বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন বন্ধে আইন আছে, বাস্তবে সুরক্ষা কতটা?

প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২১ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন বন্ধে আইন আছে, বাস্তবে সুরক্ষা কতটা?

আইন থাকলেও বাংলাদেশে শিশুদের প্রতি সহিংসতা এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়।

বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন, অবহেলা ও সহিংসতা ঠেকাতে আইন আছে। শিশুর সুরক্ষায় রয়েছে শিশু আইন, ২০১৩, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা। কিন্তু আইনি কাঠামো থাকার পরও বাস্তব চিত্রে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। ঘর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—বিভিন্ন পরিবেশে শিশুরা এখনো শারীরিক ও মানসিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে।

বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩-তে শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আইনের ৭০ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির হেফাজত, দায়িত্ব বা পরিচর্যায় থাকা শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন, অবহেলা, পরিত্যাগ বা অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখার মতো আচরণে শিশুর অযথা দুর্ভোগ সৃষ্টি হলে বা তার স্বাস্থ্যের গুরুতর ক্ষতি হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

sib news 2026 10 06 child rights day
আজ শিশু অধিকার দিবস
অক্টোবর ৬, ২০২৬

শিশু আইন শুধু শাস্তির বিধানেই সীমাবদ্ধ নয়। আইনের অধীনে শিশুর সুরক্ষা, কল্যাণ ও পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন কাঠামোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সুবিধাবঞ্চিত ও বিশেষ সুরক্ষা প্রয়োজন এমন শিশুদের জন্য বিকল্প পরিচর্যার ব্যবস্থার কথাও আইনে বলা হয়েছে।

আইনের সংস্পর্শে আসা শিশুদের জন্যও আলাদা সুরক্ষার বিধান রয়েছে। শিশু আইন অনুযায়ী, শিশুর মর্যাদা, বয়স, লিঙ্গ, অক্ষমতা ও পরিপক্বতার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে শিশুবান্ধব পরিবেশে তাদের সঙ্গে কথা বলার বিধান রয়েছে। ২০২৫ সালে শিশুদের জন্য পৃথক আদালত প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তকেও ইউনিসেফ শিশুদের অধিকার রক্ষায় বিচারব্যবস্থায় শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিল।

কিন্তু আইনের এই কাঠামোর বিপরীতে শিশুদের বাস্তব অভিজ্ঞতা উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু গত এক মাসে কোনো না কোনো ধরনের সহিংস শাসনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে শারীরিক শাস্তি ও মানসিক আগ্রাসন—দুই ধরনের আচরণই অন্তর্ভুক্ত।

ইউনিসেফের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে শিশুদের প্রতি সহিংসতার একটি বড় অংশ এমন মানুষদের কাছ থেকেই আসে, যাদের দায়িত্বই শিশুদের যত্ন ও সুরক্ষা দেওয়া। সংস্থাটির শিশু সুরক্ষা বিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জন শিশু কোনো না কোনোভাবে শারীরিক শাস্তি বা মানসিক আগ্রাসনের শিকার হয়।

শুধু শারীরিক নির্যাতন নয়, শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়েও শিশু অধিকার বাস্তবায়নের বড় বাধা। ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশু শিশুশ্রমে যুক্ত। একই জরিপে দেখা যায়, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছিল। অর্থাৎ আইন ও নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও শিশুর বড় একটি অংশ এখনো অল্প বয়সে শ্রম বা বিয়ের মতো পরিস্থিতিতে পড়ছে।

শিশু নির্যাতনের আরেকটি গুরুতর দিক হলো যৌন সহিংসতা। ২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল ইউনিসেফ। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত গণমাধ্যম ও স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নথিভুক্ত তথ্যে প্রায় ৫০টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা পাওয়া গিয়েছিল।

এসব তথ্য দেখায়, সমস্যাটি শুধু আইন না থাকার নয়; বরং আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তা, পরিবার ও সমাজের সচেতনতা এবং সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর শুধু মামলা করা যথেষ্ট নয়। তাকে নিরাপদ পরিবেশ, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, আইনি সহায়তা এবং প্রয়োজন হলে পুনর্বাসনের সুযোগও দিতে হয়।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো সহিংসতাকে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে দেখার প্রবণতা। শিশুকে শাসনের নামে মারধর বা মানসিকভাবে অপমান করাকে অনেক পরিবার এখনো গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখে না। অথচ শিশুর ওপর এ ধরনের আচরণ তার মানসিক বিকাশ ও ভবিষ্যৎ আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শুধু আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইতিবাচক ও সহিংসতামুক্ত শাসনব্যবস্থা নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

শিশু সুরক্ষায় রাষ্ট্রের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে। কোথাও কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হলে বিষয়টি গোপন না করে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং শিশুটিকে নিরাপদে রাখা জরুরি।

তাই প্রশ্নের সরল উত্তর হলো—বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন বন্ধে আইনি কাঠামো রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে সুরক্ষা এখনো পূর্ণাঙ্গ নয়। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী শিশুদের বড় অংশ এখনো সহিংস শাসনের শিকার হওয়া এবং শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ের উচ্চ হার সেই বাস্তবতারই ইঙ্গিত দেয়।

শিশু অধিকার দিবসে তাই শুধু আইন ও নীতিমালার কথা বললেই হবে না। দেখতে হবে, সেই আইন একটি নির্যাতিত শিশুর জীবনে কতটা নিরাপত্তা এনে দিতে পারছে। প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবার, সহিংসতামুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দ্রুত আইনি প্রতিকার এবং প্রয়োজনীয় মানসিক ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলেই আইনের সুরক্ষা বাস্তব অর্থে শিশুর সুরক্ষায় পরিণত হবে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page