রাসুল (সা.)-এর এমন ৫টি সুন্নত যা আজ খুব কম মানুষ পালন করেন
দৈনন্দিন জীবনের ছোট কাজেও ফিরে আসুক রাসুল (সা.)-এর সুন্নত।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল মানুষের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। তাঁর কথা, কাজ, আচরণ, খাবার গ্রহণের পদ্ধতি, পোশাক পরা থেকে শুরু করে ঘুমানোর নিয়ম—জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই উম্মতের জন্য রয়েছে শিক্ষা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের অনেক ছোট ছোট সুন্নত আমাদের অভ্যাস থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ এসব সুন্নত পালন করতে অনেক সময় বিশেষ কোনো কষ্টও হয় না।
এখানে এমন পাঁচটি সুন্নতের কথা তুলে ধরা হলো, যেগুলো সহিহ হাদিসে প্রমাণিত এবং দৈনন্দিন জীবনে সহজেই পালন করা সম্ভব। তবে “আজ খুব কম মানুষ পালন করেন”—এটি পরিসংখ্যানগত দাবি নয়; বরং প্রচলিত জীবনে তুলনামূলকভাবে কম চোখে পড়ে এমন কিছু সুন্নত বোঝাতে কথাটি ব্যবহার করা হচ্ছে।
এর মধ্যে প্রথমটি হলো খাবার খাওয়ার পর আঙুল চেটে নেওয়া। আধুনিক খাবারের টেবিলে এটি অনেকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) খাবার খাওয়ার পর তাঁর আঙুলগুলো চেটে নিতেন। অন্য হাদিসে তিনি বলেছেন, খাবারের কোন অংশে বরকত রয়েছে, তা মানুষ জানে না। (সহিহ মুসলিম: ২০৩২c, ২০৩৫a)।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—এটি পরিচ্ছন্নতার বিধান উপেক্ষা করে করার বিষয় নয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে, খাবার হাত দিয়ে খাওয়ার ক্ষেত্রে খাবার শেষ করার পর এই সুন্নত পালন করা যায়। রাসুল (সা.) খাবার নষ্ট না করার বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন। কোনো লোকমা পড়ে গেলে তাতে ময়লা না থাকলে তা পরিষ্কার করে খাওয়ার কথাও হাদিসে এসেছে। (সহিহ মুসলিম: ২০৩৪)।
দ্বিতীয় একটি সুন্নত হলো তিন আঙুল দিয়ে খাবার খাওয়া—বিশেষত যে খাবার এভাবে খাওয়া উপযুক্ত। হজরত কাব ইবনে মালিক (রা.) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তিন আঙুল দিয়ে খাবার খেতেন এবং খাওয়া শেষ হলে তা চেটে নিতেন। (সহিহ মুসলিম: ২০৩২c)।
এখানে তিন আঙুল দিয়ে খাওয়াকে প্রতিটি ধরনের খাবারের জন্য বাধ্যতামূলক মনে করার সুযোগ নেই। বরং যেসব খাবার হাতে খাওয়া স্বাভাবিক ও সুবিধাজনক, সেখানে এই সুন্নত অনুসরণ করা যায়। এর মধ্যে পরিমিতভাবে খাবার গ্রহণ এবং খাবারের প্রতি সম্মান দেখানোর শিক্ষাও রয়েছে।
তৃতীয় সুন্নত হলো জুতা বা স্যান্ডেল পরার সময় ডান পা আগে দেওয়া এবং খোলার সময় বাম পা আগে বের করা। সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন—জুতা পরার সময় ডান পা দিয়ে শুরু করতে এবং খোলার সময় বাম পা দিয়ে শুরু করতে। একই সঙ্গে একটি জুতা পরে হাঁটতেও নিষেধ করেছেন; দুই জুতা পরতে হবে অথবা দুটিই খুলতে হবে। (সহিহ মুসলিম: ২০৯৭a-b)।
এটি এমন একটি ছোট আমল, যা প্রতিদিন বাড়ি থেকে বের হওয়া কিংবা ঘরে ফিরে আসার সময় পালন করা যায়। বিশেষ কোনো অতিরিক্ত সময় লাগে না। শুধু অভ্যাসটি সচেতনভাবে তৈরি করতে হয়।
চতুর্থ সুন্নত হলো ঘুমানোর সময় ডান কাতে শোয়া। হজরত আল-বারা ইবনে আজিব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বিছানায় গেলে ডান কাতে শুতেন এবং এরপর একটি দোয়া পড়তেন। (সহিহ বুখারি: ৬৩১৫)।
ঘুমানোর আগে এই সুন্নতের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়াটিও পড়া যায়—
