পেটের মেদ কমাতে হাঁটবেন নাকি দৌড়াবেন? জেনে নিন

লাইফস্টাইল প্রতিনিধি
প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ৬:২৭ অপরাহ্ণ
পেটের মেদ কমাতে হাঁটবেন নাকি দৌড়াবেন? জেনে নিন

নিয়মিত হাঁটা ও দৌড়ানো দুটিই ওজন নিয়ন্ত্রণ ও পেটের চর্বি কমাতে সহায়ক।

বর্তমান সময়ে  পেটের অতিরিক্ত চর্বি (Belly Fat) শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। অফিসে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ার কারণে অনেকেরই কোমরের মাপ ধীরে ধীরে বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ফ্যাটি লিভার এবং স্ট্রোকের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি।

ওজন কমাতে চাইলে সবচেয়ে বেশি যে দুটি ব্যায়ামের কথা শোনা যায়, তা হলো হাঁটা (Walking) এবং দৌড়ানো (Running)। কিন্তু অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে দুটির মধ্যে কোনটি বেশি কার্যকর? প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটলে কি পেটের মেদ কমবে, নাকি একই সময় দৌড়ালে আরও দ্রুত ফল পাওয়া যাবে?

পেটের চর্বি কেন বাড়ে?

অনেকেই মনে করেন বেশি খাওয়ার কারণেই শুধু পেটের মেদ বাড়ে। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি জমে গেলে তা ধীরে ধীরে চর্বি হিসেবে সংরক্ষিত হয়। বিশেষ করে কোমর ও পেটের আশপাশে এই চর্বি দ্রুত জমে।

পেটের চর্বি বাড়ার পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ রয়েছে। যেমন—

১। অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত খাবার খাওয়া ।

২। কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ ।

৩। দীর্ঘ সময় বসে থাকা ।

৪। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া ।

৫। মানসিক চাপ ।

৬। হরমোনের পরিবর্তন ।

৭। বয়স বৃদ্ধি ।

৮। নিয়মিত ব্যায়াম না করা ।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট ব্যায়াম করে পেটের মেদ কমানো সম্ভব নয়। শরীরের মোট চর্বি কমলে ধীরে ধীরে পেটের অতিরিক্ত চর্বিও কমতে শুরু করে। তাই পুরো শরীরের ক্যালোরি ব্যয় বাড়ানোই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

হাঁটার উপকারিতা

হাঁটা পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ, নিরাপদ এবং কার্যকর ব্যায়ামগুলোর একটি। এটি করতে কোনো ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি লাগে না, জিমে যাওয়ারও প্রয়োজন হয় না। প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটার মাধ্যমে শরীরের বিপাকক্রিয়া (Metabolism) সক্রিয় হয় এবং ধীরে ধীরে ক্যালোরি খরচ বাড়ে।

দ্রুত হাঁটা বা Brisk Walking করলে হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের তুলনায় বাড়ে, ফলে শরীর বেশি শক্তি ব্যবহার করে। নিয়মিত দ্রুত হাঁটার ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে, রক্তচাপ কমে, হৃদ্‌যন্ত্র ভালো থাকে এবং মানসিক চাপও কমে।

আরেকটি বড় সুবিধা হলো, হাঁটার সময় হাঁটু ও গোড়ালির ওপর তুলনামূলক কম চাপ পড়ে। তাই বয়স্ক ব্যক্তি, অতিরিক্ত ওজনের মানুষ কিংবা যাদের আগে থেকে জয়েন্টের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য হাঁটা অনেক বেশি নিরাপদ। এছাড়া নিয়মিত হাঁটার মাধ্যমে ঘুমের মান উন্নত হয়, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে।

দৌড়ানোর উপকারিতা

দৌড়ানোকে উচ্চমাত্রার কার্ডিও ব্যায়াম হিসেবে ধরা হয়। হাঁটার তুলনায় এতে শরীরকে অনেক বেশি শক্তি ব্যয় করতে হয়। ফলে একই সময়ে বেশি ক্যালোরি পোড়ানো সম্ভব হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন ব্যক্তি যদি ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটেন, তাহলে তিনি গড়ে ১৫০ থেকে ২৫০ ক্যালোরি পর্যন্ত খরচ করতে পারেন। একই ব্যক্তি যদি ৩০ মিনিট মাঝারি গতিতে দৌড়ান, তাহলে ৩০০ থেকে ৫০০ ক্যালোরি পর্যন্ত পোড়াতে পারেন। যদিও এই সংখ্যা ব্যক্তির ওজন, গতি এবং শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হতে পারে।

