ঢাকাসহ দেশে রাতভর তিনবার ভূমিকম্প, কোথায় কত মাত্রা
রাতভর তিন দফা ভূমিকম্পে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় কম্পন
রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় রাতভর তিন দফা ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়েছে। শনিবার (৩ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১২টা ১২ মিনিট থেকে রোববার (৪ অক্টোবর) রাত ১টা ২৭ মিনিটের মধ্যে মিয়ানমার, ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরা অঞ্চলে এসব ভূমিকম্প হয়। এর মধ্যে দুটি ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল প্রায় ৫ এবং আরেকটির মাত্রা ৩ দশমিক ৮। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কম্পন অনুভূত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঢাকাতেও শেষ দফার ভূমিকম্পের হালকা কম্পন অনুভূত হয়েছে। এখন পর্যন্ত এসব ঘটনায় কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় ভূকম্প বিজ্ঞান কেন্দ্র বা EMSC-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা ১২ মিনিটে মিয়ানমারে ৪ দশমিক ৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমারের একটি এলাকায় এবং এর গভীরতা ছিল প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। আন্তর্জাতিক ভূকম্পন তথ্যেও ঘটনাটি ৪ দশমিক ৯ মাত্রার হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।
প্রথম ভূমিকম্পটির কম্পন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় অনুভূত হয়। বিশেষ করে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তবর্তী এলাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে মানুষ কম্পন অনুভব করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। মিয়ানমারের ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে খুব বেশি দূরে না হওয়ায় এর প্রভাব বাংলাদেশের কিছু এলাকায় অনুভূত হয়েছে।
এর মাত্র এক মিনিট পর, রাত ১২টা ১৩ মিনিটে ভারতের মিজোরাম ও বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় আরও শক্তিশালী একটি ভূমিকম্প হয়। EMSC-এর তথ্য অনুযায়ী, এটির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ০ এবং উৎপত্তিস্থল ছিল ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত অঞ্চল। ভূমিকম্পটির গভীরতা প্রায় ১৮ কিলোমিটার বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজির তথ্যেও একই সময়ের কাছাকাছি মিয়ানমার ও মিজোরাম অঞ্চলে ভূকম্পন নথিভুক্ত হয়েছে।
মিজোরামের ভূমিকম্পটির কম্পনও বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় অনুভূত হয়। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালীসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মানুষ কম্পন টের পান। আন্তর্জাতিক ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল মিজোরামের লুংলেই এলাকার কাছাকাছি এবং এটি অপেক্ষাকৃত অগভীর হওয়ায় আশপাশের এলাকায় কম্পন তুলনামূলকভাবে স্পষ্টভাবে অনুভূত হতে পারে।
এরপর প্রায় এক ঘণ্টা ১৪ মিনিট পর, রাত ১টা ২৭ মিনিটে ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চলে আরও একটি ভূমিকম্প হয়। EMSC-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৮ এবং উৎপত্তিস্থলের গভীরতা প্রায় ৩০ কিলোমিটার। ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল ত্রিপুরার ধলাই এলাকায়, যা আগরতলা অঞ্চলের কাছাকাছি। এটির হালকা কম্পন ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় অনুভূত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর তিনটি ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় অনেকের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে প্রথম দুটি ভূমিকম্পের মাত্রা প্রায় ৫ হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে আসেন বলে স্থানীয়ভাবে খবর পাওয়া গেছে। তবে এখন পর্যন্ত এসব কম্পনের কারণে কোনো ভবন ধসে পড়া, বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ পাওয়া প্রতিবেদনে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার কথা জানানো হয়েছে।
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশের বাইরে হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভৌগোলিক ও ভূতাত্ত্বিক সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা মাইক্রোপ্লেটের প্রভাব রয়েছে। দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর কারণে বাংলাদেশে এবং আশপাশের এলাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে সিলেট, চট্টগ্রাম ও আশপাশের অঞ্চল ভূমিকম্পের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময়ে সতর্ক করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের পূর্বাভাস নির্দিষ্টভাবে দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে একটি ভূমিকম্পের পরপরই বড় কোনো ভূমিকম্প আসছে—এমন ধারণা করে আতঙ্কিত হওয়ার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আবার কম্পন অনুভূত হওয়ার ঘটনাকে হালকাভাবে নেওয়ারও সুযোগ নেই। বরং ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় ভবনের নিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন পথ, পরিবারের সদস্যদের করণীয় এবং জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পর্কে আগে থেকেই প্রস্তুতি রাখা গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা আতঙ্কের পরিবর্তে প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ঢাকার ক্ষেত্রে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ নগরী হওয়ায় বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে ভবন ধসের পাশাপাশি সরু সড়ক, যানজট, বিদ্যুৎ ও গ্যাসলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং উদ্ধারকাজে প্রতিবন্ধকতার মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসছেন। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ঢাকায় সম্ভাব্য ভূমিকম্প-নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ৪৪৫টি স্থান চিহ্নিত করার কথা জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ২৫৬টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৮৯টি স্থান রয়েছে বলে জানানো হয়।
ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার পরিবর্তে ঘরের ভেতরে থাকলে শক্ত টেবিল বা মজবুত আসবাবের নিচে আশ্রয় নেওয়া, জানালা ও কাচ থেকে দূরে থাকা এবং লিফট ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। বাইরে থাকলে ভবন, বৈদ্যুতিক তার ও অন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা থেকে দূরে খোলা জায়গায় সরে যাওয়াই নিরাপদ। ভূমিকম্প থেমে যাওয়ার পর ভবনে নতুন ফাটল বা কাঠামোগত ক্ষতির লক্ষণ দেখা গেলে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়।
রাতভর পরপর তিনটি ভূমিকম্পের ঘটনায় আপাতত কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য না থাকলেও সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভূমিকম্পের মাত্রা, গভীরতা ও উৎপত্তিস্থলের তথ্য বিভিন্ন ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ সংস্থার বিশ্লেষণের পর সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে। তাই নতুন কোনো ভূমিকম্প বা ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেলে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুসরণ করাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।
সবশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার, মিজোরাম ও ত্রিপুরায় সংঘটিত তিনটি ভূমিকম্পের কম্পন বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় অনুভূত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। রাতের পরপর কয়েক দফা কম্পনে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হলেও পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
