ঋণমুক্তির জন্য কোরআন-হাদিসে কী আমল আছে?
ঋণের চাপে হতাশ নয়—দোয়ার পাশাপাশি হালাল পথে চেষ্টা চালিয়ে যান।
ঋণ মানুষের জীবনে কখনো প্রয়োজনের কারণে আসে, আবার কখনো অপরিকল্পিত ব্যয়, ব্যবসায়িক ক্ষতি কিংবা আর্থিক সংকটের কারণে তৈরি হয়। ঋণের চাপ শুধু অর্থনৈতিক সমস্যাই সৃষ্টি করে না, অনেক ক্ষেত্রে মানুষের মানসিক প্রশান্তি, পারিবারিক জীবন এবং স্বাভাবিক কাজকর্মেও প্রভাব ফেলে। ইসলাম ঋণ গ্রহণকে নিষিদ্ধ করেনি, তবে ঋণের ব্যাপারে অত্যন্ত দায়িত্বশীল হতে বলেছে। একই সঙ্গে ঋণের বোঝা থেকে মুক্তির জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন এবং উম্মতকেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দোয়া ও নীতি শিখিয়েছেন।
ঋণমুক্তির কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—কোরআন বা সহিহ হাদিসে এমন কোনো “গোপন আমল” নেই, যা নির্দিষ্ট কয়েকবার পড়লেই কোনো চেষ্টা ছাড়া ঋণ অলৌকিকভাবে শেষ হয়ে যাবে। ইসলামের শিক্ষা হলো, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার পাশাপাশি হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা, খরচ নিয়ন্ত্রণ করা এবং যার টাকা পাওনা রয়েছে তার হক যথাসাধ্য পরিশোধ করা। দোয়া ও বাস্তব প্রচেষ্টা—দুটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ঋণের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) এতটাই সতর্ক ছিলেন যে তিনি নিয়মিত ঋণের বোঝা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে একটি দোয়া করতেন, যেখানে তিনি গুনাহ ও ঋণের বোঝা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন। এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি ঋণ থেকে এত বেশি আশ্রয় চান কেন? তখন রাসুল (সা.) বলেন, মানুষ ঋণগ্রস্ত হলে কথা বলতে গিয়ে মিথ্যা বলতে পারে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভঙ্গ করতে পারে। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।
দোয়াটি হলো—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْمَأْثَمِ وَالْمَغْرَمِ
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল মা’ছামি ওয়াল মাগরাম।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে গুনাহ এবং ঋণের বোঝা থেকে আশ্রয় চাই।
দোয়াটি খুব ছোট। প্রতিদিন নামাজের মধ্যে মাসনুন দোয়ার অংশ হিসেবে এবং সাধারণ সময়েও আল্লাহর কাছে ঋণের চাপ থেকে মুক্তির জন্য এই দোয়া করা যেতে পারে। তবে শুধু মুখে দোয়া পড়ে ঋণ পরিশোধের চেষ্টা না করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
ঋণ ও আর্থিক সংকটের ক্ষেত্রে বহুল পরিচিত আরেকটি দোয়া হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। এক ব্যক্তি তাঁর কাছে ঋণ পরিশোধে সাহায্য চাইলে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো কিছু শব্দ তাকে শেখান। জামে তিরমিজিতে বর্ণিত দোয়াটি হলো—
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা, ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াক।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনার হালাল দ্বারা আমাকে আপনার হারাম থেকে যথেষ্ট করে দিন এবং আপনার অনুগ্রহে আপনি ছাড়া অন্য সবার মুখাপেক্ষিতা থেকে আমাকে মুক্ত করুন।
