ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের জন্য নতুন নিয়ম চালু করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। এখন থেকে ভারতীয় নাগরিকত্বের আবেদন করতে হলে আবেদনকারীকে নিজের দেশের পাসপোর্টসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে হবে। একই সঙ্গে পাসপোর্ট হস্তান্তর সম্পর্কিত লিখিত ঘোষণাপত্রও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যেই বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
আরও পড়ুন-বাংলাদেশি পাসপোর্টে ফিরছে ‘ইসরাইল ব্যতীত’ শর্ত, বদলাচ্ছে ই-পাসপোর্টের ডিজাইনও
নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে নাগরিকত্বের আবেদন করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের নিজেদের দেশের পাসপোর্ট সম্পর্কিত তথ্য নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। আবেদনকারীর কাছে বৈধ অথবা মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট থাকলে সেই পাসপোর্টের নম্বর, ইস্যুর তারিখ এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ লিখিতভাবে জমা দিতে হবে।
শুধু তাই নয়, আবেদনকারীদের একটি ঘোষণাপত্রও দিতে হবে। সেখানে উল্লেখ করতে হবে যে, ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তাদের কাছে থাকা বৈধ বা মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, ২০০৯ সালের নাগরিকত্ব বিধিমালায় সংশোধন এনে নতুন এই অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছে। নতুন বিধানটি মূলত বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান থেকে আসা নির্দিষ্ট ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
জানা গেছে, এই বিধান বিশেষভাবে হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের আবেদনকারীদের জন্য কার্যকর হবে। অর্থাৎ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ-এর আওতায় যারা ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে চান, তাদের ক্ষেত্রেই মূলত এই নতুন নিয়ম কার্যকর হবে।
এর আগে ২০১৯ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) পাস করেছিল। ওই আইনে বলা হয়, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে আসা নথিহীন অমুসলিম অভিবাসীরা ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
তবে আইনটি ঘোষণার পর থেকেই ভারতে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। বিভিন্ন রাজ্যে আন্দোলন, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচিও দেখা যায়। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, এই আইন ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব নির্ধারণের সুযোগ তৈরি করছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি ছিল, প্রতিবেশী দেশগুলোতে নির্যাতনের শিকার সংখ্যালঘুদের মানবিক সহায়তা দিতেই এই আইন আনা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন পাসপোর্ট তথ্য জমা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত মূলত নাগরিকত্ব আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও তথ্যনির্ভর ও যাচাইযোগ্য করার অংশ। কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, আবেদনকারীদের পরিচয়, পূর্ববর্তী নাগরিকত্ব এবং ভ্রমণ নথির তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে সমালোচকদের একাংশ বলছেন, নতুন নিয়মের ফলে আবেদন প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যেসব আবেদনকারীর পুরোনো পাসপোর্ট হারিয়ে গেছে বা যাদের কাছে প্রয়োজনীয় নথি নেই, তারা নতুন সমস্যায় পড়তে পারেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় অভিবাসন, নাগরিকত্ব এবং সীমান্ত রাজনীতি এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ইস্যু। ফলে ভারতের নাগরিকত্ব নীতির যেকোনো পরিবর্তন প্রতিবেশী দেশগুলোতেও আলোচনার জন্ম দেয়।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নতুন এই নিয়ম নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি নাগরিকত্ব প্রক্রিয়াকে আরও নিয়ন্ত্রিত ও স্বচ্ছ করবে। আবার অন্যদের মতে, এতে আবেদনকারীদের প্রশাসনিক জটিলতা বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব ব্যক্তি ভারতের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে আগ্রহী, তাদের উচিত অফিসিয়াল সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা। একই সঙ্গে গুজব বা অননুমোদিত তথ্যের ওপর নির্ভর না করে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে ভারতের নাগরিকত্ব আবেদন প্রক্রিয়ায় নতুন এই পাসপোর্ট-সংক্রান্ত শর্ত যোগ হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ভবিষ্যতে এই নিয়ম বাস্তবায়নের ফলে আবেদন প্রক্রিয়ায় কী ধরনের প্রভাব পড়ে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
সূত্র:ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি,
আরও পড়ুন-জাপানে ১৬ খাতে কর্মী নিচ্ছে বাংলাদেশ থেকে ৩ লাখের বেশি জনশক্তির বড় সুযোগ









