পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিরাপত্তা শান্তি ও বিতর্কের বাস্তবতা
পার্বত্য অঞ্চলে ত্রাণ বিতরণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের তিন পার্বত্য জেলা—খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান—ভৌগোলিক, কৌশলগত ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। সীমান্তবর্তী এই এলাকায় একদিকে যেমন রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা, অন্যদিকে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সশস্ত্র তৎপরতা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং নিরাপত্তা সংকটও বাস্তবতা হিসেবে বিদ্যমান। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা এবং বিতর্ক নতুন নয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী মোতায়েনের মূল উদ্দেশ্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা প্রদান। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র সংগঠনের কার্যক্রম এ অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষ, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠীর আবির্ভাবও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
সম্প্রতি রাঙামাটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ দাবি করেছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পার্বত্য অঞ্চলে ১৬টি হত্যাকাণ্ড, ৪৭টি অপহরণ এবং শতাধিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। সংগঠনটির অভিযোগ অনুযায়ী, সাধারণ ব্যবসায়ী, কৃষক, পরিবহন শ্রমিক ও শিক্ষার্থীরাও এসব ঘটনার শিকার হচ্ছেন। যদিও এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট সংগঠনের দাবি, তবুও পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি সেনাবাহিনী পার্বত্য অঞ্চলে বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডেও দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত রয়েছে। দুর্গম এলাকায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগে অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখার উদাহরণ রয়েছে। ২০১৭ সালের রাঙামাটির ভয়াবহ পাহাড়ধসে উদ্ধার অভিযানে অংশ নিতে গিয়ে সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্য প্রাণ হারান, যা দুর্যোগ মোকাবিলায় তাদের ভূমিকার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
অন্যদিকে, পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন অতীতে সেনা উপস্থিতি এবং কিছু অভিযানের সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে এবং এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। তবে নিরাপত্তা বাহিনী বরাবরই জানিয়ে এসেছে, তারা সংবিধান ও প্রচলিত আইনের আওতায় দায়িত্ব পালন করে এবং যেকোনো অভিযোগ তদন্তের সুযোগ রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় ভিন্ন। সীমান্তবর্তী দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, বিচ্ছিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক জটিলতা এ অঞ্চলকে একটি বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে এসেছে। ফলে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং মানবাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
দীর্ঘমেয়াদে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। শান্তিচুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন, সব পক্ষের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের ন্যায়সঙ্গত সমাধান, সন্ত্রাস ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সকল সম্প্রদায়ের সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করাই হতে পারে টেকসই সমাধানের পথ। নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং পারস্পরিক বিশ্বাস—এই তিনটির সমন্বয়েই পার্বত্য চট্টগ্রাম সত্যিকার অর্থে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে যেতে পারে।