এই দোয়ার মধ্যে শুধু ঋণ থেকে মুক্তির আবেদনই নেই, বরং হালাল উপার্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। একজন মুসলমান আর্থিক সংকটে পড়লেও সুদ, প্রতারণা, ঘুষ কিংবা অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণের পথে যাবেন না—বরং আল্লাহর কাছে হালাল রিজিক চাইবেন এবং বৈধ পথে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) দুশ্চিন্তা, অসহায়ত্ব ও ঋণের চাপ থেকে মুক্তির জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া করতেন। সহিহ বুখারিতে হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত দোয়াটি হলো—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْجُبْنِ وَالْبُخْلِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ، وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাজানি, ওয়াল আজজি ওয়াল কাসালি, ওয়াল জুবনি ওয়াল বুখলি, ওয়া দালা’ইদ দাইনি, ওয়া গালাবাতির রিজাল।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা ও দুঃখ, অক্ষমতা ও অলসতা, কাপুরুষতা ও কৃপণতা, ঋণের ভার এবং মানুষের আধিপত্য থেকে আশ্রয় চাই।
ঋণের কারণে যিনি দুশ্চিন্তায় আছেন, তার জন্য এই দোয়াটি বিশেষ অর্থবহ। এখানে ঋণের পাশাপাশি দুশ্চিন্তা, অলসতা ও অক্ষমতা থেকেও আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। কারণ ঋণমুক্ত হতে শুধু অর্থের প্রয়োজন হয় না; কাজ করার শক্তি, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মানসিকতাও দরকার।
ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ইসলামের আরেকটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক শিক্ষা হলো পরিশোধের আন্তরিক নিয়ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ গ্রহণ করে তা পরিশোধ করার ইচ্ছায়, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধে সাহায্য করেন; আর যে তা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন। (সহিহ বুখারি)।
এই হাদিস ঋণগ্রস্ত মানুষের জন্য যেমন আশার বার্তা, তেমনি বড় সতর্কতাও। ঋণ নেওয়ার সময় থেকেই ফেরত দেওয়ার আন্তরিক ইচ্ছা থাকতে হবে। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধ না করে টাকা অন্য কাজে ব্যয় করা কিংবা পাওনাদারকে বারবার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া উচিত নয়।
কোরআনেও ঋণকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে। সুরা বাকারার ২৮২ নম্বর আয়াতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণ লেনদেন হলে তা লিখে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি কোরআনের দীর্ঘতম আয়াত। এখান থেকে বোঝা যায়, ঋণ শুধু বিশ্বাসের ওপর ছেড়ে না দিয়ে পরিমাণ, সময়সীমা ও শর্ত পরিষ্কারভাবে লিখে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এতে ভবিষ্যতে ভুল বোঝাবুঝি ও বিরোধের আশঙ্কা কমে।
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি প্রকৃত অর্থেই আর্থিক সংকটে থাকেন, তাহলে পাওনাদারের জন্যও কোরআনে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَإِنْ كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَىٰ مَيْسَرَةٍ
বাংলা উচ্চারণ: ওয়া ইন কানা যু উসরাতিন ফানাযিরাতুন ইলা মাইসারাহ।
অর্থ: আর ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তাহলে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দিতে হবে। (সুরা বাকারা: ২৮০)
একই আয়াতে ঋণ মাফ করে দেওয়াকে আরও উত্তম বলা হয়েছে, যদি মানুষ এর কল্যাণ বুঝতে পারে। অর্থাৎ ইসলাম শুধু ঋণগ্রহীতার দায়িত্বের কথা বলেনি; অসহায় ঋণগ্রহীতার প্রতি পাওনাদারকেও মানবিক হতে শিক্ষা দিয়েছে।
ঋণমুক্তির ক্ষেত্রে ইস্তিগফার ও তাওবাও একজন মুসলমানের নিয়মিত আমলের অংশ হতে পারে। কোরআনে হজরত নুহ (আ.) তাঁর জাতিকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে বলেছেন এবং এরপর সম্পদ ও সন্তানসহ আল্লাহর নিয়ামতের কথা উল্লেখ করেছেন। (সুরা নুহ: ১০-১২)। তবে এখান থেকে এমন নিশ্চয়তা দেওয়া ঠিক নয় যে নির্দিষ্ট সংখ্যক ইস্তিগফার করলেই নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পাওয়া যাবে বা ঋণ সঙ্গে সঙ্গে শেষ হবে। বরং ইস্তিগফার আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও কল্যাণ চাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।
