের সময় ফ্রিজের দরজা বারবার খুললে কী বিপদ হতে পারে?

reporter
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ
লোডশেডিংয়ের সময় ফ্রিজের দরজা বারবার খুললে কী বিপদ হতে পারে?

লোডশেডিংয়ে বারবার ফ্রিজ খুললে দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে ভেতরের ঠান্ডা

লোডশেডিংয়ের সময় বাসাবাড়িতে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তার একটি বিষয় হলো ফ্রিজে রাখা খাবার। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর অনেকেই মাছ-মাংস ঠিক আছে কি না দেখতে, ঠান্ডা পানি নিতে কিংবা প্রয়োজনীয় খাবার বের করতে বারবার ফ্রিজের দরজা খুলে থাকেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি স্বাভাবিক মনে হলেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে এই অভ্যাসের কারণে ফ্রিজের ভেতরের ঠান্ডা দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ও রান্না করা খাবারের মতো পচনশীল খাবার দ্রুত অনিরাপদ তাপমাত্রায় পৌঁছানোর ঝুঁকি বাড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের Food and Drug Administration (FDA) এবং U.S. Department of Agriculture (USDA) বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় ফ্রিজ ও ফ্রিজারের দরজা যতটা সম্ভব বন্ধ রাখার পরামর্শ দেয়। দরজা না খুললে একটি রেফ্রিজারেটর প্রায় ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত খাবার ঠান্ডা রাখতে পারে।

তাই লোডশেডিংয়ের সময় ফ্রিজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সামান্য সচেতনতাও পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বারবার দরজা খুললে ঠান্ডা দ্রুত বেরিয়ে যায়

ফ্রিজের কাজ হলো ভেতরের তাপমাত্রা নির্দিষ্ট মাত্রায় কম রাখা। স্বাভাবিক অবস্থায় দরজা খুললে বাইরের উষ্ণ বাতাস ভেতরে প্রবেশ করে এবং ভেতরের ঠান্ডা বাতাসের কিছু অংশ বেরিয়ে যায়। তখন ফ্রিজের কুলিং সিস্টেম আবার তাপমাত্রা কমিয়ে আনে।

কিন্তু লোডশেডিংয়ের সময় কম্প্রেসর চালু থাকে না। ফলে দরজা খুলে যে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে যাচ্ছে, সেটি স্বাভাবিকভাবে দ্রুত ফিরিয়ে আনার সুযোগ থাকে না। এ কারণে বারবার দরজা খুললে ভেতরের তাপমাত্রা তুলনামূলক দ্রুত বাড়তে পারে।

FDA বলছে, বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্রিজ ও ফ্রিজারের দরজা যতটা সম্ভব বন্ধ রাখতে হবে। একটি বন্ধ রেফ্রিজারেটর প্রায় ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত খাবার ঠান্ডা রাখতে পারে।

খাবারে ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়তে পারে

ফ্রিজে খাবার রাখার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো নিম্ন তাপমাত্রায় জীবাণুর বৃদ্ধি ধীর রাখা। FDA-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, স্বাভাবিকভাবে রেফ্রিজারেটরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা উচিত।

লোডশেডিং দীর্ঘ হলে এবং বারবার দরজা খোলার কারণে ভেতরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে বিশেষ করে পচনশীল খাবারের নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক হতে হবে।

মাংস, মাছ, মুরগি, দুধ, ডিম ও রান্না করা অবশিষ্ট খাবার যথাযথভাবে ঠান্ডা না থাকলে খাদ্যজনিত অসুস্থতার কারণ হতে পারে। এমনকি পরবর্তীতে ভালোভাবে রান্না করলেও সব ক্ষেত্রে ঝুঁকি এড়ানো যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই বলে FDA সতর্ক করেছে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কোন খাবার?

ফ্রিজে রাখা সব খাবারের ঝুঁকি সমান নয়। লোডশেডিং দীর্ঘ হলে কাঁচা ও রান্না করা মাছ-মাংস, মুরগি, দুধ, ডিম, রান্না করা ভাত-তরকারি ও অন্যান্য দ্রুত পচনশীল খাবারের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর শুধু খাবারের গন্ধ বা চেহারা দেখে সেটি নিরাপদ কি না সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। FDA বলছে, খাবারের নিরাপত্তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু চেহারা বা গন্ধের ওপর নির্ভর করা যায় না।

এ কারণে সন্দেহজনক খাবার শুধু স্বাদ নিয়ে পরীক্ষা করাও নিরাপদ পদ্ধতি নয়।

ফ্রিজারের দরজাও বারবার খোলা উচিত নয়

শুধু সাধারণ ফ্রিজ নয়, বিদ্যুৎ চলে গেলে ফ্রিজারের দরজাও বন্ধ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

