সৃষ্টির এক রহস্যময় দিন শুক্রবার: কেন জুমার দিন মুসলমানদের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?

reporter
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬, ৯:১৭ পূর্বাহ্ণ
সৃষ্টির এক রহস্যময় দিন শুক্রবার: কেন জুমার দিন মুসলমানদের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?

সৃষ্টির এক রহস্যময় দিন শুক্রবার: কেন জুমার দিন মুসলমানদের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?

মুসলমানদের কাছে শুক্রবার বা জুমার দিন শুধু সপ্তাহের একটি দিন নয়; এটি বিশেষ মর্যাদা, রহমত, ক্ষমা ও বরকতের দিন। কোরআন ও হাদিসে এ দিনের গুরুত্ব এত বেশি যে ইসলামে শুক্রবারকে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মানবজাতির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনার সঙ্গে এই দিনের সম্পর্ক রয়েছে। ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টি, জান্নাতে প্রবেশ, পৃথিবীতে আগমন এবং কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার মতো ঘটনাগুলোও শুক্রবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

ইসলামি গবেষকদের মতে, মহান আল্লাহ তাআলা সময়ের মধ্যেও কিছু সময়কে অন্য সময়ের ওপর বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। যেমন বছরের মধ্যে রমজান মাস, রাতের মধ্যে লাইলাতুল কদর এবং সপ্তাহের মধ্যে শুক্রবারকে বিশেষ সম্মান দান করা হয়েছে। তাই একজন মুসলমানের জন্য শুক্রবার আত্মশুদ্ধি, ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম সুযোগ।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সূর্য উদিত হওয়ার দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। এ দিন আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দিন তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে, এ দিন তাঁকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং জুমার দিনই কিয়ামত সংঘটিত হবে।” (সহিহ মুসলিম: ১৮৬২, আবু দাউদ: ৯৬১)

এই হাদিস থেকেই বোঝা যায়, শুক্রবার কেবল একটি সাপ্তাহিক ইবাদতের দিন নয়; বরং মানবজাতির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ইসলামে জুমার দিনের মর্যাদা এতটাই বেশি যে পবিত্র কোরআনে ‘সুরা জুমুআ’ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সুরা নাজিল করা হয়েছে। সেখানে মুমিনদের উদ্দেশে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, জুমার আজান হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও দুনিয়াবি কাজকর্ম সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হতে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা বন্ধ কর। এটা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।” (সুরা জুমুআ: ৯)

এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে যে জুমার নামাজ শুধু একটি ইবাদত নয়, বরং এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

জুমার দিন মুসলমানদের জন্য সাপ্তাহিক ঈদের দিন হিসেবেও পরিচিত। এই দিনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলমানরা মসজিদে একত্রিত হয়ে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করেন। ধনী-গরিব, ছোট-বড়, জাতি-গোত্রের ভেদাভেদ ভুলে সবাই একই কাতারে দাঁড়ান। ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে এই দিন।

হাদিসে জুমার দিনের বিশেষ কিছু আমলের কথাও বলা হয়েছে। এর মধ্যে গোসল করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, উত্তম পোশাক পরা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, আগে মসজিদে যাওয়া এবং মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা অন্যতম।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে, উত্তম পোশাক পরিধান করে, সুগন্ধি ব্যবহার করে, তারপর মসজিদে এসে কাউকে কষ্ট না দিয়ে নামাজ আদায় করে এবং খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনে, তার এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত সগিরা গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” (আবু দাউদ: ৩৪৩)

ইসলামি স্কলাররা বলেন, বর্তমান ব্যস্ত জীবনে মানুষ নানা দুশ্চিন্তা, ভুল ও গাফিলতির মধ্যে পড়ে যায়। শুক্রবার সেই ভুলত্রুটি থেকে ফিরে এসে নতুনভাবে আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ করে দেয়। এ দিন বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া-ইস্তিগফার এবং নফল ইবাদতে সময় ব্যয় করা উত্তম।

এ ছাড়া হাদিসে এমন একটি সময়ের কথাও উল্লেখ রয়েছে, যখন জুমার দিনে করা দোয়া আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে কবুল করেন। যদিও সেই সময়টি নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি, তবে আলেমরা আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

বর্তমান সময়ে অনেক মুসলমান জুমার দিনের গুরুত্ব সম্পর্কে জানলেও এর প্রকৃত মর্যাদা অনুযায়ী আমল করতে পারেন না। ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি বা অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে অনেকে জুমার প্রস্তুতি ও আমলে অবহেলা করেন। অথচ সপ্তাহের এই একটি দিনই হতে পারে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন, গুনাহ মাফ এবং আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহের অন্যতম সেরা সুযোগ।

তাই একজন সচেতন মুসলমানের উচিত শুক্রবারের গুরুত্ব উপলব্ধি করা, কোরআন-হাদিসে বর্ণিত আমলগুলো পালন করা এবং এ দিনটিকে ইবাদত, দোয়া ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে অর্থবহ করে তোলা। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে শুক্রবার শুধু একটি দিন নয়, বরং রহমত, বরকত ও ক্ষমার এক অনন্য উপহার।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন