অন্যের চার্জার দিয়ে ফোন চার্জ করলে কী হয়?

প্রকাশিত: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৩২ অপরাহ্ণ
অন্যের চার্জার দিয়ে ফোন চার্জ করলে কী হয়?

অন্যের চার্জার দিয়ে ফোন চার্জ করলে কী হয়

জরুরি মুহূর্তে নিজের ফোনের চার্জার সঙ্গে না থাকলে অন্যের চার্জার ব্যবহার করা খুবই স্বাভাবিক। অফিস, বাসা, ভ্রমণ, বন্ধুর বাড়ি কিংবা বাইরে কোথাও ব্যাটারি শেষ হয়ে আসলে হাতের কাছে থাকা চার্জার দিয়েই ফোনে চার্জ দেওয়ার ঘটনা কমবেশি সবারই ঘটে। কিন্তু অন্যের চার্জার ব্যবহার করলেই কি ফোনের ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যায়? ভিন্ন ব্র্যান্ডের চার্জার ব্যবহার করলে কি ফোনের ক্ষতি হতে পারে? ২৫ ওয়াটের ফোনে ৬৫ ওয়াটের চার্জার ব্যবহার করলে কী হবে? এসব প্রশ্ন নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে নানা ধরনের ধারণা রয়েছে।

বাস্তবতা হলো, শুধু চার্জারটি অন্য কারও বা অন্য ব্র্যান্ডের হওয়ার কারণে ফোনের ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যাবে, এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই। বরং চার্জারের মান, ফোনের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য, চার্জিং প্রোটোকল, কেবলের সক্ষমতা এবং চার্জ দেওয়ার সময় তাপমাত্রা—এসব বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। Apple নিজেও সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রযোজ্য নিরাপত্তা মান মেনে চলা তৃতীয় পক্ষের পাওয়ার অ্যাডাপ্টার ব্যবহারের অনুমতি দেয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে যেকোনো চার্জার দিয়ে নিশ্চিন্তে ফোন চার্জ করা যাবে। নকল, ক্ষতিগ্রস্ত বা নিম্নমানের চার্জার এবং কেবল ব্যবহার করলে চার্জিং সমস্যা থেকে শুরু করে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। Samsung তাদের সাপোর্ট নির্দেশনায় সামঞ্জস্যপূর্ণ চার্জার ও কেবল ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এবং অনুপযুক্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত অ্যাকসেসরিজের কারণে ধীর চার্জিং, চার্জিং বন্ধ হয়ে যাওয়া বা অন্য সমস্যা হতে পারে বলে সতর্ক করেছে।

আধুনিক স্মার্টফোনে চার্জিং ব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক বেশি বুদ্ধিমান। বিশেষ করে USB Power Delivery বা USB PD-এর মতো প্রযুক্তিতে চার্জার ও ডিভাইসের মধ্যে পাওয়ার ব্যবস্থাপনা করা যায়। USB Implementers Forum-এর তথ্য অনুযায়ী, USB PD ডিভাইসের প্রয়োজন অনুযায়ী পাওয়ার সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও নমনীয় করে এবং ডিভাইস প্রয়োজন অনুযায়ী পাওয়ার নিতে পারে। ফলে চার্জারের গায়ে বেশি ওয়াট লেখা থাকলেই ফোন বাধ্যতামূলকভাবে সেই সর্বোচ্চ ক্ষমতা গ্রহণ করে না।

এ কারণেই ২৫ ওয়াট চার্জিং সমর্থন করা একটি ফোনে মানসম্মত ৬৫ ওয়াটের সামঞ্জস্যপূর্ণ চার্জার ব্যবহার করলেই ফোন ৬৫ ওয়াটে চার্জ হবে—এমন নয়। ফোন, চার্জার ও কেবলের সমর্থিত প্রযুক্তি অনুযায়ী চার্জিং ক্ষমতা নির্ধারিত হয়। তবে দ্রুত চার্জিংয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চার্জিং স্ট্যান্ডার্ড ও কেবল সমর্থন না করলে চার্জের গতি কমে যেতে পারে। Apple-এর ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মডেলের দ্রুত চার্জিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট ন্যূনতম পাওয়ার আউটপুট এবং উপযুক্ত USB-C অ্যাডাপ্টারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব ফোন নির্মাতা তৃতীয় পক্ষের চার্জার সম্পর্কে একই ধরনের নির্দেশনা দেয় না। Apple নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ও সামঞ্জস্যের শর্ত পূরণ করা তৃতীয় পক্ষের অ্যাডাপ্টার ব্যবহারের কথা বললেও Samsung তাদের নিজস্ব সামঞ্জস্যপূর্ণ চার্জার ও কেবল ব্যবহারের ওপর জোর দেয়। তাই কোনো নির্দিষ্ট ফোনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত নিতে হলে সংশ্লিষ্ট নির্মাতার নির্দেশনা অনুসরণ করাই ভালো।

অন্যের চার্জার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি আসলে চার্জারের ব্র্যান্ড আলাদা হওয়া নয়, বরং চার্জারটি নকল বা নিম্নমানের হওয়া। বাজারে এমন কিছু চার্জিং অ্যাডাপ্টার রয়েছে যেগুলো দেখতে আসল বা ভালো মানের মনে হলেও ভেতরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ নাও হতে পারে। Samsung বলছে, অননুমোদিত বা নকল চার্জিং অ্যাকসেসরিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না এবং এগুলো ডিভাইসের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

