ডায়াবেটিস থাকলেও কি আলু খাওয়া যাবে? জেনে নিন সঠিক নিয়ম
পরিমিত পরিমাণে এবং স্বাস্থ্যকর উপায়ে খেলে আলুও হতে পারে সুষম খাদ্যের অংশ।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেকেই মনে করেন, আলু খাওয়া মানেই রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়া। ফলে অনেকেই খাদ্যতালিকা থেকে আলু পুরোপুরি বাদ দিয়ে দেন। কিন্তু পুষ্টিবিদদের মতে, আলু নিজে কোনো নিষিদ্ধ খাবার নয়। বরং কতটুকু, কীভাবে এবং কোন খাবারের সঙ্গে খাওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ের ওপরই নির্ভর করে এটি রক্তে শর্করার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে।
আলুতে রয়েছে কার্বোহাইড্রেট, পটাশিয়াম, ভিটামিন সি, ভিটামিন বি৬ এবং শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন খনিজ উপাদান। তাই আলু সম্পূর্ণ বাদ না দিয়ে সঠিক নিয়মে খেলে এটি একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যের অংশ হতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনলে আলু খেয়েও ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
আলু কি সত্যিই ব্লাড সুগার বাড়ায়?
আলুতে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এটি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বাড়াতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আলু খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। আলুর প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করে এর ধরন, রান্নার পদ্ধতি, পরিমাণ এবং অন্য খাবারের সঙ্গে খাওয়ার ওপর।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সেদ্ধ আলুর তুলনায় ডিপ ফ্রাই বা ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ে অতিরিক্ত চর্বি ও ক্যালোরি থাকে। আবার আলু যদি প্রোটিন ও আঁশসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে খাওয়া হয়, তাহলে গ্লুকোজ ধীরে ধীরে রক্তে প্রবেশ করে।
পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ। একবারে বেশি আলু খাওয়ার পরিবর্তে অল্প পরিমাণে খাওয়া ভালো।
এক বেলার খাবারে বড় একটি আলুর পরিবর্তে ছোট বা মাঝারি আকারের একটি আলুর সমপরিমাণ গ্রহণ করাই ভালো। এতে অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের ঝুঁকি কমে।
আলুর সঙ্গে অবশ্যই প্রোটিন রাখুন
শুধু আলু খেলে রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়তে পারে। কিন্তু আলুর সঙ্গে মাছ, মুরগি, ডিম, ডাল, ছোলা কিংবা অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার থাকলে গ্লুকোজ ধীরে শোষিত হয়। তাই ভাত, আলু ও শুধু তরকারির বদলে প্লেটে প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ানো উচিত।
বেশি আঁশযুক্ত খাবারের সঙ্গে খান
সবুজ শাকসবজি, সালাদ, ব্রকলি, ফুলকপি, শসা, গাজর কিংবা অন্যান্য আঁশযুক্ত সবজির সঙ্গে আলু খেলে খাবারের গ্লাইসেমিক প্রভাব কমে। আঁশ হজমের গতি কমিয়ে দেয়। ফলে খাবারের পর রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।
আলু ভাজার বদলে সেদ্ধ বা বেক করা ভালো
রান্নার ধরনও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ডিপ ফ্রাই করা আলু, চিপস বা ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের পরিবর্তে সেদ্ধ, ভাপে রান্না করা অথবা বেক করা আলু তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর। অতিরিক্ত তেলে ভাজা আলু শুধু ব্লাড সুগার নয়, ওজন বৃদ্ধি এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
রান্না করা আলু ঠান্ডা করে খাওয়ার উপকারিতা
অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, রান্না করা আলু কিছু সময় ঠান্ডা করে খেলে এতে রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ তৈরি হয়। এই স্টার্চ শরীরে ধীরে হজম হয় এবং রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বাড়তে দেয় না। তাই অনেক বিশেষজ্ঞ সেদ্ধ আলু রান্নার পর কিছু সময় ঠান্ডা করে সালাদ বা অন্য খাবারের সঙ্গে খাওয়ার পরামর্শ দেন।
খালি পেটে আলু খাবেন না
খালি পেটে শুধু আলু বা আলুভিত্তিক খাবার খেলে রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। সকালের নাশতা বা দুপুরের খাবারে আলু থাকলে তার সঙ্গে ডিম, ডাল, দই বা অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন-আম খেতে ভালোবাসেন? প্রতিদিন কতটুকু খাওয়া নিরাপদ জানেন কি
আলুর খোসাও উপকারী
সম্ভব হলে ভালোভাবে ধুয়ে খোসাসহ আলু রান্না করা যেতে পারে। খোসায় তুলনামূলক বেশি আঁশ থাকে, যা হজম ধীর করে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। তবে অবশ্যই আলু পরিষ্কার করে ধুয়ে নিতে হবে।
কোন ধরনের আলু এড়িয়ে চলবেন?
প্রক্রিয়াজাত আলুভিত্তিক খাবার যেমন— ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, পটেটো চিপস, অতিরিক্ত মাখন বা ক্রিম দেওয়া ম্যাশড পটেটো, অতিরিক্ত তেলে ভাজা আলুর পদ এসব যতটা সম্ভব কম খাওয়াই ভালো। এসব খাবারে শুধু কার্বোহাইড্রেট নয়, অতিরিক্ত লবণ, চর্বি এবং ক্যালোরিও থাকে।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
শুধু আলু নয়, প্রতিদিনের পুরো খাদ্যাভ্যাসই ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করা, পর্যাপ্ত পানি পান করা, সময়মতো খাবার খাওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করলে সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
এ ছাড়া নিয়মিত ব্লাড সুগার পরীক্ষা করলে কোন খাবার আপনার শরীরে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সেটিও সহজে বোঝা যায়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
পুষ্টিবিদদের মতে, ডায়াবেটিস থাকলেও আলু পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং সঠিক পরিমাণ, স্বাস্থ্যকর রান্নার পদ্ধতি এবং প্রোটিন ও আঁশসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে আলু খেলে অধিকাংশ মানুষ নিরাপদভাবেই এটি খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। তবে যাদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নেই বা অন্য জটিলতা রয়েছে, তাদের ব্যক্তিগত খাদ্যতালিকা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
ডায়াবেটিস মানেই প্রিয় সব খাবার ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং সচেতন খাদ্যাভ্যাসই হতে পারে সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি। সঠিক নিয়মে এবং পরিমিত পরিমাণে আলু খেলে ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রেখেও এর পুষ্টিগুণ উপভোগ করা সম্ভব।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
