ঘি খেলে কি কোলেস্টেরল বাড়ে? কতটা খাওয়া নিরাপদ

লাইফস্টাইল প্রতিনিধি
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ৬:১৬ অপরাহ্ণ
ঘি খেলে কি কোলেস্টেরল বাড়ে? কতটা খাওয়া নিরাপদ

অতিরিক্ত ঘি খেলে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের কারণে LDL কোলেস্টেরল বাড়তে পারে।

ঘি বাঙালির খাবারের পরিচিত একটি উপাদান। ভাত, খিচুড়ি, ডাল কিংবা বিভিন্ন রান্নায় স্বাদ ও ঘ্রাণ বাড়াতে ঘি ব্যবহার করা হয়। আবার স্বাস্থ্য সচেতন অনেকেই ঘি নিয়ে দ্বিধায় থাকেন—ঘি খেলে কি কোলেস্টেরল বাড়ে? বিশেষ করে যাদের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি, তাদের জন্য এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।

ঘি একেবারে খারাপ খাবার নয়। এতে কিছু ফ্যাট-দ্রবণীয় ভিটামিন ও শক্তি সরবরাহকারী চর্বি থাকে। তবে ঘিতে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হওয়ায় বেশি পরিমাণে নিয়মিত খেলে রক্তের LDL বা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল বাড়তে পারে। তাই ঘি খাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিমাণ, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা।

ঘি খেলে কি সত্যিই কোলেস্টেরল বাড়ে?

ঘি মূলত দুধের চর্বি থেকে তৈরি। এতে স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, আর অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণ রক্তে LDL কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে পারে। LDL বেশি হলে ধমনিতে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমার ঝুঁকি বাড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

তবে এর অর্থ এই নয় যে অল্প পরিমাণ ঘি খেলেই কোলেস্টেরল বেড়ে যাবে। একজন ব্যক্তি প্রতিদিন কী ধরনের খাবার খান, কতটা শারীরিক পরিশ্রম করেন এবং তাঁর শরীরে কোলেস্টেরলের বর্তমান মাত্রা কেমন—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, ঘি নয়, অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণই মূল উদ্বেগের বিষয়।

ঘিতে কী ধরনের ফ্যাট থাকে?

ঘিতে প্রধানত ফ্যাট থাকে। এর মধ্যে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। শরীরের জন্য কিছু পরিমাণ ফ্যাট প্রয়োজন হলেও অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট নিয়মিত গ্রহণ করা হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়।

এ কারণে খাদ্যতালিকায় ঘি, মাখন, চর্বিযুক্ত মাংস ও অন্যান্য স্যাচুরেটেড ফ্যাটের উৎস একসঙ্গে বেশি থাকলে মোট ফ্যাট গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে বাদাম, বীজ, মাছ ও কিছু উদ্ভিজ্জ তেলে থাকা অসম্পৃক্ত ফ্যাট হৃদ্‌স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।

LDL ও HDL কোলেস্টেরলের পার্থক্য কী?

কোলেস্টেরল নিয়ে আলোচনা করতে গেলে LDL ও HDL-এর বিষয়টি বোঝা জরুরি।

LDL-কে সাধারণভাবে ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল বলা হয়। রক্তে এর মাত্রা বেশি হলে ধমনিতে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

অন্যদিকে HDL-কে ‘ভালো’ কোলেস্টেরল বলা হয়। এটি শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল সংগ্রহ করে তা অপসারণে ভূমিকা রাখে।

তাই শুধু মোট কোলেস্টেরল কত, সেটি দেখলেই পুরো পরিস্থিতি বোঝা যায় না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লিপিড প্রোফাইলের বিভিন্ন উপাদান বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রতিদিন ঘি খাওয়া কি ঠিক?

সুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে পরিমিত পরিমাণ ঘি খাদ্যতালিকায় থাকতে পারে। তবে ঘিকে স্বাস্থ্যকর খাবার ভেবে বেশি পরিমাণে খাওয়া ঠিক নয়।

বিশেষ করে ঘি দিয়ে রান্না করা খাবারের পাশাপাশি যদি মাখন, চর্বিযুক্ত মাংস, ভাজাপোড়া ও অন্যান্য উচ্চ স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার নিয়মিত খাওয়া হয়, তাহলে মোট স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ অনেক বেড়ে যেতে পারে।

তাই ঘি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিমাণের পাশাপাশি দিনের পুরো খাদ্যতালিকা বিবেচনা করা উচিত।

যাদের কোলেস্টেরল বেশি, তারা কি ঘি খেতে পারবেন?

যাদের LDL কোলেস্টেরল বেশি, হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি রয়েছে বা চিকিৎসক স্যাচুরেটেড ফ্যাট কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন, তাদের ঘি খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত।

এ ক্ষেত্রে ঘি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে কি না, তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। কারও কোলেস্টেরল সামান্য বেশি, আবার কারও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা তৈরি করাই সবচেয়ে নিরাপদ।

বিশেষ করে যারা ইতিমধ্যে কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ সেবন করছেন, তারা শুধু ঘি বাদ দেওয়া বা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিজে থেকে না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

ঘির পরিবর্তে কী ব্যবহার করা যায়?

রান্নায় ঘির ব্যবহার কমিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী অসম্পৃক্ত ফ্যাটের উৎস বেছে নেওয়া যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিজ্জ তেল ব্যবহার করা যায়।

তবে ‘স্বাস্থ্যকর তেল’ হলেও অতিরিক্ত তেল খাওয়া ঠিক নয়। কারণ সব ধরনের ফ্যাটেই ক্যালরি বেশি থাকে।

খাদ্যতালিকায় পরিমিত পরিমাণে মাছ, বাদাম, বীজ, শাকসবজি, ফল ও পূর্ণ শস্য রাখা যেতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো গুরুত্বপূর্ণ।

ঘি খাওয়ার সময় কোন ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন?

ঘি খাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি সাধারণ ভুল এড়িয়ে চলা উচিত।

প্রথমত, ঘিকে ওষুধ মনে করা ঠিক নয়। ঘি খেলে শরীরের সব ধরনের সমস্যা দূর হবে—এমন দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত ঘি খাওয়া উচিত নয়। খাবারে অল্প পরিমাণ ব্যবহার এবং আলাদা করে চামচে চামচে ঘি খাওয়া এক বিষয় নয়।

তৃতীয়ত, ঘির সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টি খাবার নিয়মিত খাওয়া ঠিক নয়। এতে মোট ক্যালরি গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে।

চতুর্থত, শুধু ঘি বাদ দিলেই কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে থাকবে—এমন ধারণাও ঠিক নয়। খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং পর্যাপ্ত ঘুমও গুরুত্বপূর্ণ।

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে কী খাবেন?

কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে খাদ্যতালিকায় আঁশযুক্ত খাবার বাড়ানো যেতে পারে। ওটস, ডাল, শাকসবজি, ফল ও পূর্ণ শস্য খাদ্যতালিকায় রাখা উপকারী হতে পারে।

মাছ ও উদ্ভিজ্জ উৎসের স্বাস্থ্যকর ফ্যাটও পরিমিতভাবে গ্রহণ করা যায়। অন্যদিকে অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস, ভাজাপোড়া, ট্রান্স ফ্যাট এবং অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার কমানো গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে খাবারের পরিমাণের দিকেও নজর দিতে হবে। স্বাস্থ্যকর খাবার হলেও অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি জমতে পারে।

ব্যায়ামও গুরুত্বপূর্ণ

শুধু খাদ্য পরিবর্তন করে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করে নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। হাঁটা, সাইক্লিং, সাঁতার বা বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী অন্যান্য ব্যায়াম করা যেতে পারে।

যাদের দীর্ঘদিন ব্যায়াম করার অভ্যাস নেই বা কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তারা নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন।

ঘি খেলে কি ওজনও বাড়তে পারে?

ঘি ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার এবং এতে ক্যালরি বেশি। তাই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ঘি খেলে মোট ক্যালরি গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ করলে ওজন বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।

ওজন বেশি হলে আবার উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের মতো বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও ঘির পরিমাণের দিকে নজর রাখা প্রয়োজন।

কাদের বেশি সতর্ক হওয়া উচিত?

বিশেষ করে যাদের—

  • LDL কোলেস্টেরল বেশি ।
  • হৃদ্‌রোগের ইতিহাস রয়েছে ।
  • অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা রয়েছে ।
  • ডায়াবেটিস রয়েছে ।
  • উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে ।
  • চিকিৎসক স্যাচুরেটেড ফ্যাট কমাতে বলেছেন ।

তাদের ঘি ও অন্যান্য চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার বিষয়ে বেশি সতর্ক থাকা উচিত।

ঘি খেলে কোলেস্টেরল বাড়তে পারে—বিশেষ করে অতিরিক্ত পরিমাণে নিয়মিত খেলে। কারণ ঘিতে স্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে, যা LDL কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে। তবে তাই বলে ঘি সবার জন্য নিষিদ্ধ খাবার নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ এবং পুরো খাদ্যতালিকায় স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ কম রাখা। কোলেস্টেরল বেশি থাকলে নিজের ইচ্ছায় খাদ্য পরিবর্তন বা ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page