এক আইডিতে সব সেবা, ব্যবসা শুরুর ঝামেলা কমছে

প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫০ অপরাহ্ণ
এক আইডিতে সব সেবা, ব্যবসা শুরুর ঝামেলা কমছে

এক আইডিতে ব্যবসার বিভিন্ন অনুমোদন

বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও সমন্বিত করতে উদ্যোক্তাদের জন্য স্বতন্ত্র বা ইউনিক বিজনেস আইডি চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। এই আইডি ব্যবহার করে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকেই ব্যবসা শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন লাইসেন্স, ছাড়পত্র ও অনুমোদনের আবেদন করা যাবে। সরকারের লক্ষ্য, কোম্পানি নিবন্ধনের পর ব্যবসা কার্যক্রম শুরু করতে বর্তমানে গড়ে যে দীর্ঘ সময় লাগে, তা কমিয়ে ১৪ দিনের মধ্যে নিয়ে আসা।

নতুন এই সংস্কার উদ্যোগটি যৌথভাবে বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইনভেস্ট বাংলাদেশ। ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত সরকারি সেবাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় আনার অংশ হিসেবে ‘বাংলাবিজ’ প্ল্যাটফর্মে ১৪ দিনের ‘বিজনেস রেডিনেস প্যাকেজ’ তৈরির কাজ চলছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে একটি কোম্পানি নিবন্ধনের পর ব্যবসা কার্যক্রম শুরু করতে উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন ধরনের অনুমোদন ও শর্ত পূরণ করতে হয়। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী ট্রেড লাইসেন্স, করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন, ব্যাংক হিসাব খোলা, অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র, পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ একাধিক সেবা নিতে হয়। এসব প্রক্রিয়ার মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি অনুমোদনের সঙ্গে অন্যটির সরাসরি নির্ভরতা থাকায় পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়ে যায়।

বিশেষ করে যেসব ব্যবসার জন্য আমদানি নিবন্ধন সনদ বা আইআরসি প্রয়োজন, সেসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সময়ের চাপ আরও বেশি দেখা দেয়। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খোলার আগে একাধিক পূর্বশর্ত পূরণ করতে হয়। ফলে কোম্পানি নিবন্ধন থেকে এলসি খোলা পর্যন্ত কোনো কোনো ব্যবসায় ১৮০ দিন থেকে ৩৫৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নতুন ব্যবস্থায় এই দীর্ঘসূত্রতা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সব শর্ত বা নিরাপত্তা বিধান বাতিল করা হবে। বরং কোন শর্ত ব্যবসা শুরুর আগেই পূরণ করা অপরিহার্য এবং কোনটি পরবর্তী পর্যায়ে পূরণ করা সম্ভব—তা পুনর্মূল্যায়ন করে প্রক্রিয়াটি সহজ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য নাহিয়ান রহমান রচির বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে একটি শর্ত পূরণের সঙ্গে আরেকটি শর্তের নির্ভরতা থাকায় ব্যবসা শুরু করতে বেশি সময় লাগে। নতুন সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো প্রয়োজনীয় শর্তগুলো বাতিল না করে পূর্বশর্তের সংখ্যা যৌক্তিকভাবে কমানো, কিছু শর্ত পরবর্তী পর্যায়ে পূরণের সুযোগ তৈরি করা এবং একাধিক প্রক্রিয়া একই সময়ে সম্পন্ন করা।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় একজন উদ্যোক্তা কোম্পানি নিবন্ধনের সময়ই একটি ইউনিক বিজনেস আইডি পাবেন। এরপর ওই আইডি ব্যবহার করে একটি একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকেই ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবার আবেদন করা যাবে। ফলে উদ্যোক্তাকে আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট বা কার্যালয়ে গিয়ে একই ধরনের তথ্য বারবার দেওয়ার প্রয়োজন কমবে।

এই বিজনেস আইডিকে কেন্দ্র করে উদ্যোক্তার ব্যবসা শুরুর পুরো প্রক্রিয়ার একটি ডিজিটাল রেকর্ডও তৈরি হবে। কোন অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে, কোনটি পাওয়া গেছে, কোনটি এখনো বাকি এবং কোনো আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে—এসব তথ্য একটি ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে দেখা যাবে। এর ফলে উদ্যোক্তার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কাছেও প্রক্রিয়ার অগ্রগতি স্পষ্ট থাকবে।

কোনো উদ্যোক্তা প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়ার পর ব্যবসা শুরু করে দিলে পরবর্তী পর্যায়ে যেসব শর্ত পূরণ করার কথা, সেগুলোর অগ্রগতিও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো জানতে পারবে। নির্ধারিত সময়ে কোনো শর্ত পূরণ না হলে প্রয়োজনে পরিদর্শন বা যৌথ পরিদর্শনের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা হবে। অর্থাৎ ডিজিটাল প্রক্রিয়াটি শুধু আবেদন নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো ব্যবসা শুরুর কার্যক্রমকে নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকার তিনটি মূল নীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রথমত, প্রয়োজনীয় শর্তপূরণে ছাড় দেওয়া হবে না। দ্বিতীয়ত, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। তৃতীয়ত, ব্যবসা শুরু করার আগেই যেসব পূর্বশর্ত পূরণ করা বাধ্যতামূলক, সেগুলোর সংখ্যা যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে কিছু শর্ত ব্যবসা শুরুর পর পূরণের সুযোগ তৈরি করা হবে।

ইনভেস্ট বাংলাদেশ এরই মধ্যে ব্যবসা শুরু করতে প্রয়োজনীয় ধাপগুলো এবং কোন পর্যায়ে কী ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, তার ম্যাপিং শেষ করেছে। কিছু ক্ষেত্রে বিধিমালা পরিবর্তনের কাজও শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি বাংলাবিজ প্ল্যাটফর্মে এরই মধ্যে তিন দিনের ‘বিজনেস স্টার্টার প্যাকেজ’ চালু হয়েছে এবং ১৪ দিনের ‘বিজনেস রেডিনেস প্যাকেজ’ তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে।

এর আগে গত ১ অক্টোবর সচিবালয়ে ব্যবসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ নিয়ে এক বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং সরকারি সেবাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত সেবাগুলোকে পর্যায়ক্রমে ডিজিটাল ও সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনার পাশাপাশি সেবাদানে স্বচ্ছতা, গতিশীলতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন।

এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে কোম্পানি নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও অনলাইনভিত্তিক করা এবং ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত করার কাজ চলছে। লক্ষ্য হলো উদ্যোক্তাদের একই তথ্য ও কাগজপত্র নিয়ে একাধিক দপ্তরে ঘুরতে না হয় এবং একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া যায়।

ইনভেস্ট বাংলাদেশের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সংস্কারের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের পর খাতভিত্তিক লাইসেন্সিং ব্যবস্থাকে আরও সহজ করার কাজ শুরু হবে। এ জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বাধীন কমিটি ইতোমধ্যে কয়েকটি অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করেছে।

সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা শুরুর প্রাথমিক ধাপ অনেকটাই সহজ হওয়ার পাশাপাশি অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে সময় ও প্রশাসনিক জটিলতা কমতে পারে। তবে ১৪ দিনের লক্ষ্য বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থার সমন্বিতভাবে ডিজিটাল ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়া, বিধিমালা সংস্কার এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা দেওয়ার সক্ষমতার ওপর।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

 

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page