কেন কিছু মানুষের রিজিকে বরকত থাকে সব সময়?

প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৩৭ পূর্বাহ্ণ
কেন কিছু মানুষের রিজিকে বরকত থাকে সব সময়?

বেশি নয়, জীবনে বরকতপূর্ণ রিজিকই হোক প্রত্যাশা।

একই পরিমাণ আয় করেন দুজন মানুষ, কিন্তু মাস শেষে দেখা যায় একজনের সংসারে স্বচ্ছলতা থাকে, প্রয়োজন মিটিয়েও কিছু সঞ্চয় করতে পারেন; অন্যজনের আয় তুলনামূলক বেশি হলেও মাস শেষ হওয়ার আগেই অর্থের সংকটে পড়েন। আবার এমন মানুষও আছেন, যাঁদের আয় খুব বেশি নয়, কিন্তু অল্পতেই সংসার সুন্দরভাবে চলে, প্রয়োজনের সময় সাহায্যের দরজা খুলে যায় এবং জীবনে এক ধরনের প্রশান্তি থাকে। ইসলামের ভাষায় এটিই রিজিকে বরকত থাকার একটি দিক।

বরকত মানে শুধু বেশি টাকা থাকা নয়। অল্প সম্পদে বেশি উপকার পাওয়া, প্রয়োজনীয় সময়ে রিজিকের ব্যবস্থা হয়ে যাওয়া, উপার্জনে শান্তি থাকা, অর্থ সঠিক কাজে ব্যয় হওয়া এবং পরিবারে স্বস্তি থাকা—এসবও বরকতের অংশ হতে পারে। তাই “কার আয় বেশি” আর “কার রিজিকে বরকত বেশি”—দুটি বিষয় এক নয়।

কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঈমান ও তাকওয়ার সঙ্গে বরকতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলেছেন। আল্লাহ বলেন, কোনো জনপদের মানুষ যদি ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তাহলে তিনি তাদের জন্য আকাশ ও জমিন থেকে বরকতের দরজা খুলে দিতেন। (সুরা আল-আ‘রাফ: ৯৬)।

অর্থাৎ রিজিকে বরকতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিগুলোর একটি হলো তাকওয়া—আল্লাহকে ভয় করা, তাঁর নির্দেশ মেনে চলা এবং হারাম থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা। এর অর্থ এই নয় যে একজন তাকওয়াবান মানুষ কখনো আর্থিক কষ্টে পড়বেন না। বরং কোরআনের শিক্ষা হলো, আল্লাহর ওপর ভরসা ও তাকওয়া মানুষের জন্য কল্যাণ ও বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করে।

সুরা আত-তালাকের ২ ও ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি তাঁকে ভয় করে বা তাকওয়া অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য বের হওয়ার পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে ধারণাও করতে পারে না। একই সঙ্গে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে বলা হয়েছে।

রিজিকে বরকতের আরেকটি বড় কারণ হলো হালাল উপার্জন। মানুষ কত টাকা উপার্জন করছে, তার চেয়ে সেই টাকা কীভাবে উপার্জন করছে—ইসলামে এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায় প্রতারণা, মিথ্যা, পণ্যের দোষ গোপন করা কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করে উপার্জন করা হয়তো সাময়িকভাবে অর্থ বাড়াতে পারে, কিন্তু এতে বরকত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যবসায়ী লেনদেনে সত্য কথা বললে এবং সবকিছু পরিষ্কার করে দিলে তাদের ব্যবসায় বরকত দেওয়া হয়। কিন্তু মিথ্যা বললে বা কোনো বিষয় গোপন করলে সেই লেনদেনের বরকত মুছে যায়। (সহিহ মুসলিম: ১৫৩২a)।

এ কারণেই অনেক সময় একজন মানুষের আয় কম হলেও তার জীবনে প্রশান্তি থাকে, আর অন্যজনের আয় অনেক বেশি হলেও নানা সমস্যা লেগেই থাকে। বরকতের বিষয়টি শুধু টাকার অঙ্ক দিয়ে মাপা যায় না। হালাল উপার্জন, সৎ ব্যবসা এবং মানুষের হক আদায় করা রিজিকের পবিত্রতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

রিজিকে বরকতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার রিজিক প্রশস্ত হওয়া এবং তার জীবনের সময় বৃদ্ধি পাওয়া পছন্দ করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে। (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৬)।

আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেকেই সামান্য অভিমান বা পারিবারিক বিরোধের কারণে ভাই-বোন, চাচা-মামা, খালা-ফুফু কিংবা অন্যান্য আত্মীয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগ রাখেন না। অথচ ইসলাম সম্পর্ক জোড়ার ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছে। ফোন করে খোঁজ নেওয়া, অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে যাওয়া, প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো কিংবা সম্পর্কের দূরত্ব কমানোর চেষ্টা—এসব ছোট কাজও গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করাও বরকতের সঙ্গে সম্পর্কিত। আল্লাহ তাআলা সুরা ইবরাহিমের ৭ নম্বর আয়াতে বলেছেন, মানুষ যদি তাঁর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, তাহলে তিনি তাদের আরও বাড়িয়ে দেবেন।

