মালয়েশিয়ায় বিদেশি শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর নতুন আলোচনা
মালয়েশিয়ায় বিদেশি শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর আলোচনা
মালয়েশিয়ায় কর্মরত বিদেশি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেশটির সরকার বর্তমানে ন্যূনতম মজুরি ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার রিঙ্গিত করার সম্ভাবনা পর্যালোচনা করছে। তবে ২ হাজার রিঙ্গিত এখনো চূড়ান্ত বা অনুমোদিত মজুরি নয়। মালয়েশিয়ার অর্থমন্ত্রী আকমল নাসরুল্লাহ মোহাম্মদ নাসির জানিয়েছেন, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ২০২৭ সালের বাজেট উপস্থাপনের সময় জানানো হতে পারে।
২ হাজার রিঙ্গিতের প্রস্তাব কার্যকর হলে বাংলাদেশি টাকায় এর পরিমাণ বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৬০ হাজার টাকা হতে পারে। ২ অক্টোবর ২০২৬-এর বিভিন্ন মুদ্রা বিনিময় তথ্য অনুযায়ী, এক মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতের মূল্য প্রায় ৩০ দশমিক ১ টাকা। সেই হিসাবে ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত প্রায় ৫১ হাজার ২০০ টাকা এবং ২ হাজার রিঙ্গিত প্রায় ৬০ হাজার ২০০ টাকার সমান। তবে প্রবাসীরা দেশে টাকা পাঠানোর সময় ব্যাংক, এক্সচেঞ্জ হাউস ও অন্যান্য সেবাদাতার নির্ধারিত বিনিময় হার ও চার্জের কারণে প্রকৃত প্রাপ্ত অর্থ কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
মালয়েশিয়ার বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিত। এই হার ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বড় নিয়োগকর্তা ও পেশাজীবী খাতে কার্যকর হয় এবং ২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে দেশজুড়ে পূর্ণভাবে কার্যকর করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ন্যূনতম মজুরি শুধু মালয়েশিয়ান নাগরিকদের জন্য নয়; দেশটির বেসরকারি খাতে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকরাও এর আওতাভুক্ত। তবে গৃহকর্মী এ বিধানের বাইরে। মালয়েশিয়ার শ্রম বিভাগও তাদের বর্তমান নির্দেশনায় বিদেশি কর্মীদের ন্যূনতম মজুরি পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করেছে।
২ হাজার রিঙ্গিত করার সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের বিষয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর জোহরের ক্লুয়াং জেলা পুলিশ সদর দপ্তরের কোয়ার্টার পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আকমল নাসরুল্লাহ। তিনি বলেন, মজুরি বাড়ানোর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়নের সময় শ্রমিকদের স্বার্থের পাশাপাশি নিয়োগকর্তাদের সক্ষমতাও বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা এমএসএমইগুলোর ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ভার কতটা পড়তে পারে, সেটিও সরকারের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার এমন একটি ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে যাতে শ্রমিকদের আয় ও কল্যাণের বিষয়টি বিবেচনায় থাকে, একই সঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও বাড়তি পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। বিভিন্ন ধরনের নিয়োগকর্তার সক্ষমতার পার্থক্যও মজুরি পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে ২ হাজার রিঙ্গিতের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হলেও সেটিকে এখনই কার্যকর সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এদিকে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী রামানান রামাকৃষ্ণানও স্পষ্ট করেছেন যে নতুন ন্যূনতম মজুরির অঙ্ক এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ২ হাজার, ২ হাজার ১০০ কিংবা ২ হাজার ২০০ রিঙ্গিত—বিভিন্ন অঙ্ক নিয়ে আলোচনা বা প্রস্তাব থাকলেও সরকার এখনো কোনো একটি হার অনুমোদন করেনি। আগস্টে তিনি জানিয়েছিলেন, বর্তমান ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিতের হার বহাল রাখা হবে নাকি তা আরও বাড়ানো হবে, সেটি ন্যাশনাল ওয়েজেস কনসালটেটিভ কাউন্সিলের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর নির্ধারণ করা হবে।
