তওবা করার সঠিক নিয়ম কী শুধু আস্তাগফিরুল্লাহ বললেই কি যথেষ্ট

প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৩৪ পূর্বাহ্ণ
তওবা করার সঠিক নিয়ম কী শুধু আস্তাগফিরুল্লাহ বললেই কি যথেষ্ট

তওবা করার সঠিক নিয়ম ও আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ার গুরুত্ব

মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। জীবনের কোনো না কোনো সময় প্রত্যেক মানুষের কাছ থেকেই ছোট-বড় নানা ভুল ও গুনাহ হয়ে যেতে পারে। কেউ জেনে গুনাহ করেন, কেউ অজান্তে ভুল করেন, আবার কেউ ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হন। ইসলামে মানুষের এই দুর্বলতার জন্য তওবার দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়নি; বরং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার জন্য তওবার সুযোগ রাখা হয়েছে। তাই কোনো গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ হয়ে পড়ার পরিবর্তে আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে ফিরে আসাই একজন মুমিনের করণীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু মুখে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বললেই কি তওবা হয়ে যায়, নাকি তওবার জন্য আরও কিছু বিষয় রয়েছে?

কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের আন্তরিকভাবে তওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা আত-তাহরিমের ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা করো।” একই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তওবার মাধ্যমে গুনাহ মোচন এবং জান্নাতে প্রবেশের আশা দেখিয়েছেন। অর্থাৎ তওবা শুধু মুখে কয়েকটি শব্দ উচ্চারণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে মানুষের অন্তরের অনুতাপ এবং নিজের জীবন সংশোধনের বিষয়টি জড়িত।

‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ অর্থ হলো, “আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।” তাই কোনো গুনাহের পর আন্তরিকভাবে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা নিঃসন্দেহে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। কিন্তু একজন ব্যক্তি যদি মুখে ক্ষমা চান অথচ একই গুনাহ করার ইচ্ছা পোষণ করেন এবং গুনাহ থেকে ফিরে আসার কোনো চেষ্টা না করেন, তাহলে তওবার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। তওবার সঙ্গে অন্তরের অনুতাপ, গুনাহ পরিত্যাগ এবং ভবিষ্যতে সেই গুনাহে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প থাকা জরুরি।

তওবার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গুনাহ থেকে ফিরে আসা। একজন মানুষ যে কাজটি গুনাহ হিসেবে উপলব্ধি করেছেন, তা যদি তিনি চালিয়ে যেতে থাকেন এবং একই সঙ্গে শুধু মুখে ক্ষমা চাইতে থাকেন, তাহলে তার তওবার আন্তরিকতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই তওবা করার সময় প্রথমেই যে গুনাহ থেকে তওবা করা হচ্ছে, সেটি ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। যদি গুনাহের কাজটি চলমান কোনো অভ্যাস হয়, তাহলে তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।

দ্বিতীয় বিষয় হলো নিজের করা গুনাহের জন্য অন্তর থেকে অনুতপ্ত হওয়া। একজন মানুষ যখন বুঝতে পারেন যে তিনি আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেছেন, তখন তার মনে সেই কাজের জন্য অনুশোচনা তৈরি হওয়া উচিত। এই অনুতাপই মানুষকে ভবিষ্যতে একই ভুল থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। শুধু মানুষের কাছে নিজের ভুল প্রকাশ করা নয়, বরং নিজের অন্তরে উপলব্ধি করা যে আমি ভুল করেছি এবং আল্লাহর অবাধ্য হয়েছি—এটাই তওবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তৃতীয় বিষয় হলো ভবিষ্যতে সেই গুনাহে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা। এর অর্থ এই নয় যে একজন মানুষ ভবিষ্যতে কখনোই ভুল করতে পারবেন না। মানুষ দুর্বল এবং আবারও কোনো ভুল হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তওবার সময় অন্তরে সত্যিকারের সিদ্ধান্ত থাকতে হবে যে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে সেই গুনাহে ফিরে যাবেন না। পরে যদি দুর্বলতার কারণে আবার ভুল হয়ে যায়, তাহলে আবারও আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে এবং গুনাহ থেকে ফিরে আসার চেষ্টা করতে হবে। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ বান্দার তওবা গ্রহণ করেন এবং দিন-রাত তওবার সুযোগ দেন।

আর যদি গুনাহের সঙ্গে অন্য কোনো মানুষের অধিকার জড়িত থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন কারও টাকা আত্মসাৎ করা, কারও সম্পদ নষ্ট করা, কারও পাওনা আটকে রাখা কিংবা অন্যের কোনো অধিকার অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা—এসব ক্ষেত্রে শুধু ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলাই যথেষ্ট নয়। সম্ভব হলে যার অধিকার নষ্ট হয়েছে, তার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে এবং অন্যায়ের ক্ষতি পূরণের চেষ্টা করতে হবে। কারণ মানুষের হক নষ্ট করে শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে বিষয়টি সম্পূর্ণ হয়ে যায় না।

কারও সম্মান বা অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত করার ক্ষেত্রেও সতর্ক হওয়া দরকার। তবে মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়া বা কোনো বিষয় প্রকাশ করার ফলে যদি আরও বড় ক্ষতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে কীভাবে সংশোধন করা উচিত—এ ধরনের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নেওয়া ভালো। মূল বিষয় হলো, অন্যের অধিকার নষ্ট হয়ে থাকলে তা সংশোধনের আন্তরিক চেষ্টা করা।

তওবার জন্য নির্দিষ্ট কোনো একটি শব্দ বা দোয়া বলতেই হবে—এমন নয়। একজন মানুষ আল্লাহর কাছে নিজের ভাষায়ও ক্ষমা চাইতে পারেন। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো বিভিন্ন ইস্তিগফার ও তওবার দোয়া রয়েছে, যেগুলো পড়া যেতে পারে। এর মধ্যে অত্যন্ত পরিচিত একটি দোয়া হলো ‘সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার’।

দোয়াটি হলো: “اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ।”

বাংলা উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মা আনতা রব্বী, লা ইলাহা ইল্লা আনতা, খালাকতানী ওয়া আনা আবদুকা, ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়াদিকা মাসতাতাতু, আউযু বিকা মিন শাররি মা সানাতু, আবূউ লাকা বিনি‘মাতিকা আলাইয়্যা, ওয়া আবূউ লাকা বিযাম্বী, ফাগফির লী, ফাইন্নাহু লা ইয়াগফিরুয যুনূবা ইল্লা আনতা।”

এর অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনি আমার রব, আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার বান্দা। আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী আপনার অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির ওপর আছি। আমি যা করেছি তার অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আমার ওপর আপনার নিয়ামত স্বীকার করছি এবং আমার গুনাহও স্বীকার করছি। অতএব আমাকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না।”

এই দোয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো—এখানে বান্দা শুধু ক্ষমা চাইছে না; বরং নিজের রবকে স্বীকার করছে, আল্লাহর নিয়ামত স্বীকার করছে এবং নিজের গুনাহও স্বীকার করছে। ফলে তওবার যে মানসিকতা—অনুতাপ, আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং ক্ষমা প্রার্থনা—তা এই দোয়ার মধ্যে সুন্দরভাবে প্রকাশ পায়।

তবে কেউ যদি সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার মুখস্থ না জানেন, তবুও তওবা করতে পারবেন। আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া যায়। ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা যায়, নিজের ভাষায় দোয়া করা যায় এবং গুনাহ থেকে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। অর্থাৎ তওবার জন্য কোনো নির্দিষ্ট দোয়া মুখস্থ না থাকার কারণে তওবা পিছিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

তওবার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেরি না করা। অনেক মানুষ মনে করেন, পরে কোনো এক সময় তওবা করবেন। কিন্তু মানুষ জানে না তার জীবনের কতটা সময় বাকি আছে। সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, আল্লাহ দিন ও রাতে বান্দাদের তওবার সুযোগ দেন এবং এই সুযোগ কিয়ামতের বড় একটি নিদর্শন হিসেবে সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। তাই গুনাহ হয়ে গেলে ‘পরে তওবা করব’ না ভেবে যত দ্রুত সম্ভব আল্লাহর কাছে ফিরে আসা উচিত।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিসে তওবার প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির বিষয়টিও অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে। সহিহ মুসলিমে আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবায় এমনভাবে আনন্দিত হন, যেমন মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া বাহন ফিরে পেলে একজন মানুষ আনন্দিত হয়। এই হাদিস একজন গুনাহগার মানুষের জন্য বড় আশার বার্তা বহন করে—গুনাহ হয়ে গেলে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়।

তাই ‘শুধু মুখে আস্তাগফিরুল্লাহ বললেই কি যথেষ্ট?’—এর উত্তর হলো, শুধু শব্দ উচ্চারণ করাই তওবার পূর্ণ অর্থ নয়। ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্তিগফার, কিন্তু আন্তরিক তওবার সঙ্গে গুনাহ পরিত্যাগ, অনুতাপ এবং ভবিষ্যতে সেই গুনাহে না ফেরার দৃঢ় সংকল্প থাকা দরকার। আর যদি কোনো মানুষের অধিকার নষ্ট হয়ে থাকে, তাহলে সেই অধিকার যথাসম্ভব ফিরিয়ে দেওয়া বা সংশোধন করাও তওবার অংশ।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, তওবা মানে শুধু গুনাহের পর একটি দোয়া পড়ে নেওয়া নয়; তওবা হলো আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং নিজের জীবনকে সংশোধনের পথে নিয়ে যাওয়া। আজ কোনো ভুল হয়ে থাকলে আজই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া যায়। নিজের ভুল স্বীকার করে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা যায়, আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া যায়, গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় এবং ভবিষ্যতে সেই পথে না ফেরার চেষ্টা করা যায়। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে বারবার তাঁর দিকে ফিরে আসাই একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page