চার্জিং কেবলকেও একই গুরুত্ব দিতে হবে। ভালো অ্যাডাপ্টার থাকলেও কেবলটি যদি ছেঁড়া, অতিরিক্ত বাঁকানো, সংযোগস্থলে ক্ষতিগ্রস্ত বা নিম্নমানের হয়, তাহলে চার্জিংয়ের গতি ও স্থায়িত্বে সমস্যা দেখা দিতে পারে। Samsung-এর নির্দেশনাতেও চার্জার ও USB কেবলে শারীরিক ক্ষতি, ক্ষয় বা বাঁকা পিন আছে কি না পরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।

অন্যের চার্জার ব্যবহারের পর ফোন আগের তুলনায় ধীরে চার্জ হলে সঙ্গে সঙ্গে ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে ব্যাটারি নষ্ট হয়ে গেছে। চার্জারের পাওয়ার ক্ষমতা কম হতে পারে, ফোনের ফাস্ট চার্জিং প্রযুক্তি সেটি সমর্থন নাও করতে পারে অথবা কেবলটি দ্রুত চার্জিংয়ের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। Samsung-এর তথ্য অনুযায়ী, অসামঞ্জস্যপূর্ণ চার্জার, চার্জিং অ্যাকসেসরিজ, ফোনের তাপমাত্রা কিংবা চার্জিং পোর্টে ময়লা জমার কারণেও চার্জিং ধীর হতে পারে।

ব্যাটারির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও শুধু চার্জারের মালিক কে বা চার্জারটি কোন ব্র্যান্ডের, সেটিই প্রধান বিষয় নয়। তাপমাত্রা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। Apple জানিয়েছে, iPhone অতিরিক্ত তাপমাত্রায় থাকলে চার্জিং সাময়িকভাবে থেমে যেতে পারে এবং তাপমাত্রা স্বাভাবিক পর্যায়ে এলে আবার চার্জ শুরু হয়। ব্যাটারির ওপর চাপ কমাতে নির্দিষ্ট পর্যায়ের পর চার্জিংয়ের গতিও কমানো হয়।

তাই চার্জ দেওয়ার সময় ফোন বা চার্জার অস্বাভাবিকভাবে গরম হয়ে গেলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। সামান্য উষ্ণতা সবসময় অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু অতিরিক্ত তাপ, পোড়া গন্ধ, স্পার্ক, কেবল গলে যাওয়া, চার্জ বারবার বিচ্ছিন্ন হওয়া কিংবা অ্যাডাপ্টারের অস্বাভাবিক শব্দ হলে সেটি ব্যবহার বন্ধ করা নিরাপদ। Apple-ও ক্ষতিগ্রস্ত প্লাগ, কেবল, অতিরিক্ত আর্দ্রতার সংস্পর্শে আসা বা পড়ে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অ্যাডাপ্টার ব্যবহার না করার নির্দেশ দিয়েছে।

আরেকটি বিষয় হলো চার্জে থাকা অবস্থায় ফোনের ব্যবহার। অন্যের চার্জার ব্যবহার করার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও চার্জিংয়ের সময় ভারী গেম খেলা, দীর্ঘ সময় ভিডিও রেকর্ড করা বা উচ্চক্ষমতার কাজ করলে ফোনের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ফলে ফোন অতিরিক্ত গরম মনে হলে ব্যবহার কমিয়ে ডিভাইসটিকে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আসতে দেওয়া ভালো।

জরুরি অবস্থায় পাওয়ার ব্যাংক বা কম্পিউটারের USB পোর্ট থেকেও ফোন চার্জ করা যায়, তবে উৎসটির ক্ষমতা ও মানের ওপর চার্জিংয়ের গতি নির্ভর করবে। USB Power Delivery প্রযুক্তি বিভিন্ন পাওয়ার স্তরে ডিভাইস চার্জ করার সুযোগ দেয়, কিন্তু প্রতিটি USB পোর্ট বা চার্জার একই ক্ষমতা দেয় না।

সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, অন্যের চার্জার ব্যবহার করা নিজেই বিপজ্জনক নয়। ভালো মানের, নিরাপদ এবং ফোনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চার্জার হলে জরুরি প্রয়োজনে সেটি ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু অচেনা উৎসের নকল চার্জার, ক্ষতিগ্রস্ত কেবল কিংবা অনুপযুক্ত অ্যাডাপ্টার ব্যবহার করা উচিত নয়। বিশেষ করে নিয়মিত ব্যবহারের জন্য ফোন প্রস্তুতকারকের সুপারিশ করা অথবা নির্ভরযোগ্য মানের চার্জিং অ্যাকসেসরিজ বেছে নেওয়া নিরাপদ পদ্ধতি।

অর্থাৎ চার্জারের গায়ে লেখা ব্র্যান্ডের নামের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এর নিরাপত্তা, মান, সামঞ্জস্য, চার্জিং স্ট্যান্ডার্ড এবং কেবলের অবস্থা। তাই জরুরি মুহূর্তে বন্ধুর বা পরিবারের সদস্যের ভালো মানের সামঞ্জস্যপূর্ণ চার্জার দিয়ে ফোন চার্জ করতে পারেন। শুধু অন্যের চার্জার ব্যবহার করেছেন বলেই ফোনের ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যাবে—এমন আশঙ্কার কারণ নেই। তবে চার্জিংয়ের সময় অস্বাভাবিক তাপ বা অন্য কোনো সমস্যা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চার্জার খুলে পরিস্থিতি পরীক্ষা করাই নিরাপদ।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page