FDA-এর তথ্য অনুযায়ী, দরজা বন্ধ থাকলে পুরোপুরি ভর্তি একটি ফ্রিজার প্রায় ৪৮ ঘণ্টা এবং অর্ধেক ভর্তি ফ্রিজার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ঠান্ডা ধরে রাখতে পারে।

USDA-ও একই ধরনের নির্দেশনা দিয়ে বলছে, ফ্রিজ ও ফ্রিজারের দরজা বন্ধ রাখলে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে যাওয়া কমে।

তাই দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের সময় বারবার বরফ, মাছ বা মাংস বের করার জন্য ফ্রিজার খুললে ঠান্ডা ধরে রাখার সুবিধা কমে যেতে পারে।

লোডশেডিং শুরু হলে কী করবেন?

বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর প্রথমেই পরিবারের সদস্যদের জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে যে অপ্রয়োজনে ফ্রিজ খোলা যাবে না। প্রয়োজনীয় কিছু বের করতে হলে সম্ভব হলে একবারেই প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো বের করে নেওয়া ভালো।

দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকবে না বলে ধারণা করা গেলে আগে থেকেই বরফ বা frozen gel pack প্রস্তুত রাখা যেতে পারে। FDA দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আশঙ্কায় বরফ, কুলার ও frozen gel pack প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দিয়েছে।

এ ছাড়া ফ্রিজ ও ফ্রিজারে appliance thermometer রাখলে বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর ভেতরের তাপমাত্রা সম্পর্কে তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যায়।

৪ ঘণ্টা পার হলে কী করবেন?

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা প্রয়োজন—ফ্রিজের দরজা বন্ধ রাখলে প্রায় ৪ ঘণ্টা ঠান্ডা থাকতে পারে মানেই সব পরিস্থিতিতে ঠিক চার ঘণ্টা পর্যন্ত প্রতিটি খাবার শতভাগ নিরাপদ থাকবে, এমন নয়। ফ্রিজের প্রাথমিক তাপমাত্রা, কতবার দরজা খোলা হয়েছে এবং খাবারের প্রকৃতি—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

FDA-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ৪ ঘণ্টার বেশি বন্ধ থাকার আশঙ্কা থাকলে ঠান্ডা খাবার বরফ বা frozen gel pack-সহ কুলারে স্থানান্তরের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।

বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর ফ্রিজের তাপমাত্রা পরীক্ষা করুন। পচনশীল খাবার দীর্ঘ সময় ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকলে তা ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

বিদ্যুৎ এলেই কি খাবার আবার নিরাপদ হয়ে যায়?

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণা। দীর্ঘ সময় অনিরাপদ তাপমাত্রায় থাকা খাবার বিদ্যুৎ ফিরে এসে আবার ঠান্ডা হয়ে গেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদ হয়ে যায় না।

তাই দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের পর ফ্রিজ চালু হয়েছে দেখে সব খাবার রেখে দেওয়া ঠিক নয়। কতক্ষণ বিদ্যুৎ ছিল না, ফ্রিজ কতবার খোলা হয়েছে এবং খাবারের তাপমাত্রা কেমন ছিল—এসব বিবেচনা করতে হবে।

খাবার নিরাপদ কি না নিয়ে সন্দেহ থাকলে ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে ফেলে দেওয়াই নিরাপদ।

শেষ কথা

লোডশেডিংয়ের সময় ফ্রিজের দরজা বারবার খোলা ছোট একটি ভুল মনে হলেও এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রতিবার দরজা খোলার সঙ্গে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে যায় এবং উষ্ণ বাতাস প্রবেশ করে। বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজ তখন সেই তাপমাত্রা দ্রুত কমিয়ে আনতে পারে না।

তাই সবচেয়ে সহজ নিয়ম হলো—বিদ্যুৎ চলে গেলে ফ্রিজ ও ফ্রিজারের দরজা যতটা সম্ভব বন্ধ রাখুন। দরজা বন্ধ থাকলে সাধারণ ফ্রিজ প্রায় ৪ ঘণ্টা এবং পূর্ণ ফ্রিজার প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত ঠান্ডা ধরে রাখতে পারে।

লোডশেডিং দীর্ঘ হলে মাছ-মাংস, দুধ, ডিম ও রান্না করা খাবারের মতো পচনশীল খাবারের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করুন। অপ্রয়োজনে ফ্রিজ না খোলার এই ছোট অভ্যাসই খাবার দীর্ঘ সময় ঠান্ডা রাখতে এবং খাদ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page