জ্বালানিসংকটে অর্ধেকে নেমেছে পোশাক উৎপাদন
গ্যাসসংকটে সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে অধিকাংশ পোশাক কারখানা
তীব্র গ্যাস ও জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার চাপে দেশের তৈরি পোশাক খাত। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় দেশের বেশির ভাগ পোশাক কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম ব্যবহার করতে পারছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি বিজিএমইএর নেতারা। একই সঙ্গে গত তিন বছরে উচ্চ ব্যয় ও অর্ডার সংকটের কারণে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্যও তারা জানিয়েছেন।
বুধবার ২ সেপ্টেম্বর বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদের একটি প্রতিনিধিদল। এ সময় দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বর্তমান সংকট, রপ্তানি পরিস্থিতি, বিনিয়োগ, জ্বালানি সরবরাহ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বিজিএমইএর নেতারা রাষ্ট্রপতিকে জানান, গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের রপ্তানি আদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর ডাইং, ওয়াশিং ও স্পিনিং কারখানাগুলোতে সংকটের প্রভাব তুলনামূলক বেশি পড়ছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
এর সঙ্গে গত কয়েক বছরে পোশাক উৎপাদনের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিজিএমইএর হিসাবে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, মজুরি সমন্বয় এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের কারণে তিন বছরে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার চাপ ও রপ্তানি আদেশের অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
বিজিএমইএর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কমেছে বলে জানানো হয়েছে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ার সঙ্গে রপ্তানি বাজার ধরে রাখার বিষয়টিও এখন শিল্পটির জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।
নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ধীরগতি দেখা দিয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়াকে এর অন্যতম ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবর্তে বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান কারখানা সচল রাখা, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ক্রয়াদেশ ধরে রাখার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে পোশাক শিল্পকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে রাষ্ট্রপতির কাছে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছে বিজিএমইএ। এর মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে দুটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং এলএনজি আমদানির পর্যায়ে শুল্ক ও কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি পোশাক কারখানাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য স্বল্প সুদের বিশেষ ঋণ দেওয়ারও সুপারিশ করেছে সংগঠনটি। উদ্যোক্তাদের মতে, বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থায় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করতেও বেশ কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অস্থায়ীভাবে অতিরিক্ত কার্গো শেড তৈরি এবং বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ দ্রুত শেষ করে চালুর দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পণ্য পরিবহন ও রপ্তানি প্রক্রিয়ায় সময় ও ব্যয় কমবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
ব্যাংকিং খাতেও সহায়তা চেয়েছে পোশাকশিল্পের শীর্ষ সংগঠনটি। চলতি মূলধন ও বাণিজ্য ঋণের সুদের হার কমানো, পোশাক খাতের জন্য বিশেষ পোস্ট-শিপমেন্ট ফাইন্যান্সিং চালু এবং গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড ও টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও সময় কমাতে কাস্টমস বন্ড অডিট প্রক্রিয়া সহজ এবং প্রাতিষ্ঠানিক করার কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পোশাকশিল্পের কাঁচামাল দ্রুত আমদানির সুবিধার্থে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানির প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছে বিজিএমইএ।
এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ নিয়ে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে এফটিএ, পিটিএ ও ইপিএ সম্পাদনে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
শ্রমিকদের কল্যাণের বিষয়েও প্রস্তাব দিয়েছে বিজিএমইএ। গাজীপুরে পোশাক শ্রমিকদের জন্য আধুনিক হাসপাতাল ও কল্যাণকেন্দ্র নির্মাণে দ্রুত জমি বরাদ্দ এবং ঝুট ব্যবসাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানানো হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিজিএমইএ নেতাদের বক্তব্য গুরুত্বসহকারে শোনেন। তিনি তৈরি পোশাক শিল্পকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে সাময়িক প্রতিকূলতা কাটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। শিল্পের টেকসই বিকাশ ও সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাসও দেন।
সাক্ষাতে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করার উদ্যোগসহ বিভিন্ন সরকারি পদক্ষেপের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। বন্ধ ও নিষ্ক্রিয় পোশাক কারখানা পুনরায় চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন, নন-বন্ডেড কারখানায় বন্ডেড কাঁচামাল সংগ্রহ ও সরাসরি রপ্তানির সুযোগ এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করার মতো উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান সংকট তাই শুধু কারখানার উৎপাদন কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন, রপ্তানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই চাপ আরও বাড়তে পারে। এ অবস্থায় দ্রুত জ্বালানি নিশ্চয়তা, অর্থায়ন সুবিধা ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগকে শিল্পটির ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যসূত্র: বিজিএমইএ, বাসস ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
