বর্তমান সময়ে ওজন নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি শোনা যায় ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’ বা আইএফ (IF) শব্দটি। প্রচলিত ডায়েট পরিকল্পনার মতো এটি নির্দিষ্ট খাবারের তালিকা নয়; বরং কখন খাবেন এবং কতক্ষণ খাবার থেকে বিরত থাকবেন, সেই সময়সূচির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি খাদ্যাভ্যাস।
বিশ্বজুড়ে অনেক মানুষ ওজন কমানো, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য এই পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। তবে এর সুবিধার পাশাপাশি কিছু সতর্কতার বিষয়ও রয়েছে।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কীভাবে কাজ করে?
সাধারণত খাবার গ্রহণের পর শরীর প্রথমে গ্লুকোজ থেকে শক্তি উৎপাদন করে। কিন্তু দীর্ঘ সময় খাবার না খেলে শরীর ধীরে ধীরে জমে থাকা চর্বিকে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। বিশেষজ্ঞরা এই পরিবর্তনকে ‘মেটাবলিক সুইচ’ বলে থাকেন।
আরও পড়ুন-ই-হেলথ কার্ড চালুর সুখবর দিলেন প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্যসেবায় আসছে বড় পরিবর্তন
এ কারণেই ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংকে অনেকেই ওজন কমানোর কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করেন।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের সম্ভাব্য উপকারিতা
১. ওজন ও শরীরের চর্বি কমাতে সহায়তা
নিয়ন্ত্রিত ক্যালোরি গ্রহণ এবং দীর্ঘ সময় না খাওয়ার কারণে শরীরে জমে থাকা চর্বি শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে। ফলে ওজন কমানোর প্রক্রিয়া সহজ হয়।
২. ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে পারে
গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং ইনসুলিন সংবেদনশীলতা উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
৩. কোষের স্বাভাবিক পুনর্গঠনে ভূমিকা
দীর্ঘ সময় ফাস্টিংয়ের ফলে শরীরে ‘অটোফ্যাগি’ নামের একটি প্রক্রিয়া সক্রিয় হতে পারে। এতে পুরোনো বা ক্ষতিগ্রস্ত কোষ পরিষ্কার হয়ে নতুন কোষ তৈরির প্রক্রিয়া সহজ হয় বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
৪. হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে
কিছু গবেষণায় রক্তচাপ, কোলেস্টেরল এবং প্রদাহজনিত কিছু সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি ১৬:৮
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের সবচেয়ে পরিচিত ধরন হলো ১৬:৮ পদ্ধতি। এতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬ ঘণ্টা কোনো ক্যালোরিযুক্ত খাবার না খেয়ে এবং বাকি ৮ ঘণ্টার মধ্যে দিনের সব খাবার গ্রহণ করা হয়। অনেকের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে অনুসরণ করা সম্ভব। তবে ব্যক্তিভেদে ফলাফল ভিন্ন হতে পারে।
কত দিন করা নিরাপদ?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৬:৮ ধরনের মাঝারি ফাস্টিং দীর্ঘ সময় অনুসরণ করা গেলেও নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ জরুরি। অন্যদিকে ২০ ঘণ্টা বা তার বেশি সময়ের কঠোর ফাস্টিং দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে গেলে পুষ্টির ঘাটতি, দুর্বলতা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বা অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কারা ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং এড়িয়ে চলবেন?
সবার জন্য এই পদ্ধতি উপযোগী নয়। বিশেষ করে—
- অন্তঃসত্ত্বা নারী।
- স্তন্যদানকারী মা।
- ১৮ বছরের কম বয়সী কিশোর-কিশোরী।
- স্বাভাবিকের তুলনায় কম ওজনের ব্যক্তি।
- যাদের ইটিং ডিসঅর্ডারের ইতিহাস রয়েছে।
- গুরুতর গ্যাস্ট্রিক বা আলসারের রোগী।
- বিশেষ ওষুধ গ্রহণকারী ডায়াবেটিস রোগী।
এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ফাস্টিং শুরু করা উচিত নয়।
ফাস্টিংয়ের সময় কী পান করা যায়?
ফাস্টিং চলাকালে পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। এছাড়া সাধারণত চিনি ছাড়া চা, ব্ল্যাক কফি বা ক্যালোরিমুক্ত পানীয় গ্রহণ করা যায়। তবে কোনো পানীয় ফাস্টিং ভেঙে দিতে পারে কি না, তা ব্যবহৃত উপাদানের ওপর নির্ভর করে।
শেষ কথা
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং ওজন নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যকর জীবনধারার একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি হলেও এটি কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। শুধু নির্দিষ্ট সময় না খেয়ে থাকলেই হবে না, খাবারের সময় পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নিজের স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনা করে প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
সূত্র:মায়ো ক্লিনিক
আরও পড়ুন-চিকিৎসা ব্যয় কমাতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিলো সরকার










