দত্তকের আড়ালে শিশু কেনাবেচা, ফেসবুকেই চলছে দর–কষাকষি

প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৩৪ অপরাহ্ণ
দত্তকের আড়ালে শিশু কেনাবেচা, ফেসবুকেই চলছে দর–কষাকষি

ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে দত্তকের নামে শিশু দেওয়া-নেওয়া ও অর্থের দর–কষাকষির তথ্য পাওয়া গেছে।

ফেসবুকে ‘শিশু দত্তক দেওয়া-নেওয়া’কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক ধরনের অনলাইন বাজার। বিভিন্ন গ্রুপে প্রকাশ্যেই শিশু দেওয়ার প্রস্তাব, সন্তান নেওয়ার চাহিদা এবং টাকার অঙ্ক নিয়ে আলোচনা চলছে। কোথাও নবজাতক, কোথাও কয়েক মাস বয়সী শিশু—কখনো ছেলে, কখনো মেয়েশিশুর জন্য নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে যোগাযোগের আহ্বান জানানো হচ্ছে।

সম্প্রতি এমনই একটি ফেসবুক পোস্টে ছয় মাস বয়সী একটি ছেলে শিশুর জন্য দুই লাখ টাকা চাওয়া হয়। পোস্টে শিশুটিকে ‘জরুরি’ ভিত্তিতে দেওয়ার কথা উল্লেখ করে সম্ভাব্য আগ্রহীদের যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। পোস্টদাতা একই সঙ্গে প্রতারকদের বিষয়ে সতর্কও করেছেন।

‘সন্তান দত্তক দেওয়া-নেওয়া হয়’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে পাওয়া ওই পোস্টের মতো একই ধরনের বিজ্ঞপ্তি আরও বেশ কিছু গ্রুপে দেখা গেছে। কোথাও শিশু বিক্রির কথা সরাসরি বলা হয়েছে, আবার কোথাও ‘দত্তক’, ‘বিশেষ অফার’ কিংবা ‘পরিবারের চাহিদা’—এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করে শিশুর বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে ফেসবুকের ৩৯টি পাবলিক গ্রুপ পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব গ্রুপের সদস্যসংখ্যা কয়েক শ থেকে প্রায় ২০ হাজার পর্যন্ত। এর মধ্যে তিনটি গ্রুপে যুক্ত হয়ে পোস্ট ও সদস্যদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়। কয়েকটি গ্রুপ নিয়মিত অনুসরণ করে শিশু দেওয়া-নেওয়ার পোস্ট, সম্ভাব্য ক্রেতার চাহিদা এবং যোগাযোগের ধরনও দেখা হয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মেয়েশিশুর তুলনায় ছেলেশিশুর জন্য চাহিদা ও অর্থের অঙ্ক বেশি হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। কোনো কোনো পোস্টে নির্দিষ্ট বয়সের শিশু চাওয়া হয়েছে। আবার কোথাও গর্ভাবস্থার সময় থেকেই শিশুর বিষয়ে চুক্তির আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।

একটি পোস্টে এক ব্যক্তি ৫০ হাজার টাকার মধ্যে নির্দিষ্ট বয়সের ছেলে শিশু চেয়েছেন। আরেকজন পাঁচ-ছয় মাসের গর্ভবতী নারীর সঙ্গে চুক্তির কথা জানিয়েছেন। কোথাও বিদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য শিশু চাওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

শিশু দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া পোস্টগুলোর একটিতে বলা হয়, পরিবারের ‘ডিমান্ড’ রয়েছে এবং কোনো অগ্রিম টাকা দিতে হবে না। আগ্রহী ব্যক্তিকে সরাসরি এসে শিশু দেখে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন করে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অনুসন্ধানকারীরা শিশু দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী এমন আটজনের সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয়ে অথবা পরিচয় গোপন রেখে ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারে কথা বলেন।

দুই লাখ টাকা চাওয়া ছয় মাস বয়সী ছেলে শিশুর পোস্টটির ব্যক্তির সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, শিশুটির মায়ের অনুরোধে তিনি পোস্টটি দিয়েছেন এবং শিশু দেওয়ার সঙ্গে নিজে জড়িত নন। পরে তাঁর দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করে এক নারীর সঙ্গে কথা বলা হয়। ওই নারী জানান, তিনি নরসিংদীতে থাকেন এবং শিশুটির জন্য এক লাখ টাকা চান।

