সন্তানের আকিকা না দিলে কি ক্ষতি হয়? ইসলাম কী বলছে
কোরআন-হাদিসের আলোকে আকিকার বিধান ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
সন্তান আল্লাহ তাআলার অমূল্য নিয়ামত। নবজাতকের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় এবং তার কল্যাণ কামনায় ইসলামে আকিকা করার বিধান রয়েছে। তবে অনেক পরিবারের সামর্থ্য বা সুযোগ না থাকায় সময়মতো আকিকা করা সম্ভব হয় না। তখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—আকিকা না দিলে কি সন্তানের কোনো ক্ষতি হয়? অথবা বাবা-মা কি গুনাহগার হন?
ইসলামী শরিয়তের আলোকে এর উত্তর হলো—না, আকিকা না দিলে সন্তানের কোনো অমঙ্গল বা ক্ষতি হবে—এমন কথা কোরআন-হাদিসে নেই। তবে সামর্থ্য থাকলে আকিকা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত।
আকিকা কী?
আকিকা হলো নবজাতক সন্তানের জন্ম উপলক্ষে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু জবাই করা। একই সঙ্গে শিশুর মাথার চুল কেটে সুন্দর নাম রাখাও সুন্নতের অংশ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“সন্তানের সঙ্গে আকিকা সম্পর্কিত। তার পক্ষ থেকে রক্ত প্রবাহিত (অর্থাৎ আকিকার পশু জবাই) কর এবং তার অশুচি (চুল) দূর করে দাও।”
— (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৭৬)
আরেক হাদিসে এসেছে,
“সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে তার নাম রাখা, মাথা মুণ্ডন করা এবং আকিকা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
— (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৮৩২)
ছেলে ও মেয়ের আকিকার নিয়ম
হাদিস অনুযায়ী—
ছেলে সন্তানের জন্য: দুটি ছাগল বা বকরি (সমজাতীয়)
মেয়ে সন্তানের জন্য: একটি ছাগল বা বকরি
উম্মে কুরজ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন,
“ছেলের জন্য একই ধরনের দুটি বকরি এবং মেয়ের জন্য একটি বকরি আকিকা করবে।”
— (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৮৩৪)
তবে ইসলামী ফিকহবিদদের মতে, ছেলে সন্তানের জন্য একটি পশু দিয়েও আকিকা করলে সুন্নত আদায় হয়ে যায়, যদিও দুটি দেওয়াই উত্তম।
কখন আকিকা করা উত্তম?
সুন্নত অনুযায়ী সন্তানের জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা করা উত্তম।
যদি সপ্তম দিনে সম্ভব না হয়, তাহলে ১৪তম বা ২১তম দিনে করা যেতে পারে। এরপরও সুযোগ হলে পরবর্তী যেকোনো সময় আকিকা করা বৈধ।
আকিকা না দিলে কি কোনো ক্ষতি হয়?
অনেক সমাজে ধারণা রয়েছে, আকিকা না দিলে সন্তানের জীবনে অমঙ্গল বা বিপদ নেমে আসে। কিন্তু কোরআন বা সহিহ হাদিসে এমন কোনো বক্তব্য নেই।
ইসলামী আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেছেন, আকিকা সন্তানের নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। তবে আকিকা না করলে সন্তানের ক্ষতি হবে—এমন কথা হাদিসে নেই।
একইভাবে ইসলামিক স্কলার মিজানুর রহমান আজহারীও বলেছেন, সামর্থ্য থাকলে সপ্তম দিনে আকিকা করা সুন্নত এবং এটি মুসলিম পরিবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল।
সামর্থ্য না থাকলে করণীয়
ইসলাম সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“আল্লাহ কোনো ব্যক্তির ওপর তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না।”
তাই কারও আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে আকিকা না করার কারণে তিনি গুনাহগার হবেন না। পরে সামর্থ্য হলে আকিকা করতে পারবেন।
আকিকার গোশত কারা খেতে পারবেন?
আকিকার গোশত কোরবানির গোশতের মতোই বণ্টন করা যায়।
১. আত্মীয়-স্বজন
২. প্রতিবেশী
৩. দরিদ্র মানুষ
৪. ধনী ব্যক্তি
এমনকি বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যরাও আকিকার গোশত খেতে পারবেন।
(ফাতাওয়া শামি: ৬/৩৩৬)
আকিকা উপলক্ষে অনুষ্ঠান করা যাবে?
অনেক পরিবার আকিকা উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত দিয়ে খাবারের আয়োজন করে। এতে ইসলামী শরিয়তে কোনো নিষেধ নেই।
তবে মনে রাখতে হবে—
১. জাঁকজমক বা অপচয় করা যাবে না।
২. উপহার দেওয়া বা নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
৩. কাউকে সামাজিক চাপের মধ্যে ফেলা উচিত নয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে মূল শিক্ষা
আকিকা একটি মুস্তাহাব ও গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। এটি সন্তানের জন্য দোয়া, কৃতজ্ঞতা ও কল্যাণের একটি সুন্দর আমল।
তবে আকিকা না দিলে সন্তানের জীবনে অমঙ্গল হবে, অসুস্থ হবে বা ভবিষ্যতে ক্ষতি হবে—এমন বিশ্বাস ইসলামে ভিত্তিহীন। তাই এ ধরনের কুসংস্কার থেকে দূরে থাকা উচিত।
সামর্থ্য থাকলে আকিকা করা উত্তম, আর সামর্থ্য না থাকলে আল্লাহ কারও ওপর তার ক্ষমতার বাইরে কোনো দায়িত্ব আরোপ করেন না।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