মালয়েশিয়ায় ন্যূনতম মজুরি পুনর্বিবেচনার ক্ষেত্রে শুধু শ্রমিকের আয় নয়, মূল্যস্ফীতি, শ্রম উৎপাদনশীলতা, বেকারত্ব, দারিদ্র্যসীমা এবং মধ্যম বেতনের মতো অর্থনৈতিক সূচক বিবেচনা করা হচ্ছে। মানবসম্পদমন্ত্রী এর আগে জানিয়েছিলেন, শ্রমিকদের মৌলিক প্রয়োজন এবং নিয়োগকর্তাদের বেতন দেওয়ার সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে নতুন হার নির্ধারণের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়ায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বিভিন্ন খাতে কর্মরত রয়েছেন। ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো হলে যারা বর্তমানে নির্ধারিত ন্যূনতম বেতনে কাজ করছেন, তাঁদের মাসিক মূল বেতন বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ২ হাজার রিঙ্গিত কার্যকর হলে বর্তমান ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিতের তুলনায় মাসে ৩০০ রিঙ্গিত বেশি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমান আনুমানিক বিনিময় হারে এই অতিরিক্ত অর্থ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯ হাজার টাকা। তবে এটি কেবল মূল বেতনের হিসাব; ওভারটাইম, ভাতা, থাকার খরচ, কর্তন এবং অন্যান্য সুবিধা বা ব্যয়ের হিসাব এর মধ্যে ধরা হয়নি।
মালয়েশিয়ার শ্রম আইনে ন্যূনতম মজুরি বলতে মূল বেতনকে বোঝানো হয়; বিভিন্ন ভাতা, প্রণোদনা বা অতিরিক্ত অর্থ এর অংশ নয়। দেশটির শ্রম বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও ন্যূনতম মজুরি প্রযোজ্য এবং নিয়োগকর্তার জন্য বিদেশি কর্মীকে এর চেয়ে কম মূল বেতন দেওয়ার সুযোগ নেই। আবাসনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে কর্মীর বেতন থেকে সর্বোচ্চ ১০০ রিঙ্গিত পর্যন্ত কর্তনের বিধানও রয়েছে।
তবে নতুন মজুরি কার্যকর হলে কোন কোন খাতে কত হারে তা প্রযোজ্য হবে, নতুন হার ঘোষণার পর তার বাস্তবায়নের সময়সূচি কী হবে এবং নিয়োগকর্তাদের জন্য কোনো পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থা রাখা হবে কি না—এসব বিষয় এখনো চূড়ান্ত নয়। তাই ২ হাজার রিঙ্গিতকে বর্তমানে মালয়েশিয়ায় বিদেশি শ্রমিকদের নিশ্চিত ন্যূনতম বেতন হিসেবে প্রচার করার সুযোগ নেই।
সরকারের বর্তমান আলোচনায় শ্রমিকদের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আকমল নাসরুল্লাহর বক্তব্যে এমএসএমইগুলোর ওপর বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব বিবেচনার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন মজুরি নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের আগ্রহ থাকলেও চূড়ান্ত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বর্তমান ১ হাজার ৭০০ রিঙ্গিতই প্রযোজ্য ন্যূনতম মজুরি হিসেবে বিবেচিত হবে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য সময় হিসেবে ২০২৭ সালের বাজেট উপস্থাপনার বিষয়টি সামনে এসেছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ২ হাজার রিঙ্গিতের সম্ভাব্য মজুরি নিয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বাজেট বক্তৃতার সময় আসতে পারে। ফলে মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করা এবং অনুমোদন না পাওয়া কোনো প্রস্তাবকে নিশ্চিত বেতন বৃদ্ধি হিসেবে না ধরা।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