দৌড়ানোর ফলে হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়ে। শরীরের সহনশীলতা উন্নত হয় এবং কম সময়ে বেশি শক্তি ব্যয় হওয়ায় ওজন কমানোর গতি তুলনামূলক দ্রুত হতে পারে।

তবে দৌড়ানোর একটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। যাদের হাঁটু, গোড়ালি বা কোমরের সমস্যা রয়েছে কিংবা যারা দীর্ঘদিন কোনো ধরনের ব্যায়াম করেননি, তাদের জন্য হঠাৎ দৌড়ানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই শুরুতেই দীর্ঘ সময় দৌড়ানোর পরিবর্তে ধীরে ধীরে অভ্যাস গড়ে তোলাই নিরাপদ।

ক্যালোরি পোড়ানোর ক্ষেত্রে কোনটি এগিয়ে?

যদি শুধুমাত্র ক্যালোরি পোড়ানোর হিসাব করা হয়, তাহলে দৌড়ানোই এগিয়ে থাকবে। কারণ একই সময়ে দৌড়ানোর সময় শরীরের অক্সিজেনের চাহিদা এবং শক্তির ব্যবহার অনেক বেশি হয়।

তবে শুধু বেশি ক্যালোরি পোড়ালেই যে সবাই দৌড়াবেন, এমন নয়। অনেকেই কয়েক দিন দৌড়ানোর পর ক্লান্ত হয়ে ব্যায়াম বন্ধ করে দেন। অন্যদিকে, হাঁটা তুলনামূলক সহজ হওয়ায় বছরের পর বছর নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, যে ব্যায়ামটি আপনি দীর্ঘদিন নিয়মিত করতে পারবেন, সেটিই আপনার জন্য সবচেয়ে কার্যকর ব্যায়াম।

হাঁটা বনাম দৌড়ানো কোনটি আপনার জন্য উপযুক্ত?

সব মানুষের শারীরিক সক্ষমতা এক রকম নয়। তাই সবার জন্য একই ধরনের ব্যায়ামও উপযুক্ত হয় না। আপনি যদি আগে কখনো নিয়মিত ব্যায়াম না করে থাকেন, তাহলে শুরুতেই দৌড়ানোর পরিবর্তে দ্রুত হাঁটা ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে। এতে শরীর ধীরে ধীরে ব্যায়ামের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে এবং আঘাত পাওয়ার ঝুঁকিও কম থাকে।

অন্যদিকে, যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তাদের জন্য হাঁটার পাশাপাশি দৌড়ানো যোগ করলে ওজন কমার গতি বাড়তে পারে। বিশেষ করে কম সময়ে বেশি ক্যালোরি পোড়াতে চাইলে দৌড়ানো কার্যকর বিকল্প।

যাদের হাঁটু, কোমর বা গোড়ালিতে ব্যথা রয়েছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে হাঁটা, সাইক্লিং বা সাঁতারের মতো কম চাপের ব্যায়াম বেছে নিতে পারেন। অতিরিক্ত ওজন থাকলে শুরুতে হাঁটা নিরাপদ, পরে ধীরে ধীরে জগিং বা দৌড়ানোর দিকে যেতে পারেন।

শুধু ব্যায়াম করলেই কি পেটের চর্বি কমবে?

এটি সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি। প্রতিদিন এক ঘণ্টা দৌড়ানোর পরও যদি অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত খাবার, কোমল পানীয়, ফাস্টফুড ও মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

পেটের চর্বি কমানোর মূল ভিত্তি হলো ক্যালোরি ঘাটতি (Calorie Deficit) তৈরি করা। অর্থাৎ, শরীর যত ক্যালোরি ব্যবহার করবে, তার চেয়ে কম ক্যালোরি গ্রহণ করতে হবে। এই ভারসাম্য তৈরি হলে শরীর জমে থাকা চর্বিকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।

তাই ব্যায়ামের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিন পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফল, আঁশযুক্ত খাবার, ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, ডাল ও স্বাস্থ্যকর চর্বি খাওয়া উচিত। একই সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি, ভাজাপোড়া, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং কোমল পানীয় কমাতে হবে।

পেটের চর্বি দ্রুত কমাতে যেসব অভ্যাস গড়ে তুলবেন

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ব্যায়াম কখনোই একা ওজন কমানোর নিশ্চয়তা দিতে পারে না। বরং কয়েকটি ভালো অভ্যাস একসঙ্গে অনুসরণ করলে ফল অনেক ভালো হয়।

প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট হাঁটা বা দৌড়ানো, সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম (Strength Training), পর্যাপ্ত পানি পান, প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম এবং মানসিক চাপ কমানো—এসব অভ্যাস ওজন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এ ছাড়া লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহার, অল্প দূরত্বে হেঁটে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময় বসে না থেকে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটার মতো ছোট ছোট অভ্যাসও ক্যালোরি খরচ বাড়াতে সাহায্য করে।

বিশেষজ্ঞরা কী পরামর্শ দেন?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আমেরিকান কলেজ অব স্পোর্টস মেডিসিন (ACSM)-এর সুপারিশ অনুযায়ী, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সপ্তাহে অন্তত ১৫০–৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম অথবা ৭৫–১৫০ মিনিট উচ্চমাত্রার ব্যায়াম করা উচিত।

মাঝারি মাত্রার ব্যায়ামের মধ্যে দ্রুত হাঁটা, হালকা সাইক্লিং ও সাঁতার রয়েছে। আর উচ্চমাত্রার ব্যায়ামের মধ্যে দৌড়ানো, দ্রুত সাইক্লিং বা অন্যান্য তীব্র শারীরিক অনুশীলন রয়েছে। নতুনদের জন্য প্রথমে হাঁটা দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে জগিং ও দৌড়ানোর অভ্যাস গড়ে তোলা সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।

যেসব ভুল অনেকেই করেন

অনেকেই মনে করেন প্রতিদিন শুধু দৌড়ালেই পেটের মেদ দ্রুত কমে যাবে। আবার কেউ কেউ ব্যায়াম করার পর অতিরিক্ত খাওয়াকে সমস্যা মনে করেন না। এসব অভ্যাস ওজন কমানোর পথে বড় বাধা হতে পারে।

আরেকটি সাধারণ ভুল হলো, খুব অল্প সময়ে বড় পরিবর্তন আশা করা। বাস্তবে স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন কমাতে সময় লাগে। ধৈর্য ধরে নিয়মিত ব্যায়াম ও সুষম খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করাই দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল দেয়।

তাহলে কোনটি বেশি উপকারী?

যদি লক্ষ্য থাকে কম সময়ে বেশি ক্যালোরি পোড়ানো, তাহলে দৌড়ানো এগিয়ে। কিন্তু যদি লক্ষ্য থাকে নিরাপদে দীর্ঘদিন নিয়মিত ব্যায়াম করা, তাহলে দ্রুত হাঁটা অনেকের জন্য ভালো বিকল্প।

সবচেয়ে ভালো ফল পেতে অনেক বিশেষজ্ঞই দুটি ব্যায়ামের সমন্বয় করার পরামর্শ দেন। যেমন—একদিন দ্রুত হাঁটা, অন্যদিন জগিং বা দৌড়ানো। এতে শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে না এবং ব্যায়ামের একঘেয়েমিও কমে।

মনে রাখতে হবে, পেটের চর্বি কমানোর কোনো শর্টকাট নেই। নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সক্রিয় জীবনযাপন—এই চারটি বিষয় একসঙ্গে অনুসরণ করলেই দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।

উপসংহার

পেটের চর্বি কমাতে হাঁটা এবং দৌড়ানো—দুটিই কার্যকর ব্যায়াম। তবে কোনটি আপনার জন্য বেশি উপযোগী হবে, তা নির্ভর করে আপনার বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং জীবনযাত্রার ওপর। যদি নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস না থাকে, তাহলে দ্রুত হাঁটা দিয়ে শুরু করুন। আর যদি শারীরিকভাবে সক্ষম হন এবং দ্রুত ক্যালোরি পোড়াতে চান, তাহলে ধীরে ধীরে দৌড়ানো যোগ করতে পারেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ধারাবাহিকতা। কারণ নিয়মিত ব্যায়াম ও সুষম খাদ্যাভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ শরীর ও মেদহীন কোমর গঠনের মূল চাবিকাঠি।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন