রাজধানীর সড়কে ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের শনাক্ত করতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও বিস্তৃত করতে যাচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। রাজধানীর বিভিন্ন সিগন্যাল বাতির খুঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ধাপে ধাপে মোট ৫০০টি এআইভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ব্যস্ত সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ১২০টির বেশি এআই-চালিত ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং এগুলোর মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন-ট্রাফিক আইন ভাঙলে এবার সরাসরি চালকের বিরুদ্ধে মামলা
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত ক্যামেরা থেকে সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এই প্রযুক্তি শুধু যানবাহনের চলাচল পর্যবেক্ষণই করছে না, বরং বিভিন্ন ধরনের ট্রাফিক অপরাধও স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এআইভিত্তিক এই ক্যামেরাগুলো ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য, স্টপ লাইনের সামনে চলে যাওয়া, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, বেআইনিভাবে লেন পরিবর্তন, জেব্রা ক্রসিং দখল, অবৈধ পার্কিং, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, সিটবেল্ট ব্যবহার না করা এবং অনুমোদনহীন ভিআইপি লাইট ব্যবহারের মতো নানা ধরনের অপরাধ শনাক্ত করতে পারছে।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ মে থেকে রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে পরীক্ষামূলকভাবে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু হয়। এর আগে গত ২৯ এপ্রিল ডিএমপি সদর দপ্তরে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির এই প্রযুক্তিনির্ভর সফটওয়্যারের উদ্বোধন করেন। এরপর ৩ মে গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রাজধানীর চালক ও যানবাহনের মালিকদের ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে ট্রাফিক মামলা দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়।
বর্তমানে এআই সফটওয়্যার কোনো আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করলে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের নম্বর বিশ্লেষণ করে মালিকের তথ্য বের করছে। এরপর ডিজিটাল পদ্ধতিতে মামলা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। ফলে সড়কে দায়িত্বহীন আচরণ করলেও তা আর সহজে আড়াল করার সুযোগ থাকছে না।
এদিকে নতুন এই প্রযুক্তিকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে ইতোমধ্যে একজন মোটরসাইকেল আরোহী আইনের মুখোমুখি হয়েছেন। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর লালবাগ এলাকার বাসিন্দা মো. লাবলু হক তার মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেটের তিনটি ডিজিট ইচ্ছাকৃতভাবে ঢেকে রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় চলাচল করেন। পরে সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে।
ঘটনার পর ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ বিভিন্ন এলাকার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মোটরসাইকেলের ধরন, নম্বর প্লেট এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করে। পরবর্তীতে তাকে আটক করে আদালতে পাঠানো হলে আদালত এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং দুই হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেন।
মঙ্গলবার রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, নতুন প্রযুক্তি চালুর পর অনেকেই এটিকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। তবে ডিএমপির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে এবং এসব ঘটনা শনাক্ত করার সক্ষমতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি আরও জানান, খুব শিগগিরই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। যেসব যানবাহনের নম্বর প্লেট অস্পষ্ট, ভাঙা, বিকৃত অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে আংশিক ঢেকে রাখা হয়েছে, সেসব যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শুধু জরিমানাই নয়, ভবিষ্যতে ডিমেরিট পয়েন্ট পদ্ধতির মাধ্যমে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকেও পয়েন্ট কেটে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং দুর্ঘটনা কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর এই নজরদারি ব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, রাজধানীর সব গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এআই ক্যামেরা স্থাপন সম্পন্ন হলে ট্রাফিক আইন প্রয়োগ আরও কার্যকর হবে এবং চালকদের মধ্যে আইন মেনে চলার প্রবণতাও বৃদ্ধি পাবে।
তথ্যসূত্র:ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ।
আরও পড়ুন-আজ থেকেই ঢাকার রাস্তায় এআই ক্যামেরায় অটো মামলা ট্রাফিক আইন চালু








