ক্রেডিট কার্ড কিভাবে বানাবো? বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ড করার নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, শর্ত ও আবেদন
বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ড করতে কী যোগ্যতা ও কাগজপত্র লাগে, জেনে নিন।
বর্তমানে বাংলাদেশে কেনাকাটা, অনলাইন পেমেন্ট, বিল পরিশোধ, কিস্তিতে পণ্য কেনা ও জরুরি আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে। তবে ক্রেডিট কার্ড নিতে হলে আবেদনকারীর নির্দিষ্ট যোগ্যতা থাকতে হয় এবং ব্যাংকের যাচাই-বাছাইয়ের পর কার্ড অনুমোদন করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ ব্যাংকগুলোর জন্য নতুন ‘Guidelines on Credit Card Operations of Banks’ প্রকাশ করেছে। ফলে ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযোজ্য নির্দেশনাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ড মূলত বিভিন্ন তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া যায়। তবে সব ব্যাংকের কার্ডের যোগ্যতা, ন্যূনতম আয়, বয়সসীমা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ক্রেডিট লিমিট ও ফি একই নয়। তাই একটি ব্যাংকের শর্ত পূরণ করলেই অন্য ব্যাংকের কার্ড পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না। উদাহরণ হিসেবে, Prime Bank-এর একটি Visa Classic ক্রেডিট কার্ডে বেসিক কার্ডের জন্য বয়স ১৮ থেকে ৭০ বছর এবং চাকরিজীবীদের ন্যূনতম মাসিক আয় ২০ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। স্বনিয়োজিত পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম মাসিক আয় ৪০ হাজার টাকা এবং চাকরি বা ব্যবসার নির্দিষ্ট সময়ের অভিজ্ঞতাও চাওয়া হয়েছে।
ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে বয়সের পাশাপাশি আবেদনকারীর নিয়মিত আয় ও আর্থিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক সাধারণত আবেদনকারীর পেশা, আয়ের উৎস, চাকরি বা ব্যবসার স্থায়িত্ব এবং অন্যান্য আর্থিক তথ্য বিবেচনা করে। কোনো কোনো কার্ডে নির্দিষ্ট আয়ের সীমা থাকে, আবার প্রিমিয়াম কার্ডের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি আয় বা অতিরিক্ত যোগ্যতার প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ক্রেডিট কার্ডের আবেদন করার আগে পছন্দের ব্যাংকের নির্দিষ্ট কার্ডের যোগ্যতা যাচাই করা জরুরি।
ক্রেডিট কার্ডের আবেদনে সাধারণত জাতীয় পরিচয়পত্র বা NID, TIN বা E-TIN-এর তথ্য, ছবি, পেশা ও আয়ের প্রমাণ এবং ব্যাংক স্টেটমেন্টের মতো নথি প্রয়োজন হতে পারে। চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে বেতন সনদ, সাম্প্রতিক পে-স্লিপ, অফিস আইডি এবং নির্দিষ্ট সময়ের ব্যাংক স্টেটমেন্ট চাওয়া হতে পারে। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স, ব্যবসার ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং ব্যবসার ধরন অনুযায়ী অন্যান্য কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে City Islamic Gold American Express Card-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী চাকরিজীবীদের জন্য বেতন সনদ বা শেষ তিন মাসের পে-স্লিপ, E-TIN, অফিস আইডি, ছয় মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও NID-এর কপি চাওয়া হয়। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স বা ব্যবসার গঠনসংক্রান্ত নথি এবং ১২ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ বিভিন্ন কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে।
ক্রেডিট কার্ডের আবেদন সাধারণত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নির্ধারিত আবেদন ফরম পূরণের মাধ্যমে করা যায়। অনেক ব্যাংক তাদের ওয়েবসাইটে অনলাইন আবেদন বা ‘Apply Now’ সুবিধা দেয়, আবার শাখা বা নির্ধারিত চ্যানেলের মাধ্যমেও আবেদন গ্রহণ করা হয়। আবেদন করার সময় ব্যক্তিগত পরিচয়, পেশা, আয়, যোগাযোগের ঠিকানা এবং প্রয়োজনীয় নথির তথ্য সঠিকভাবে দিতে হয়। এরপর ব্যাংক আবেদনকারীর দেওয়া তথ্য ও নথি যাচাই করে এবং নিজস্ব ক্রেডিট মূল্যায়নের ভিত্তিতে কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অনুমোদন পাওয়া গেলেই নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় কার্ড ইস্যু করা হয়।
ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার আগে শুধু কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা জানলেই হবে না, এর খরচ ও শর্তও ভালোভাবে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। কার্ডভেদে বার্ষিক বা নবায়ন ফি, সুদের হার, নগদ উত্তোলন ফি, বিলম্ব ফি এবং অন্যান্য চার্জ থাকতে পারে। আবার কিছু ব্যাংক নির্দিষ্ট সংখ্যক লেনদেন বা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে বার্ষিক ফি মওকুফের সুবিধা দেয়। যেমন, EBL-এর কিছু ক্রেডিট কার্ডে বছরে ২৪টি লেনদেন করলে নবায়ন ফি না দেওয়ার সুবিধা রয়েছে।
ক্রেডিট কার্ডের অন্যতম সুবিধা হলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিল পরিশোধ করলে কিছু কার্ডে interest-free period পাওয়া যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন কার্ডে EMI, রিওয়ার্ড পয়েন্ট, ক্যাশব্যাক, ডিসকাউন্ট ও অন্যান্য অফার থাকতে পারে। তবে এসব সুবিধা কার্ড ও ব্যাংকভেদে আলাদা এবং নির্দিষ্ট শর্ত প্রযোজ্য হতে পারে। তাই কার্ড নেওয়ার আগে ব্যাংকের সর্বশেষ Schedule of Charges এবং সংশ্লিষ্ট কার্ডের নিয়মগুলো দেখে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের নতুন নির্দেশনার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর নিজস্ব প্রকাশিত শর্তও নিয়মিত পরিবর্তিত হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ড করতে হলে সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক ও যোগ্য আবেদনকারীকে নির্ধারিত বয়স, আয় ও পেশাগত শর্ত পূরণ করতে হয় এবং পরিচয়, আয় ও আর্থিক সক্ষমতার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়। এরপর ব্যাংক আবেদনকারীর তথ্য যাচাই করে কার্ড অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেয়। যেহেতু ব্যাংক ও কার্ডভেদে যোগ্যতা, ফি, লিমিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আলাদা হতে পারে, তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সর্বশেষ নিয়ম ও শর্ত যাচাই করাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
