সিলিন্ডার গ্যাস নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারদরের বড় ব্যবধান
আবারও বাড়ছে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম
বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না—এমন অভিযোগ বাড়ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের জন্য নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও একই সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ২৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। আবার কিছু দোকানে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকার অভিযোগও রয়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অনেক দোকানে সারি করে রাখা এলপিজি সিলিন্ডারের বেশির ভাগই খালি। বিক্রেতাদের কেউ কেউ বলছেন, দোকানে থাকা গ্যাসভর্তি সিলিন্ডারগুলো আগে থেকেই অর্ডার করা, তাই সাধারণ ক্রেতার কাছে বিক্রির জন্য নয়। তবে বাড়তি টাকা দিতে রাজি হলে পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি সিলিন্ডারে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা বেশি দিলেই কয়েক মিনিটের মধ্যে পাশের গুদাম থেকে গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার এনে ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই। এলপিজি আমদানিকারকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও দেশে সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি সন্তোষজনক বলে জানানো হয়েছে। ফলে সরকারি পর্যায়ে সংকট না থাকার কথা বলা হলেও খুচরা বাজারে কেন নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু খুচরা বাজারে সেটিই বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। কোথাও কোথাও ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ নির্ধারিত দামের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে একেকটি সিলিন্ডারে ক্রেতাকে প্রায় দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে।
শুধু ১২ কেজির সিলিন্ডার নয়, বড় আকারের সিলিন্ডারেও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন ক্রেতা ও বিক্রেতারা। ৩৫ কেজির সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম ৪ হাজার ৬২৪ টাকা হলেও খুচরা বাজারে তা ৫ হাজার ৩৫০ থেকে ৫ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। ৪৫ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ৫ হাজার ৯৪৫ টাকা হলেও কোথাও তা ৬ হাজার ৭৫০ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। আর ১৫ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৯৮২ টাকা নির্ধারিত থাকলেও বাজারে ২ হাজার ৫৫০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম চাওয়া হচ্ছে।
খুচরা বিক্রেতাদের বক্তব্য, তারা নিজেরাও বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে বেশি দামে বিক্রি না করলে তাদের ব্যবসায় লোকসান হবে। তবে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের অভিযোগ, সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে অস্পষ্টতা এবং সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কাকে কাজে লাগিয়ে বাজারের কোথাও কোথাও সিলিন্ডার আটকে রাখা হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক সরবরাহ থাকলেও ক্রেতাদের বাড়তি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে।
এলপিজি আমদানির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও বর্তমান বাজারে প্রভাব ফেলছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে জাহাজ ভাড়াও। ফলে আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করেও অনেক ক্ষেত্রে এলপিজির কার্গো সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে কিছু আমদানিকারক আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন বা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী কার্গো সংগ্রহ করতে পারছেন না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আমদানিকারক জানান, এলপিজির মূল্য নির্ধারণের সময় বিইআরসি টনপ্রতি ১৬০ ডলার প্রিমিয়াম ধরে হিসাব করেছিল। বর্তমানে সেই প্রিমিয়াম বেড়ে ২৬০ থেকে ৪০০ ডলারে পৌঁছেছে বলে তার দাবি। বাড়তি এই ব্যয় সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ায় কিছু প্রতিষ্ঠান আমদানি কমিয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ দুটি নৌপথে একই সময়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় পর্যাপ্ত কার্গো পাওয়া যাচ্ছে না বলেও তিনি জানান। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা কিছু প্রতিষ্ঠানও চুক্তির পুরো পরিমাণ পণ্য পাচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।
তবে গত সোমবার জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এলপিজি অপারেটররা মন্ত্রীকে জানান, দেশে এলপিজির কোনো সংকট নেই। পরে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা লোয়াবের পক্ষ থেকেও সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার দাবি জানিয়ে বিবৃতি দেওয়া হয়।
সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম ২২ দিনে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আমদানিকারক ও অপারেটররা দেশের মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি ভালো রয়েছে বলেও দাবি করেন।
দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ এলপিজি ব্যবহার করেন বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য। এর প্রায় ৮০ শতাংশই গৃহস্থালির রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি পরিবহন ও শিল্প খাতেও এলপিজির ব্যবহার রয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহের সামান্য অস্বাভাবিকতাও বিপুলসংখ্যক ভোক্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
এলপিজির দাম নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার পরিবর্তন এসেছে। এপ্রিলের শুরুতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৩৮৭ টাকা বাড়ানো হয়। পরে ১৯ এপ্রিল আরও ২১২ টাকা বাড়ানো হয়। এরপর জুন ও জুলাইয়ে টানা দুই মাস দাম কমানো হয়েছিল। চলতি মাসের দাম গত ২ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়।
বাজারে আবার দাম বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে কিছু খুচরা বিক্রেতা সিলিন্ডার বিক্রির বদলে মজুত করে রাখার দিকে ঝুঁকছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
বিইআরসির কর্মকর্তারাও খুচরা বাজারে বাড়তি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগের কথা জানিয়েছেন। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, কয়েক দিন ধরে বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তবে সরবরাহ সংকটের সময়ে অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে। তার আশঙ্কা, অভিযান চালালে কোনো কোনো ব্যবসায়ী দোকান বন্ধ করে দিতে পারেন, এতে বাজারে সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে লোয়াবের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশে এলপিজির সরবরাহ পর্যাপ্ত ও সন্তোষজনক। সংগঠনটির দাবি, সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এবং আগস্টে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। তাই কৃত্রিম সংকট তৈরির কোনো সুযোগ নেই বলে তারা মনে করছে।
লোয়াব আরও জানিয়েছে, পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও কোনো অপারেটর, পরিবেশক, ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করলে কিংবা নিয়মবহির্ভূতভাবে মজুত করলে তা প্রচলিত আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ধরনের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সংগঠনটি জানিয়েছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর অনলাইন সভায় জেলা প্রশাসকদের বাজার মনিটরিং জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও লোয়াবের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এখন নজর থাকবে, সরকারি নির্ধারিত দামে এলপিজি বাজারে ফিরিয়ে আনতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে কীভাবে বদলায়।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