শুকরিয়া শুধু মুখে “আলহামদুলিল্লাহ” বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহ যে সম্পদ দিয়েছেন, তা হালাল কাজে ব্যবহার করা, অপচয় না করা এবং অন্যের হক আদায় করাও কৃতজ্ঞতার অংশ। একজন মানুষ যখন নিজের সামান্য নিয়ামতগুলোও উপলব্ধি করতে শেখেন, তখন তার কাছে জীবনের অনেক অমূল্য সম্পদ নতুন করে ধরা দেয়।

এর সঙ্গে সদকা করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক মানুষ মনে করেন, অর্থ কম থাকলে দান করলে নিজের সম্পদ আরও কমে যাবে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সদকা সম্পদ কমিয়ে দেয় না। (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৮)।

কোরআনেও আল্লাহ বলেছেন, তিনি সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং সদকাকে বৃদ্ধি করেন। (সুরা আল-বাকারা: ২৭৬)। এখানে “বৃদ্ধি”কে শুধু হাতে থাকা টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই; আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণ ও প্রতিদানও এর অন্তর্ভুক্ত। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী গোপনে বা প্রকাশ্যে দান করা একজন মুসলমানের সুন্দর আমল।

রিজিকে বরকতের জন্য অপচয় থেকে বেঁচে থাকাও জরুরি। একজন মানুষের আয় যদি বাড়তে থাকে কিন্তু একই সঙ্গে তার চাহিদা, বিলাসিতা ও অপ্রয়োজনীয় খরচও বাড়তে থাকে, তাহলে বেশি আয় করেও সে স্বস্তি নাও পেতে পারে। বরকতপূর্ণ জীবন মানে শুধু বেশি পাওয়া নয়; যা পাওয়া হয়েছে, সেটিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করাও।

একইভাবে হারাম থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, আত্মসাৎ কিংবা অন্যের অধিকার অন্যায়ভাবে গ্রহণ করে অর্থ উপার্জন করা ইসলামে বৈধ নয়। কোরআনে সুদ সম্পর্কে কঠোর সতর্কতা এসেছে এবং হালাল ব্যবসা ও হারাম সুদের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করা হয়েছে।

রিজিকে বরকতের জন্য সত্যবাদিতাও গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সত্যবাদিতা নেকির দিকে নিয়ে যায় এবং নেকি জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়; আর মিথ্যা মানুষকে পাপের দিকে নিয়ে যায়। (সহিহ মুসলিম: ২৬০৭)। ব্যবসা, চাকরি, পারিবারিক জীবন কিংবা সামাজিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই সত্যবাদিতা একজন মুসলমানের চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে রিজিকে বরকত থাকা মানে এই নয় যে সেই ব্যক্তির জীবনে কখনো অভাব বা বিপদ আসবে না। নবী-রাসুল এবং নেককার মানুষও পরীক্ষা ও কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছেন। কখনো আর্থিক সংকটও পরীক্ষা হতে পারে। তাই কারও সম্পদ কম দেখে তাকে বরকতহীন মনে করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি বেশি অর্থ দেখেই তার জীবনে বরকত আছে বলে ধরে নেওয়াও সঠিক নয়।

বরকতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা। এর অর্থ বসে থাকা নয়; বরং বৈধ উপায়ে চেষ্টা করার পর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা। একজন মানুষ চাকরি খুঁজবেন, ব্যবসা করবেন, দক্ষতা বাড়াবেন, পরিশ্রম করবেন—এর পাশাপাশি বিশ্বাস রাখবেন যে রিজিকের প্রকৃত মালিক আল্লাহ।

অনেক সময় আমরা শুধু টাকা বাড়ার জন্য দোয়া করি। কিন্তু আরও সুন্দর হলো—আল্লাহর কাছে হালাল ও বরকতময় রিজিক চাওয়া। কারণ এমন অর্থ, যা অনেক হলেও শান্তি নেই, পরিবারের মধ্যে কল্যাণ নেই এবং আখিরাতে জবাবদিহির কারণ হয়, সেটি একজন মুমিনের প্রকৃত সফলতা নয়।

রিজিকে বরকতের জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট “গোপন আমল”কে নিশ্চিত ফর্মুলা হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়। বরং কোরআন-হাদিসের সামগ্রিক শিক্ষা হলো—তাকওয়া, হালাল উপার্জন, সত্যবাদিতা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, শুকরিয়া, সদকা, অপচয় থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করা। এসবের পাশাপাশি নিয়মিত নামাজ, তাওবা ও দোয়া একজন মুমিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তাই কারও রিজিকে বরকত দেখে শুধু তার আয়ের পরিমাণের দিকে তাকানো উচিত নয়। বরং ভাবা উচিত—সে কীভাবে উপার্জন করছে, কীভাবে ব্যয় করছে, আল্লাহর প্রতি তার কৃতজ্ঞতা কেমন, মানুষের সঙ্গে তার আচরণ কেমন এবং তার জীবনে হালাল-হারামের ব্যাপারে কতটা সতর্কতা রয়েছে।

আজকের শিক্ষা: রিজিকে বরকত মানে শুধু বেশি টাকা নয়; অল্পে তৃপ্তি, প্রয়োজন মেটার সহজতা, উপার্জনে শান্তি এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহারও বরকতের অংশ। তাই হালাল পথে উপার্জন করুন, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখুন, সামর্থ্য অনুযায়ী সদকা করুন, আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করুন এবং সব অবস্থায় তাঁর ওপর ভরসা রাখুন।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page