জ্বরকে সাধারণ ভেবে বসে থাকবেন না, ভাইরাল সংক্রমণে রক্ত পরীক্ষা করানো জরুরি?

স্বাস্থ্য প্রতিনিধি
প্রকাশিত: সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬, ১১:১৮ পূর্বাহ্ণ
জ্বরকে সাধারণ ভেবে বসে থাকবেন না, ভাইরাল সংক্রমণে রক্ত পরীক্ষা করানো জরুরি?

ভাইরাল জ্বরের উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা করানো রোগ নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দেশে ঋতু পরিবর্তনের সময় এলেই বিভিন্ন ধরনের ভাইরাসজনিত সংক্রমণের প্রকোপ বাড়তে দেখা যায়। কখনো অতিরিক্ত গরম, কখনো টানা বৃষ্টি, আবার কখনো আর্দ্রতার পরিবর্তনের কারণে মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ওপরও প্রভাব পড়ে। ফলে অনেকেই হঠাৎ জ্বর, সর্দি, কাশি, মাথাব্যথা কিংবা শরীরব্যথার মতো উপসর্গে আক্রান্ত হন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব উপসর্গকে সাধারণ ভাইরাল জ্বর হিসেবে ধরে নেওয়া হলেও বর্তমান সময়ে চিকিৎসকরা বলছেন, জ্বরকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ একই ধরনের উপসর্গের আড়ালে ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জা বা অন্য ভাইরাসজনিত সংক্রমণও লুকিয়ে থাকতে পারে। তাই জ্বর দেখা দিলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা করানো এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে জ্বরের রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। অনেক রোগীর জ্বর ১০০ থেকে ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও তারা তীব্র দুর্বলতা, মাথাব্যথা এবং শরীরব্যথার অভিযোগ করছেন। কারও কারও ক্ষেত্রে জ্বর খুব বেশি না হলেও শরীরের অবস্থা এতটাই খারাপ থাকে যে স্বাভাবিক কাজকর্ম করাও কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসকদের মতে, শুধুমাত্র শরীরের তাপমাত্রা দেখে রোগের তীব্রতা নির্ধারণ করা ঠিক নয়। রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা, পানিশূন্যতা, শ্বাসপ্রশ্বাস, রক্তচাপ এবং অন্যান্য উপসর্গও সমান গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, বর্তমানে অনেক ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রেও শুরুতে প্রচলিত “হাড়ভাঙা ব্যথা” নাও থাকতে পারে। অনেক সময় ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণ সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতোই দেখা দেয়—সর্দি, হালকা কাশি, গলা ব্যথা, দুর্বলতা কিংবা অল্প জ্বর। এ কারণে শুধু উপসর্গ দেখে রোগটি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুপ্রবণ মৌসুমে জ্বর দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা করালে রোগটি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয় এবং জটিলতা এড়ানো সহজ হয়।

এবারের ভাইরাল সংক্রমণে একটি বিষয় চিকিৎসকদের নজরে এসেছে, তা হলো দীর্ঘস্থায়ী কাশি। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে শুকনো কাশি কয়েক দিন ধরে চলতে থাকে, আবার কারও কফযুক্ত কাশিও দেখা যায়। কিছু রোগী এত বেশি কাশেন যে বমি পর্যন্ত হয়ে যায়। বিশেষ করে রাতের দিকে কাশি বেড়ে যাওয়ায় ঘুম ব্যাহত হয়, ফলে রোগী আরও দুর্বল হয়ে পড়েন। তবে ভাইরাসজনিত কাশি অনেক ক্ষেত্রেই ধীরে ধীরে নিজে থেকেই কমে আসে। তবুও কাশি দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ভাইরাল জ্বরের আরেকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো জ্বর কমে যাওয়ার পরও দীর্ঘ সময় দুর্বলতা অনুভব করা। অনেকেই মনে করেন জ্বর চলে গেলেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছেন। বাস্তবে দেখা যায়, জ্বর সেরে যাওয়ার পরও কয়েক দিন বা কখনো কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত শরীর ক্লান্ত থাকে। কারণ সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে শরীরের প্রচুর শক্তি ব্যয় হয়। ফলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কিছুটা সময় লাগে। এ সময় পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাদ্য এবং পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।

