সন্তানকে সম্পত্তি দান করলেও আজীবন ভোগ করতে পারবেন বাবা মা(জাতীয় সংসদে বিল পাস)

প্রকাশিত: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:২৪ পূর্বাহ্ণ
সন্তানকে সম্পত্তি দান করলেও আজীবন ভোগ করতে পারবেন বাবা মা(জাতীয় সংসদে বিল পাস)

সন্তানকে সম্পত্তি দান করলেও আজীবন ভোগের অধিকার থাকবে বাবা মায়ের

সন্তান বা নাতি-নাতনির নামে সম্পত্তি দান করার পরও দাতা বাবা-মা, দাদা-দাদি বা নানা-নানি জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার করার অধিকার রাখতে পারবেন। এমন বিধান রেখে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করেন। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। এর মাধ্যমে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন করে দাতার জীবনকালীন ভোগদখলের অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হলো।

নতুন বিধানের মূল বিষয়গুলো সহজভাবে দেখলে—

বিষয় নতুন বিধানে যা থাকছে
বাবা-মা সম্পত্তি সন্তানকে দান করলে জীবিত থাকা পর্যন্ত ভোগ করতে পারবেন
দাদা-দাদি বা নানা-নানি নাতি-নাতনিকে দিলে দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ভোগ করতে পারবেন
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দান নির্দিষ্ট শর্তে দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার থাকবে
গ্রহীতা দাতার আগে মারা গেলে আইন অনুযায়ী সম্পত্তি গ্রহীতার ওয়ারিশদের কাছে যাবে
প্রযোজ্যতা সব ধর্মাবলম্বীর জন্য সমভাবে প্রযোজ্য
নতুন বিধান ১২২এ ও ১২২বি ধারা সংযোজন

বর্তমানে প্রচলিত আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিভিন্ন পদ্ধতি থাকলেও দাতা সম্পত্তি অন্যের নামে দেওয়ার পরও নিজের জীবদ্দশায় সেটি ভোগ করার অধিকার স্পষ্টভাবে সংরক্ষণের বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধান ছিল না। নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থায় বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং অন্যান্য যোগ্য দাতা নির্দিষ্ট রক্তসম্পর্কীয় ব্যক্তি কিংবা স্বামী-স্ত্রীর কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করেও নিজের জীবনকাল পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগের অধিকার রাখতে পারবেন। অর্থাৎ সম্পত্তি দান করার পর দাতাকে নিজের বসতবাড়ি বা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

বিলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তির গ্রহীতা মারা গেলে কী হবে, সেটিও এতে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দাতার ভোগের অধিকার বজায় থাকবে এবং পরবর্তী সময়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ওই সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন এই বিধান মূলত সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে দাতার জীবনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। বিশেষ করে বয়স বাড়ার পর সন্তান বা অন্য কারও কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করে দেওয়া বাবা-মা যেন জীবিত থাকা অবস্থায় সেই সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার হারিয়ে না ফেলেন, সে বিষয়টি আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার লক্ষ্য রয়েছে।

আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, নতুন বিধানটি সব ধর্মাবলম্বীর জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হবে। একই সঙ্গে প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের অধীনে হেবা কিংবা আইন দ্বারা স্বীকৃত অন্যান্য সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতির ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না। নতুন ব্যবস্থাকে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে রাখা হয়েছে।

বিলটি জাতীয় সংসদে ওঠার পর থেকেই এর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিলটির কিছু বিধান নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। বিশেষ করে দাতার আজীবন ভোগদখলের অধিকার এবং মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের সঙ্গে এর সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এ নিয়ে বিরোধী দলের সদস্যরা বিলটির ওপর ভোটে অংশ না নিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিলটিকে বাবা-মায়ের সম্পত্তিগত নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানানো হয়েছে। তাদের বক্তব্য, জীবনের শেষ সময়ে অনেক বাবা-মা সম্পত্তি সন্তানদের নামে লিখে দেওয়ার পর ভোগদখল বা বসবাসের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন। নতুন বিধান তাদের সেই অধিকার আইনগতভাবে সংরক্ষণের সুযোগ দেবে।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ, এটি সংসদে বিল হিসেবে পাস হয়েছে। তাই সাধারণ পাঠকের ক্ষেত্রে ‘আইন পাস’ এবং ‘বিল পাস’—দুইটির পার্থক্য বোঝা জরুরি। সংসদে পাসের পর সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সংশোধিত বিধান কার্যকর হবে।

সব মিলিয়ে নতুন এই বিধান কার্যকর হলে সন্তান বা নাতি-নাতনির নামে সম্পত্তি দান করার পরও বাবা-মা বা অন্যান্য যোগ্য দাতার জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ভোগের অধিকার আইনি সুরক্ষা পাবে। ফলে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে মালিকানা দেওয়ার পাশাপাশি দাতার জীবনকালীন ব্যবহার ও ভোগের অধিকার সংরক্ষণের একটি নতুন আইনি পথ তৈরি হতে যাচ্ছে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page