নতুন সরকারি ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন কীভাবে করবেন, অনলাইন ও অফলাইন নিয়ম জেনে নিন

প্রকাশিত: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:২৫ পূর্বাহ্ণ
নতুন সরকারি ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন কীভাবে করবেন, অনলাইন ও অফলাইন নিয়ম জেনে নিন

নতুন সরকারি ফ্যামিলি কার্ড আবেদন করার নিয়ম

১৩২৩৬

দেশের দরিদ্র, অতি দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনতে চালু হওয়া সরকারি ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে নতুন করে ফ্যামিলি কার্ড পেতে কোথায় আবেদন করতে হবে, অনলাইনে আবেদন করা যাবে কি না, কী কী তথ্য লাগবে এবং কারা এই সুবিধার আওতায় আসতে পারবেন—এসব বিষয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সরকার ২০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে। এর মাধ্যমে আগে পরীক্ষামূলকভাবে চালু থাকা কর্মসূচিকে বড় পরিসরে বাস্তবায়নের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হচ্ছে পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় একক হিসেবে বিবেচনা করে যোগ্য পরিবারকে সহায়তার আওতায় আনা।

ফ্যামিলি কার্ডের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমানে সাধারণ নাগরিকের জন্য একটি উন্মুক্ত ওয়েব ফরমে গিয়ে নিজের ইচ্ছায় অনলাইনে আবেদন করার ব্যবস্থা আছে—এমন তথ্য সরকারি সূত্রে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় মাঠপর্যায়ে পরিবারের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং পরে সরকারি সিস্টেমে তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ছড়িয়ে পড়া ‘অনলাইনে ফ্যামিলি কার্ড আবেদন করুন’ ধরনের লিংকে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া থেকে সতর্ক থাকতে হবে। সমাজসেবা অধিদপ্তরও ফ্যামিলি কার্ডের নামে নকল ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রতারণার চেষ্টা সম্পর্কে সতর্ক করেছে।

সরকারের প্রকাশিত গাইডলাইনে বলা হয়েছে, মাঠপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কমিটি বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করবেন। এ সময় পরিবারের নারী প্রধানের জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, বাসস্থানের ধরনসহ বিভিন্ন আর্থসামাজিক তথ্য নেওয়া হবে। সংগৃহীত তথ্য পরে উপজেলা বা শহর সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে অনলাইনে সরকারি ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এরপর তথ্যের ভিত্তিতে পিএমটি বা Proxy Means Test পদ্ধতিতে পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থার স্কোর নির্ধারণ করা হবে।

তাই সাধারণ মানুষের জন্য ‘অফলাইন আবেদন’ বলতে মূলত স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই প্রক্রিয়াটিই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো এলাকায় ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ শুরু হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য সংগ্রহকারী বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের তথ্য নেবেন। তখন পরিবারের পক্ষ থেকে সঠিক তথ্য দেওয়া এবং জাতীয় পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় তথ্য প্রস্তুত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। আগের পাইলট কার্যক্রমেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা, সদস্যসংখ্যা, শিক্ষা, বাসস্থান, টেলিভিশন, ফ্রিজ, কম্পিউটার, মোবাইল, রেমিট্যান্সসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল।

ফ্যামিলি কার্ড সাধারণত পরিবারের মনোনীত নারী প্রধানের নামে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সরকারি কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, কার্ডটি শুধু নগদ সহায়তা পাওয়ার মাধ্যম নয়; ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে এটিকে সমন্বিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী ও অনন্য পরিচিতি নম্বর বা ‘ওয়ান-আইডি’ ব্যবহারের ব্যবস্থাও নতুন নীতিমালায় রাখা হয়েছে।

তবে শুধু আবেদন বা তথ্য দেওয়াই ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়। পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার তথ্য যাচাই করে যোগ্যতা নির্ধারণ করা হবে। এ জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বিআরটিএ, ভূমি মন্ত্রণালয়, ব্যাংক ও অন্যান্য সরকারি তথ্যভান্ডারের সঙ্গে তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে তথ্যের অসঙ্গতি শনাক্ত করতে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থাও ব্যবহার করা হতে পারে।

নতুন নীতিমালায় কিছু পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধার বাইরে রাখার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে। নির্ধারিত পিএমটি স্কোরের ঊর্ধ্বসীমার ওপরে থাকা পরিবার, সরকারি বা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বেতন-ভাতা পাওয়া নারী পরিবারপ্রধান এবং নিয়মিত সরকারি পেনশনভোগী নারী পরিবারপ্রধান এই সুবিধার আওতায় থাকবেন না। একইভাবে পরিবারের কোনো সদস্যের নামে ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানত বা বিনিয়োগ থাকলেও পরিবারটি বাদ পড়বে।

এ ছাড়া পরিবারের কোনো সদস্যের নামে নির্দিষ্ট ধরনের তিন বা চার চাকার মোটরযান থাকলে, বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা হালনাগাদ ব্যবসায়িক লাইসেন্স থাকলে, নিয়মিত করযোগ্য আয় থাকলে কিংবা বসতভিটাসহ মোট আবাদি জমির পরিমাণ শূন্য দশমিক ৫০ একর বা তার বেশি হলে পরিবারটি ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধার বাইরে থাকবে। নির্দিষ্ট মূল্যের বেশি অকৃষি বা বাণিজ্যিক জমি বা স্পেস থাকলেও সুবিধা পাওয়া যাবে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একই নারী পরিবারপ্রধান একই সময়ে একই ধরনের একাধিক সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা নিতে পারবেন না। নীতিমালায় টিসিবির স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ভিডব্লিউবি এবং কিছু নগদ সহায়তা কর্মসূচির সঙ্গে সুবিধা সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে। তবে পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রচলিত নিয়মে অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।

কোনো যোগ্য পরিবার তথ্য সংগ্রহের সময় বাদ পড়লে বা তালিকায় অনিয়ম হলে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সরকারি গাইডলাইন অনুযায়ী, অনলাইন বা ম্যানুয়ালি অভিযোগ করা যাবে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা বা শহর সমাজসেবা কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগের পাশাপাশি সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট ও ৩৩৩ হেল্পলাইনের মাধ্যমেও অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে।

সব মিলিয়ে নতুন ফ্যামিলি কার্ডের ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিজে থেকে কোনো অননুমোদিত ওয়েবসাইটে অনলাইন আবেদন না করা এবং টাকা না দেওয়া। সরকারি তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের মাধ্যমে পরিবারের তথ্য যাচাই ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। নতুন কোনো উন্মুক্ত অনলাইন আবেদন ব্যবস্থা চালু হলে সেটি সরকারি ফ্যামিলি কার্ড ওয়েবসাইট বা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হবে। সরকারি ফ্যামিলি কার্ডের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট হলো familycard.gov.bd

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page