اللَّهُمَّ أَسْلَمْتُ نَفْسِي إِلَيْكَ، وَوَجَّهْتُ وَجْهِي إِلَيْكَ، وَفَوَّضْتُ أَمْرِي إِلَيْكَ، وَأَلْجَأْتُ ظَهْرِي إِلَيْكَ، رَغْبَةً وَرَهْبَةً إِلَيْكَ، لَا مَلْجَأَ وَلَا مَنْجَا مِنْكَ إِلَّا إِلَيْكَ، آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ، وَبِنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আসলামতু নাফসি ইলাইকা, ওয়া ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহি ইলাইকা, ওয়া ফাওয়াদতু আমরি ইলাইকা, ওয়া আলজাতু জাহরি ইলাইকা, রাগবাতাও ওয়া রাহবাতান ইলাইকা, লা মালজা’আ ওয়ালা মানজা মিনকা ইল্লা ইলাইকা, আমানতু বিকিতাবিকাল্লাজি আনজালতা, ওয়া বিনাবিয়্যিকাল্লাজি আরসালতা।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি নিজেকে আপনার কাছে সমর্পণ করলাম, আমার মুখ আপনার দিকে ফেরালাম, আমার বিষয় আপনার কাছে সোপর্দ করলাম এবং আপনার ওপর নির্ভর করলাম। আপনার প্রতি আশা ও ভয় নিয়ে। আপনি ছাড়া কোনো আশ্রয় ও মুক্তির স্থান নেই। আমি আপনার নাজিল করা কিতাব এবং আপনার প্রেরিত নবীর প্রতি ঈমান আনলাম। (সহিহ বুখারি: ৬৩১৫)।
পঞ্চম সুন্নত হলো নামাজের আগে মিসওয়াক করা। আজকের সময়ে টুথব্রাশ ও টুথপেস্ট আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হলেও মিসওয়াকের সুন্নতটি অনেকের অভ্যাসে নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তাঁর উম্মতের জন্য কষ্টকর না হলে তিনি প্রত্যেক নামাজের সময় মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতেন। (সুনান আবু দাউদ: ৪৭)।
এই হাদিস থেকে মিসওয়াকের গুরুত্ব বোঝা যায়। মিসওয়াক ব্যবহার করা পরিচ্ছন্নতারও একটি মাধ্যম। তাই কেউ চাইলে নিয়মিত নামাজের আগে মিসওয়াক করার অভ্যাস তৈরি করতে পারেন। এটি এমন একটি সুন্নত, যা অল্প সময়ে পালন করা সম্ভব এবং একই সঙ্গে মুখের পরিচ্ছন্নতাও বজায় রাখতে সহায়তা করে।
এই পাঁচটি সুন্নতের দিকে তাকালে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়—সুন্নত মানে শুধু বড় কোনো ইবাদত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনযাপনের ছোট ছোট অভ্যাসও একজন মুসলমানের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে। জুতা পরার সময় কোন পা আগে দেব, খাবার কীভাবে গ্রহণ করব, ঘুমানোর সময় কীভাবে শোব কিংবা নামাজের আগে কীভাবে মুখ পরিষ্কার করব—এসব সাধারণ কাজের মধ্যেও রাসুলের অনুসরণ করা সম্ভব।
তবে সুন্নত পালনের ক্ষেত্রে প্রমাণিত হাদিসের ওপর নির্ভর করা অত্যন্ত জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় এমন কিছু কাজকে “রাসুলের সুন্নত” হিসেবে প্রচার করা হয়, যার নির্ভরযোগ্য দলিল নেই। তাই কোনো আমলকে সুন্নত বলার আগে তার সূত্র যাচাই করা উচিত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুন্নত পালনের উদ্দেশ্য যেন শুধু লোক দেখানো না হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ করার ভালোবাসা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এসব আমল করা উচিত। একটি ছোট সুন্নত নিয়মিত পালন করার মাধ্যমে মানুষ ধীরে ধীরে রাসুল (সা.)-এর জীবনধারার সঙ্গে নিজের জীবনকে আরও বেশি মিলিয়ে নিতে পারে।
আজকের ব্যস্ত জীবনে হয়তো আমাদের অনেকের কাছেই এসব ছোট আমল তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না। কিন্তু একজন মুমিনের জীবনে ছোট নেক কাজও অবহেলার বিষয় নয়। একটি জুতা পরার সময় ডান পা আগে দেওয়া, খাবারের পর আঙুল চেটে নেওয়া, ঘুমানোর সময় ডান কাতে শোয়া কিংবা নামাজের আগে মিসওয়াক করা—এসব কাজের মাধ্যমে প্রতিদিনের সাধারণ জীবনেও সুন্নতের চর্চা করা যায়।
আজকের শিক্ষা: সুন্নত পালনের জন্য সব সময় বড় কোনো সুযোগের অপেক্ষা করতে হয় না। প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজ থেকেই শুরু করা যায়। আজ থেকেই একটি সুন্নত বেছে নিয়ে নিয়মিত পালন করার চেষ্টা করুন এবং ধীরে ধীরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আরও প্রমাণিত সুন্নত নিজের জীবনে ফিরিয়ে আনুন।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