চিকিৎসকরা জ্বরের সময় শরীরে পানির ঘাটতি যেন না হয়, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলেন। জ্বরের কারণে শরীর থেকে পানি ও প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান বেরিয়ে যেতে পারে। তাই শুধু পানি নয়, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, লেবুর শরবত, গরম স্যুপ কিংবা তাজা ফলের রসও উপকারী হতে পারে। তবে অতিরিক্ত চিনি মেশানো পানীয় এড়িয়ে চলাই ভালো। পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ শরীরের পানিশূন্যতা কমাতে সাহায্য করার পাশাপাশি গলা আরাম দেয় এবং কাশির অস্বস্তিও কিছুটা কমাতে পারে।

জ্বরের সময় অনেকের ক্ষুধা কমে যায় বা বমি বমি ভাব দেখা দেয়। এ অবস্থায় জোর করে ভারী খাবার খাওয়ার পরিবর্তে অল্প অল্প করে সহজপাচ্য খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। খিচুড়ি, স্যুপ, ভাত, ডাল, ডিম, মাছ কিংবা ফলমূল ধীরে ধীরে খাদ্যতালিকায় যুক্ত করা যেতে পারে। যদি বারবার বমি হয় বা কিছুই খেতে না পারেন, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ অতিরিক্ত বমির ফলে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে।

অনেকেই জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করেন। কিন্তু ভাইরাল জ্বরের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক সাধারণত কার্যকর নয়, কারণ এগুলো ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে, ভাইরাসের বিরুদ্ধে নয়। অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ শুরু করা উচিত নয়।

রক্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রে চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং এলাকার সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করেন। ডেঙ্গুর সন্দেহ থাকলে CBC, NS1 অ্যান্টিজেন বা প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য পরীক্ষা করা হতে পারে। একইভাবে অন্যান্য সংক্রমণের সন্দেহ থাকলে ভিন্ন ধরনের পরীক্ষারও প্রয়োজন হতে পারে। তাই নিজে থেকে পরীক্ষা নির্বাচন না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, যদি জ্বর সাত দিনের বেশি স্থায়ী হয়, বারবার ফিরে আসে, শ্বাসকষ্ট হয়, অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দেয়, শরীরে রক্তক্ষরণের লক্ষণ দেখা যায়, প্রস্রাব কমে যায় বা রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে থাকে, তাহলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্কতা প্রয়োজন।

বর্তমান সময়ে ডেঙ্গুর পাশাপাশি ইনফ্লুয়েঞ্জা, কোভিড-১৯ এবং অন্যান্য ভাইরাসজনিত সংক্রমণও একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে দেখা দিতে পারে। তাই শুধু জ্বরের মাত্রা দেখে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিৎসকের মূল্যায়ন রোগের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ভাইরাল জ্বর প্রতিরোধে কিছু সাধারণ অভ্যাসও কার্যকর। নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, কাশি বা হাঁচির সময় মুখ-নাক ঢেকে রাখা, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাসাবাড়ি ও আশপাশে কোথাও যাতে পরিষ্কার পানি জমে না থাকে, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে ভাইরাল জ্বরকে আতঙ্কের কারণ না ভেবে সচেতনতার সঙ্গে মোকাবিলা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ ভাইরাল সংক্রমণ কয়েক দিনের মধ্যেই সেরে যায়। তবে বর্তমান সময়ে ডেঙ্গুসহ অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে জ্বরকে অবহেলা করা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, সুষম খাদ্য এবং পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ দ্রুত সুস্থ হতে সহায়তা করে। সময়মতো রোগ শনাক্ত করা গেলে জটিলতা এড়ানো সম্ভব হয় এবং ব্যক্তি ও পরিবারের স্বাস্থ্য সুরক্ষাও নিশ্চিত করা যায়।

তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন