“সেপ্টেম্বর এলেই কেন উত্তপ্ত হয় পাহাড়?”
ছবিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি। ছবি: নিজস্ব
পার্বত্য চট্টগ্রামে সেপ্টেম্বর এখন অনেকের কাছেই বাড়তি সতর্কতার একটি সময়। গত দুই বছরের ঘটনাপ্রবাহে মাসটির শেষভাগে খাগড়াছড়িতে একাধিকবার উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ঘটনা ঘটেছে। ফলে সেপ্টেম্বর এলেই সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয় এক ধরনের শঙ্কা—আবার কোনো ঘটনা কি নতুন করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করবে?
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে মামুন নামে এক যুবককে মারধরের পর তার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরদিন দীঘিনালায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। পরে উত্তেজনা খাগড়াছড়ি সদর ছাড়িয়ে রাঙামাটিতেও ছড়িয়ে যায়। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও হতাহতের ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১৪৪ ধারা জারি করতে হয়।
সেই ঘটনার রেশ পুরোপুরি কাটতে না কাটতেই একই বছরের ১ অক্টোবর খাগড়াছড়ি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক সোহেল রানাকে এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। ফলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পরপর দুটি ঘটনা পাহাড়ের সামাজিক পরিবেশে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করে।
এক বছর পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেও নতুন করে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর সিঙ্গিনালা এলাকায় এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। পরদিন সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও বিষয়টি ঘিরে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর হরতাল, অবরোধ ও পাল্টাপাল্টি উত্তেজনার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি ও গুইমারা এলাকায় সংঘাতের রূপ নেয়। এ সময় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। সেনাবাহিনীর ২০২৫ সালের বিবৃতিতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের ঘটনাকেও পরবর্তী বছরের উত্তেজনার একটি প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের চিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল—মাসটি শুরুর আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে আলোচনা শুরু হয়।
আগস্টেই খাগড়াছড়িতে রিজিয়নাল ইন্টেলিজেন্স কমিটির সমন্বয় সভায় আসন্ন সেপ্টেম্বরের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও হুমকি মোকাবিলায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। আগাম সতর্কতা, গোয়েন্দা নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার বিষয়গুলো সেখানে গুরুত্ব পায়।
অর্থাৎ, আগের দুই বছরের অভিজ্ঞতা এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্যও একটি শিক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। সেপ্টেম্বর আসার আগেই সম্ভাব্য উত্তেজনাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তা নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
পাহাড়ের বাস্তবতা শুধু কোনো একটি দিনের ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ, জাতিগত অবিশ্বাস, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, ভূমি ও অধিকারসংক্রান্ত নানা অভিযোগ এবং অতীতের সহিংসতার স্মৃতি—সবকিছু মিলিয়ে এখানে যেকোনো সংবেদনশীল ঘটনা দ্রুত বড় আকার নিতে পারে।
একটি অপরাধের অভিযোগ তখন শুধু অপরাধ হিসেবে থাকে না; সেটি অনেক সময় বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অযাচাইকৃত তথ্য, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও গুজব যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও দ্রুত উত্তপ্ত হতে পারে।
তাই সেপ্টেম্বরকে আলাদা করে কোনো ‘সংঘাতের মাস’ হিসেবে দেখার চেয়ে গত কয়েক বছরের ঘটনাগুলোকে একটি ধারাবাহিক প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত। ২০২৪ সালের ঘটনার স্মৃতি ২০২৫ সালে ফিরে এসেছে; আর সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ২০২৬ সালে সেপ্টেম্বরের আগেই সতর্ক হয়েছে প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনী।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু ‘সেপ্টেম্বর এলেই কেন পাহাড়ে উত্তেজনা তৈরি হয়?’—তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কেন স্থানীয় কোনো সংবেদনশীল ঘটনা এত দ্রুত সামষ্টিক উত্তেজনায় রূপ নেয় এবং কেন পুরোনো ঘটনার ক্ষত নতুন ঘটনাকে আরও বিস্ফোরণপ্রবণ করে তোলে?
২০২৬ সালে আগাম সতর্কতা ও সমন্বিত প্রস্তুতি অন্তত একটি বিষয় দেখিয়েছে—আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ঝুঁকি মোকাবিলায় আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। এখন সেই সতর্কতা কতটা কার্যকরভাবে দীর্ঘমেয়াদে শান্তি ও পারস্পরিক আস্থায় রূপ নেয়, সেটিই পাহাড়ের জন্য বড় প্রশ্ন।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
