বিশ্ববাজারে কমলো জ্বালানি তেলের দাম আর বাংলাদেশে বৃদ্ধি পেল

প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:১০ পূর্বাহ্ণ
বিশ্ববাজারে কমলো জ্বালানি তেলের দাম আর বাংলাদেশে বৃদ্ধি পেল

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমার খবরের মধ্যেই বাংলাদেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। নতুন দর অনুযায়ী, সোমবার থেকে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রোববার রাতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে নতুন দাম কার্যকর করার ঘোষণা দেয়।

বাংলাদেশে নতুন দাম কার্যকর হওয়ার দিনেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দর কিছুটা কমেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যেও সৌদি আরব থেকে জ্বালানি সরবরাহ বাড়তে পারে এবং কূটনৈতিক তৎপরতায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে—এমন প্রত্যাশায় সোমবার তেলের দামে পতন দেখা যায়। ওই দিন ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ০৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৭১ ডলারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ২ দশমিক ১৪ শতাংশ কমে ৯৮ দশমিক ১৫ ডলারে নেমে আসে।

এর আগে রোববার রাতে বাংলাদেশের সরকার যখন নতুন দাম ঘোষণা করে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ ও সরবরাহ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানিতে উচ্চ ব্যয়ের চাপের কথা তুলে ধরা হয়। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মার্চ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও দেশের বাজারে সেই অনুপাতে দাম সমন্বয় করা হয়নি বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

সরকারের হিসাবে, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে দেশের বাজারের দামের পার্থক্যের কারণে শুধু ডিজেল বিক্রিতেই বিপিসির প্রতি লিটারে প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে দৈনিক লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১০৯ কোটি টাকা এবং একই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।

লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে সরকার মনে করছে। একই সঙ্গে দেশে জ্বালানি তেলের দাম প্রতিবেশী ও অন্যান্য দেশের তুলনায় কম থাকায় সীমান্তপথে পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে বলে সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের দেওয়া তুলনামূলক হিসাব অনুযায়ী, নতুন দাম কার্যকর হওয়ার আগে বাংলাদেশে ডিজেলের দাম ছিল লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা। একই সময়ে ভারতের কলকাতায় ডিজেলের দাম প্রায় ১৩৫ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৫ টাকা, নেপালে ১৬১ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা এবং পাকিস্তানে ১৮৫ টাকার কাছাকাছি ছিল। এ ধরনের দামের পার্থ্যকে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকির একটি কারণ হিসেবে দেখিয়েছে সরকার।

এদিকে নতুন মূল্য কাঠামোয় শুধু আন্তর্জাতিক বাজারদর নয়, কর, শুল্ক, বিপণন কোম্পানির মার্জিন, পরিবহন ব্যয় এবং বিপিসির বিভিন্ন তহবিলের অর্থও যুক্ত করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনের হিসাবে কর-পরবর্তী এক্স-রিফাইনারি মূল্যের সঙ্গে এসব ব্যয় ও মার্জিন যোগ করে ভোক্তা পর্যায়ে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন দরে ডিজেল ১৩৫ টাকা হওয়ায় মার্চের তুলনায় এ জ্বালানির দাম লিটারপ্রতি ৩৫ টাকা বেড়েছে। একইভাবে অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা হয়ে ৪৫ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৬০ টাকা হয়ে ৪৪ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা হয়ে ৪৩ টাকা বেড়েছে। এপ্রিল ও জুনে কয়েক দফা দাম সমন্বয়ের পর জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আগের দাম বহাল ছিল।

এর আগে ১৯ এপ্রিল সরকার চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছিল। তখন ডিজেল ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা করা হয়। পরে জুনে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়।

জ্বালানি তেলের নতুন দাম বাড়ানোর ফলে পরিবহন, কৃষি এবং পণ্য পরিবহনের খরচে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ডিজেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় পণ্য পরিবহন ও বিভিন্ন উৎপাদন খাতে ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর পরোক্ষ প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়তে পারে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। এ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য, আমদানি ব্যয়, শুল্ক ও কর, ডলারের বিনিময় হার, বিপিসির মার্জিন, ভ্যাট এবং বিতরণ ব্যয়সহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে এবারের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিপিসির বড় অঙ্কের লোকসান, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, পরিবহন ব্যয় এবং দেশে ও বিদেশে দামের ব্যবধানকে বিশেষভাবে সামনে এনেছে সরকার।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সোমবারের পতনটি বাংলাদেশের নতুন খুচরা মূল্য ঘোষণার সঙ্গে সরাসরি তুলনা করার ক্ষেত্রে সময়ের পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের নতুন দাম নির্ধারণের সিদ্ধান্ত রোববার রাতে ঘোষণা করা হয় এবং সোমবার থেকে তা কার্যকর হয়েছে; আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের দর সোমবার পরবর্তী সময়ে কমেছে। ফলে এক দিনের আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওঠানামা দিয়ে বাংলাদেশের খুচরা মূল্য নির্ধারণের পুরো প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করা যায় না। তবে বিশ্ববাজারে দাম কমার প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়বে কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page