শিশুটি কেন দেওয়া হবে—এমন প্রশ্নে ওই নারী পারিবারিক সমস্যার কথা জানান। পরে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে শিশুটির ছবি ও টিকার কার্ড পাঠান। ওই কার্ডে শিশুটির বাবার নাম ও গাজীপুরের কাপাসিয়ার ঠিকানা উল্লেখ ছিল। নারীর হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টও ওই নামেই খোলা ছিল।

পরে ফেসবুকের পোস্টদাতার সঙ্গে আবার যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অন্য একজন ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিতে আগ্রহী হয়েছেন। তবে শিশুটির জন্য দুই লাখ টাকা প্রয়োজন বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, শিশুটির মাকে সহায়তা করাই তাঁর উদ্দেশ্য এবং তিনি কোনো অর্থ নেবেন না।

শুধু শিশু দেওয়ার পোস্ট নয়, শিশু নেওয়ার চাহিদাও রয়েছে এসব গ্রুপে। অনুসন্ধানে এক ডজন গ্রুপের ২৮৮টি পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর মধ্যে ৩৪টি পোস্টে শিশু নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। আর ৬৩টি পোস্টে শিশু দেওয়ার প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এসব পোস্টে ‘বেবি’, ‘নিউবর্ন’, ‘সন্তান’ ও ‘যমজ বাচ্চা’সহ বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

কিছু পোস্টে গর্ভকালীন চিকিৎসা-সংক্রান্ত রিপোর্ট চাওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। কয়েকটি গ্রুপে শুক্রাণু দান ও সারোগেসি নিয়ে আলোচনা চলে। এর পাশাপাশি যৌনসেবা দেওয়ার প্রস্তাবও দেখা গেছে।

অনুসন্ধানে একটি নারী দালালের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্যও পাওয়া যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই নারী জানান, বিভিন্ন হাসপাতালের মাধ্যমে সন্তান রাখতে অনিচ্ছুক গর্ভবতী নারীদের খুঁজে বের করা হয়। তাঁরা সন্তান দিতে রাজি হলে প্রসব পর্যন্ত তাঁদের দেখভাল করা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ছেলে নবজাতকের জন্য তিন লাখ এবং মেয়েশিশুর জন্য দুই লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। এ কাজে মধ্যস্থতাকারীরা কমিশন পান।

কুষ্টিয়ার আবদুল আলিমও এমন প্রতারণার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, তিনি তিনবার প্রতারিত হয়েছেন। সর্বশেষ একটি নবজাতকের জন্য দাম ঠিক করার পর এক নারী হোয়াটসঅ্যাপে শিশুটিকে ভিডিও কলে দেখান। পরে পথখরচের কথা বলে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম চাওয়া হয়। বিকাশে টাকা পাঠানোর পর সংশ্লিষ্ট ফেসবুক গ্রুপটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং যোগাযোগের সব মাধ্যম থেকে তাঁকে ব্লক করা হয়।

ফেসবুকের বাইরেও অর্থের বিনিময়ে শিশু হস্তান্তরের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকার একটি হাসপাতালের দেয়ালে ‘বাচ্চা দত্তক দেবেন? আমরা নেব’—এমন একটি নোটিশের সূত্র ধরে যাত্রাবাড়ীর একটি কেয়ারগিভিং প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করা হয়।

প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজে বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসা, আইইউআই, আইভিএফ ও সারোগেসি-সংক্রান্ত সেবার কথা উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি ‘শিশুর আইনগত অভিভাবকত্ব’ নেওয়ার ক্ষেত্রেও সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল আহাদ জানান, তাঁদের কাছে শিশু দেওয়া ও নেওয়ার জন্য আবেদনপত্র রয়েছে। এ কাজে কোম্পানি দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। আবেদনের ফরমে কোম্পানির জন্য ৩৫ হাজার টাকা সম্মানীর কথা থাকলেও তিনি মৌখিকভাবে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন বলে অনুসন্ধানে জানা যায়।

এ ছাড়া শিশুদাতা পরিবারকে চাহিদা অনুযায়ী অর্থ এবং প্রসবের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের খরচ বহনের কথাও বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যয় প্রায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।

প্রতিষ্ঠানটি দুই পক্ষের মধ্যে সম্মতিনামা ও সমঝোতা দলিলও সরবরাহ করে। তবে শিশু হস্তান্তরের পর আদালতের মাধ্যমে আইনি অভিভাবকত্ব নেওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানটি যুক্ত থাকে না বলে আবদুল আহাদ জানান। তাঁর দাবি, এ বিষয়ে স্থানীয় থানা ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরামর্শ চাইলেও স্পষ্ট নির্দেশনা পাননি।

অনুসন্ধানের সময় প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে একটি ছেলে শিশু নেওয়া এক ব্যক্তির সঙ্গেও কথা হয়। তিনি জানান, শিশুটিকে নিতে তাঁর প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পরে শিশুটিকে নিজেদের সন্তান হিসেবে পরিচয় দিয়ে জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন কাগজপত্র করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

এদিকে, আসন্নপ্রসবা এক নারীও ওই প্রতিষ্ঠানে ফোন করে নিজের গর্ভের ছেলে শিশুকে দেওয়ার আগ্রহের কথা জানান। তিনি এক লাখ টাকা এবং অস্ত্রোপচারের খরচ দাবি করেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থের বিনিময়ে শিশু দেওয়া-নেওয়ার এসব কার্যক্রম শিশু পাচার ও শোষণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবং আইন কমিশনের সাবেক মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা ফউজুল আজিম মনে করেন, শিশু দত্তক বা অভিভাবকত্বের নামে অর্থের বিনিময়ের পোস্টগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

তাঁর মতে, কোনো শিশুকে বেআইনি বা অনৈতিক কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে কেনাবেচা বা হস্তান্তর করা হলে দণ্ডবিধির ৩৭২ ও ৩৭৩ ধারায় শাস্তির বিধান রয়েছে। পাশাপাশি ২০২৬ সালের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে অসৎ উদ্দেশ্যে দত্তক গ্রহণকে শোষণের আওতায় রাখা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ফউজুল আজিম বলেন, এ ধরনের লেনদেনের সঙ্গে কারা জড়িত, মধ্যস্থতাকারী বা সংঘবদ্ধ চক্র আছে কি না এবং হস্তান্তরের পর শিশুটির কী হবে—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদাও শিশুদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, অর্থের বিনিময়ে শিশুকে অন্যের কাছে দেওয়ার পর সেই শিশুর অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের ওপর কোনো কার্যকর নজরদারি থাকে না। তিনি এ ক্ষেত্রে সরকারি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

বাংলাদেশে সবার জন্য প্রযোজ্য একটি সাধারণ দেওয়ানি দত্তক আইন নেই। পারিবারিক আইনগুলো ধর্মভিত্তিক। মুসলিম পারিবারিক আইনে দত্তকের বিধান নেই। তবে আইনজীবীদের মতে, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী দত্তকের সুযোগ রয়েছে। ধর্ম নির্বিশেষে পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে শিশুর আইনি অভিভাবকত্ব নেওয়ার সুযোগও রয়েছে।

২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী শিশুকল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুর বিকল্প পরিচর্যার দায়িত্ব হস্তান্তরের সুযোগ রয়েছে। সরকারি ব্যবস্থায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের ছয়টি ছোটমণি নিবাসে থাকা শিশুদের আদালতের মাধ্যমে অভিভাবকত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

ঢাকার আজিমপুর ছোটমণি নিবাসের সাবেক উপতত্ত্বাবধায়ক জুবলি বেগমের মতে, নিঃসন্তান দম্পতিদের সন্তান নেওয়ার চাহিদাকে কেন্দ্র করে ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে শিশু বেচাকেনার চক্র সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, ফেসবুকে দত্তকের নামে প্রতারণার বিষয়টি তাঁরা জানেন। তবে শিশু বিক্রির বিষয়ে এ ধরনের নির্দিষ্ট অভিযোগ তাঁদের কাছে আসেনি। তাঁর ভাষ্য, উদ্দেশ্য যা-ই হোক, ফেসবুকে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা অপরাধ। এখন পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এ ঘটনায় কাউকে আইনের আওতায় আনা হয়নি।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু দত্তক ও আইনি অভিভাবকত্বের জন্য সুস্পষ্ট কাঠামো এবং কার্যকর নজরদারি না থাকলে এ ধরনের অনলাইন লেনদেন আরও বাড়তে পারে। তাঁদের মতে, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি তত্ত্বাবধানে দত্তক ও অভিভাবকত্বের একটি স্বচ্ছ কাঠামো তৈরি করা জরুরি।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page