বন্ধ হলো বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ, বেকার দুই হাজার শ্রমিক

প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৮ অপরাহ্ণ
বন্ধ হলো বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ, বেকার দুই হাজার শ্রমিক

পাঁচ মাস ধরে বন্ধ লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ।

পাঁচ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার রাখালিয়া এলাকার বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ। এতে কারখানাটির প্রায় দুই হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে কাজ না থাকায় তাঁদের অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

কাজ হারানো শ্রমিকদের ভাষ্য, পুরুষ কর্মীদের অনেকেই বিকল্প কাজ বা অন্য কোথাও যুক্ত হতে পারলেও চরম বিপাকে পড়েছেন নারী কর্মীরা। সোনাপুর এলাকার শ্রমিক সুমি আক্তার বলেন, “পুরুষ শ্রমিকদের অনেকে অন্যত্র নতুন কাজ পেয়ে গেছে। কিন্তু আমরা যুবতী ও মধ্যবয়সী নারীরা কোথাও কাজ পাচ্ছি না। বিসিক শিল্প নগরীতে যোগাযোগ করেও কোনো ব্যবস্থা হয়নি। বিধবা বা একার আয়ে চলা নারীদের টিকে থাকাই এখন দায়।”

একই কথা জানান স্থানীয় বাসিন্দা মো. মাসুম, হাবিবুর রহমান ও মানিক হোসেন। তারা জানান, জমানো সামান্য টাকা দিয়ে দিন পার করলেও বাজারে নতুন কাজের সুযোগ সীমিত এবং মজুরিও অত্যন্ত কম।

রহিমা আক্তার (ছদ্মনাম), বয়স ৩৫ বছর। প্রায় ১০ বছর আগে স্বামী মারা গেছেন। কলেজপড়ুয়া দুই মেয়ে ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে কষ্টে দিন পার করছিলেন তিনি। গ্রামের এক ব্যক্তি মাসিক ৬ হাজার টাকা বেতনের কথা বলে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার রাখালিয়া গ্রামের বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজে তার চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। বেতন-বোনাস নিয়ে ভালোই চলছিল তাদের সংসার। কিন্তু হঠাৎ বৃহত্তর নোয়াখালীর অন্যতম শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অসহায় রহিমা বেগমসহ পরিবারের চার সদস্য মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজের অসহায় নারী শ্রমিক রহিমা বেগম ও সুমি আক্তারসহ ১২ জন নারী ও পুরুষ শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয়। তাদের কারও বাবা, মা কিংবা স্বামী নেই। গত পাঁচ মাস ধরে দুই বেলা না খেয়েও মানবেতর জীবন পার করতে হচ্ছে তাদের।

পাঁচ মাস ধরে রায়পুরের বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ বন্ধ রয়েছে। এতে কারখানাটির প্রায় দুই হাজার কর্মী বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

এর আগে বন্ধ থাকা কারখানার এসব শ্রমিক কারখানা খুলে দেওয়া ও বকেয়া বেতনের দাবিতে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেন। এসব শ্রমিককে সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। ব্যাংকিং জটিলতা নিরসন করে কারখানাটি খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

রায়পুর থানা পুলিশ ও শ্রমিকরা জানায়, একসময় নানা কারণে কারখানাটি পরিচিত হলেও বর্তমানে লক্ষ্মীপুরে এটি অবহেলিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। কর্মসংস্থানের কারণে লক্ষ্মীপুরে লাখো মানুষ বসবাস করছেন। জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে নিবন্ধিত কারখানা রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক।

উপজেলার সোনাপুর ইউপির রাখালিয়া এলাকার বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজে দুই বছর কাজ করেছেন মহাদেব গ্রামের সুমি আক্তার। তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে নিজ এলাকায় বসবাস করছেন। সুমি আক্তার বলেন, তাদের কারখানার সব শ্রমিক বেকার হয়ে গেছেন। পুরুষ শ্রমিকদের বেশিরভাগই অন্যত্র নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু যুবতী ও মধ্যবয়সী নারীরা কোথাও চাকরি পাচ্ছেন না।

তিনি বলেন, ‘আমাদের কয়েকজন গত এক মাসে সদরের বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় যোগাযোগ করেছি। কিন্তু নতুন চাকরি পাইনি। এখন বিধবা নারী হয়ে একার আয় দিয়ে কোনো রকমে জীবনযাপন করছি।’

একই এলাকার বাসিন্দা মো. মাসুম, হাবিবুর রহমান ও মানিক হোসেন বলেন, চাকরি হারিয়ে তারা ঘরে বসে আছেন। জমানো কিছু টাকা দিয়ে চাল, সবজি ও মাছ কিনে খাচ্ছেন। নতুন চাকরির সন্ধান করছেন। তবে বেতন খুবই কম বলায় আরও খোঁজাখুঁজি করছেন তারা।

বৃহত্তর নোয়াখালীর নামকরা ঐতিহাসিক রায়পুরের রাখালিয়া এলাকার বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির মালিক টিপু সুলতান কারখানার সামনে নোটিশ টানিয়ে চলতি বছরের ১৫ মে থেকে এটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেন।

রায়পুরের বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক টিপু সুলতান ও সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন) বিপ্লব পাল মোবাইল ফোনে জানান, গত ২০ বছর লাভ-লোকসানের মধ্য দিয়ে কারখানাটি চালিয়ে আসছিলেন তারা। কারখানায় প্রায় দুই হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী বেকার হয়েছেন। শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

তারা বলেন, ‘আমরা লে-অফ তুলে নিয়ে সরকারের সহযোগিতা চাইছি। প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে অনুরোধ করছি, ব্যাক টু ব্যাক এলসি ওপেন করে সব ব্যাংকিং সুবিধাসহ লে-অফ তুলে নেওয়ার। একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে, শ্রমিক বেকারত্বের সংখ্যাও বাড়ছে। আমরা নিরুপায়।’

Government

রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, ব্যাংক সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে কারখানাগুলো বন্ধ হচ্ছে বলে জানতে পারছেন তারা। কর্মহীন প্রায় সহস্রাধিক নারী শ্রমিকের অনেকেই বেঙ্গল সু কারখানাটি খুলে দেওয়া ও বকেয়া বেতনের দাবিতে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছেন। এসব শ্রমিককে সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হিমশিম খেতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘কয়েকবার বৈঠক করে বেতনের বিষয়টি সমাধান করা হয়। দেখলাম, মালিকপক্ষ পুরো কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে।’

এ বিষয়ে রায়পুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মারুফ বিন জাকারিয়া বলেন, ‘লক্ষ্মীপুর জেলার অন্যতম শিল্পপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে বেঙ্গল সু ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রায় দুই হাজার নারী-পুরুষ শ্রমিক এখানে কাজ করে পরিবারে স্বচ্ছলতা নিয়ে এসেছেন। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হওয়ায় তারা বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাই সরকারের প্রতি অনুরোধ, প্রতিষ্ঠানটি চালু করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page