রাতে ঘুম না এলে কোন দোয়া পড়বেন?

প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ৭:০৪ অপরাহ্ণ
রাতে ঘুম না এলে কোন দোয়া পড়বেন?

ঘুমের আগে আল্লাহকে স্মরণ করে প্রশান্তির সন্ধান করুন।

রাতের নীরবতায় অনেকেরই হঠাৎ ঘুম চলে যায়। সারাদিনের কাজের চাপ, দুশ্চিন্তা, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা কিংবা কোনো ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে বিছানায় শুয়েও চোখে ঘুম আসে না। আবার কখনো কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই ঘুম দেরিতে আসতে পারে। এমন সময় একজন মুসলমানের জন্য আল্লাহকে স্মরণ করা, তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া ও আমল অনুসরণ করা প্রশান্তির একটি সুন্দর উপায় হতে পারে।

ঘুমের আগে ও ঘুম না এলে পড়ার জন্য হাদিসে বিভিন্ন জিকির ও দোয়ার কথা এসেছে। তবে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা জরুরি—কোনো নির্দিষ্ট দোয়া পড়লেই সঙ্গে সঙ্গে ঘুম চলে আসবে, এমন নিশ্চয়তা সহিহ হাদিসে দেওয়া হয়নি। বরং এসব দোয়া ও জিকিরের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহকে স্মরণ করা, তাঁর ওপর ভরসা করা এবং অন্তরকে তাঁর সঙ্গে যুক্ত রাখা।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া হলো, যখন কোনো ব্যক্তি রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুমাতে না পারেন, তখন তিনি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে পারেন। হজরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিসে ঘুম না আসার সময় একটি দোয়ার কথা এসেছে। তবে এ বর্ণনাটি নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতার আলোচনা রয়েছে। তাই এটিকে নিশ্চিতভাবে “সহিহ সুন্নত” হিসেবে প্রচার না করে, নির্ভরযোগ্যভাবে প্রমাণিত ঘুমের আমলগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়াই উত্তম।

ঘুমের আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) যে গুরুত্বপূর্ণ আমল করতেন, তার মধ্যে আয়াতুল কুরসি পড়া অন্যতম। সহিহ বুখারিতে আবু হুরায়রা (রা.)-এর দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, শয়তান থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রাতে আয়াতুল কুরসি পড়ার ফজিলতের কথা বলা হয়েছে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) তা সমর্থন করেন। আয়াতুল কুরসি হলো সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত।

আয়াতুল কুরসির অর্থ বুঝে পড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর শুরুতে বলা হয়েছে—

اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ

বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম।

অর্থ: আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক ও রক্ষণাবেক্ষণকারী।

তবে আয়াতুল কুরসির পুরো আয়াত কোরআনের আয়াত হওয়ায় এর সম্পূর্ণ আরবি, উচ্চারণ ও অর্থসহ পড়া উত্তম। রাতে ঘুমানোর আগে এটি পড়ার অভ্যাস একজন মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমলগুলোর একটি।

ঘুমানোর আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়েও আমল করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) রাতে বিছানায় গেলে দুই হাত একত্র করে তাতে ফুঁ দিতেন এবং সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পড়ে শরীরের যতটা সম্ভব অংশে হাত বুলিয়ে দিতেন। তিনি এভাবে তিনবার করতেন। (সহিহ বুখারি)।

ঘুম না এলে নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছেও দোয়া করা যায়। একজন মানুষ তার দুশ্চিন্তা, ভয়, কষ্ট ও প্রয়োজন আল্লাহর কাছে খুলে বলতে পারেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আর যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞেস করে, তখন নিশ্চয়ই আমি নিকটবর্তী। আমি আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দিই, যখন সে আমাকে ডাকে।” (সুরা বাকারা: ১৮৬)। এই আয়াত একজন মুমিনকে মনে করিয়ে দেয় যে, রাতের নির্জনতায়ও আল্লাহ তাