চিকুনগুনিয়া কী? কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা, ডেঙ্গুর সঙ্গে পার্থক্য ও প্রতিকার
চিকুনগুনিয়ার লক্ষণ
বর্ষাকাল এলেই বাংলাদেশে মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়াও এমন একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে কয়েক দিন থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত ব্যাহত করতে পারে। বিশেষ করে হঠাৎ তীব্র জ্বর, অসহনীয় জয়েন্টে ব্যথা এবং দুর্বলতার কারণে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ একরকম হওয়ায় রোগটি শনাক্ত করতেও বিভ্রান্তি দেখা দেয়।
চিকুনগুনিয়া সাধারণত প্রাণঘাতী না হলেও সময়মতো সঠিক যত্ন ও চিকিৎসা না নিলে দীর্ঘদিন জয়েন্টের ব্যথা, ক্লান্তি এবং শারীরিক দুর্বলতা থেকে যেতে পারে। তাই রোগটি সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা, প্রাথমিক লক্ষণ চেনা এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে এডিস মশার বিস্তার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকিও বেড়েছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা সহজেই বংশবিস্তার করে। ফলে পরিবারে একজন আক্রান্ত হলে আশপাশের পরিবেশও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে, যদিও এই রোগ সরাসরি একজন থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়ায় না।
চিকুনগুনিয়া কি ধরনের রোগ
চিকুনগুনিয়া একটি ভাইরাসজনিত মশাবাহিত সংক্রামক রোগ। এটি চিকুনগুনিয়া ভাইরাস (CHIKV) দ্বারা হয় এবং আক্রান্ত এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়।
এই রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো হঠাৎ উচ্চমাত্রার জ্বর এবং তীব্র জয়েন্টে ব্যথা। অনেক ক্ষেত্রে হাত, পা, আঙুল, কবজি, হাঁটু ও গোড়ালির জয়েন্টে এমন ব্যথা হয় যে রোগীর স্বাভাবিকভাবে হাঁটা বা কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
চিকুনগুনিয়া সব বয়সের মানুষের হতে পারে। তবে বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন মানুষের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে।
চিকুনগুনিয়া রোগের কারণ
চিকুনগুনিয়ার প্রধান কারণ হলো এডিস ইজিপ্টি (Aedes aegypti) এবং এডিস অ্যালবোপিক্টাস (Aedes albopictus) মশার কামড়। যখন কোনো এডিস মশা চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ায়, তখন ভাইরাসটি মশার শরীরে প্রবেশ করে। পরে সেই মশা অন্য কাউকে কামড়ালে ভাইরাসটি তার শরীরে সংক্রমিত হয়।
এই মশাগুলো সাধারণত দিনের বেলায় বেশি সক্রিয় থাকে, বিশেষ করে সকাল ও বিকেলে। বাড়ির আশপাশে ফুলের টব, টায়ার, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র বা যেকোনো স্থির পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে। তাই জমে থাকা পরিষ্কার পানি চিকুনগুনিয়া বিস্তারের অন্যতম কারণ।
চিকুনগুনিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার
চিকুনগুনিয়ার লক্ষণ সাধারণত আক্রান্ত মশার কামড়ের ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে দেখা দেয়।
সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো—
- হঠাৎ ১০২–১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর ।
- তীব্র জয়েন্টে ব্যথা ।
- শরীর ব্যথা ।
- মাথাব্যথা ।
- চোখের পেছনে ব্যথা ।
- দুর্বলতা ।
- ত্বকে লালচে র্যাশ ।
- বমি বমি ভাব ।
রোগের প্রতিকার হিসেবে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, প্রচুর পানি পান, ওরস্যালাইন, পুষ্টিকর খাবার এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। যদি শ্বাসকষ্ট, অচেতনতা, রক্তক্ষরণ বা অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
চিকুনগুনিয়া হলে করণীয়
চিকুনগুনিয়া হলে আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। জ্বর থাকলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে এবং শরীরে পানিশূন্যতা যেন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, স্যুপ ও ফলের রস পান করা উপকারী।
নিজে থেকে ব্যথানাশক বা অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা ঠিক নয়। বিশেষ করে ডেঙ্গু নিশ্চিতভাবে বাদ না দেওয়া পর্যন্ত কিছু ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। মশারির ভেতরে থাকা এবং মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করাও জরুরি, যাতে আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে অন্য মশা ভাইরাস বহন করতে না পারে।
চিকুনগুনিয়া রোগের ঔষধ
বর্তমানে চিকুনগুনিয়া ভাইরাস নির্মূল করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো রোগের উপসর্গ কমানো। সাধারণত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জ্বর কমানোর ওষুধ, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, বিশ্রাম এবং প্রয়োজনে ব্যথা নিয়ন্ত্রণের ওষুধ দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন-ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন
ডেঙ্গু পরীক্ষা ছাড়া নিজে থেকে আইবুপ্রোফেন বা অনুরূপ কিছু ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। তাই যেকোনো ওষুধ অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে।
চিকুনগুনিয়া রোগের খাবার
চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলে পুষ্টিকর ও সহজপাচ্য খাবার খাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন—
- পর্যাপ্ত পানি ।
- ওরস্যালাইন।
- ডাবের পানি ।
- লেবুর শরবত ।
- ফলের রস ।
- স্যুপ ।
- ভাত ।
- খিচুড়ি ।
- মাছ ।
- ডিম ।
- সবুজ শাকসবজি ।
- ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল ।
অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত, ভাজাপোড়া ও অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চলা ভালো।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া পার্থক্য
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া উভয়ই এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ালেও দুটি ভিন্ন ভাইরাসের কারণে হয়। চিকুনগুনিয়ায় সাধারণত তীব্র জয়েন্টে ব্যথা বেশি হয়, যা অনেকদিন স্থায়ী হতে পারে। অন্যদিকে ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট কমে যাওয়া, রক্তক্ষরণ এবং শকের ঝুঁকি বেশি থাকে। শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিত হওয়া কঠিন। তাই জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত।
চিকুনগুনিয়া কোন মশার কামড়ে হয়
চিকুনগুনিয়া মূলত এডিস ইজিপ্টি এবং এডিস অ্যালবোপিক্টাস মশার কামড়ে হয়। এই মশাগুলো পরিষ্কার জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে এবং দিনের বেলায় বেশি কামড়ায়। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ করা, মশারি ব্যবহার এবং মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করলে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
চিকুনগুনিয়া হলে কি খাওয়া উচিত?
চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলে পর্যাপ্ত পানি, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, ফল, শাকসবজি, স্যুপ, ভাত, খিচুড়ি, মাছ, ডিম এবং ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। এতে পানিশূন্যতা কমে এবং দ্রুত সুস্থ হতে সহায়তা করে।
চিকুনগুনিয়া কত দিনে ভালো হয়?
বেশিরভাগ রোগীর জ্বর ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে কমে যায়। তবে জয়েন্টের ব্যথা কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত থাকতে পারে। রোগীর বয়স ও শারীরিক অবস্থার ওপর সুস্থ হওয়ার সময় নির্ভর করে।
চিকনগুনিয়ার লক্ষণ ও চিকিৎসা কী?
চিকুনগুনিয়ার প্রধান লক্ষণ হলো হঠাৎ জ্বর, তীব্র জয়েন্টে ব্যথা, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, র্যাশ ও দুর্বলতা। চিকিৎসার মূল ভিত্তি হলো বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ।
চিকনগুনিয়া কি ছোঁয়াচে?
না। চিকুনগুনিয়া একজন আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসে সরাসরি আরেকজনের শরীরে ছড়ায় না। এটি শুধুমাত্র চিকুনগুনিয়া ভাইরাস বহনকারী আক্রান্ত এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়।
উপসংহার
চিকুনগুনিয়া একটি মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ হলেও সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। জ্বর ও তীব্র জয়েন্টে ব্যথা দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার, প্রচুর তরল পান এবং মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকা দ্রুত সুস্থ হওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করাও সমান জরুরি।
আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