ইস্তিগফারের সহজ বাক্য—
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ
বাংলা উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি।
অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাঁর কাছেই তাওবা করি।
ঋণমুক্তির চেষ্টা করতে গিয়ে হালাল উপার্জন বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় মানুষ ঋণ পরিশোধের জন্য দোয়া করেন, কিন্তু একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা, বিলাসিতা কিংবা আয়ের তুলনায় বেশি ব্যয় চালিয়ে যান। এমন অবস্থায় সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন হয়ে পড়ে। তাই মাসিক আয় ও ব্যয়ের হিসাব লিখে রাখা, প্রয়োজন ও বিলাসিতাকে আলাদা করা এবং অতিরিক্ত অর্থ পাওয়া গেলে ঋণ পরিশোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।
একাধিক ঋণ থাকলে সেগুলোর পরিমাণ, পাওনাদার, পরিশোধের সময়সীমা এবং কিস্তির হিসাব লিখে একটি পরিকল্পনা করা যেতে পারে। কোনো কিস্তি সময়মতো দেওয়া সম্ভব না হলে পাওনাদারের কাছ থেকে লুকিয়ে না থেকে আগেই কথা বলা উচিত। নিজের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা জানিয়ে সময় চাওয়া মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার চেয়ে উত্তম।
ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করাও ইসলামে নিন্দনীয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সচ্ছল ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করা জুলুম।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)। তাই হাতে অর্থ থাকা সত্ত্বেও পাওনাদারের টাকা আটকে রেখে অন্য অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করা উচিত নয়।
ঋণের বিষয়টি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে মৃত্যুর আগেও মানুষের দেনা-পাওনার হিসাব পরিষ্কার রাখা দরকার। কার কাছে কত টাকা পাওনা রয়েছে, পরিবারের বিশ্বস্ত সদস্যদের তা জানানো এবং প্রয়োজনীয় তথ্য লিখে রাখা ভালো। কারণ মৃত্যু হলে উত্তরাধিকার বণ্টনের আগেই মৃত ব্যক্তির ঋণ ও সংশ্লিষ্ট দায় পরিশোধের বিষয়টি ইসলামী বিধানে গুরুত্ব পায়।
ঋণগ্রস্ত অবস্থায় হতাশ হয়ে যাওয়া ঠিক নয়। ঋণের অঙ্ক বড় হলেও আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে কোনো দোয়া বা আমলকে দ্রুত অর্থ পাওয়ার “ফর্মুলা” মনে না করে আল্লাহর সাহায্য চেয়ে বাস্তব প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কাজের সুযোগ বৃদ্ধি, বৈধ অতিরিক্ত আয়ের চেষ্টা, অপ্রয়োজনীয় খরচ বন্ধ এবং নিয়মিত অল্প অল্প করে ঋণ পরিশোধ—এসবই ঋণমুক্তির পরিকল্পনার অংশ হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, ঋণমুক্তির জন্য কোরআন-হাদিসের শিক্ষা তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে সামনে আনে—আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে সাহায্য চাওয়া, হালাল পথে উপার্জন ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা এবং মানুষের পাওনা ফেরত দেওয়ার দৃঢ় চেষ্টা করা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো ঋণের দোয়াগুলো নিয়মিত পড়ার পাশাপাশি বাস্তব জীবনে সঠিক আর্থিক পরিকল্পনা করলে একজন মুসলমান আল্লাহর সাহায্যের আশা করতে পারেন।
আজকের শিক্ষা: ঋণের চাপে থাকলে হতাশ না হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া পড়ুন, আল্লাহর কাছে হালাল রিজিক চান এবং ঋণ পরিশোধের আন্তরিক নিয়ত রাখুন। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে পাওনাদারের হক পরিশোধকে অগ্রাধিকার দিন। কোনো নির্দিষ্ট আমলকে অলৌকিকভাবে ঋণ শেষ করার উপায় মনে না করে দোয়ার সঙ্গে বাস্তব প্রচেষ্টাও চালিয়ে যান।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
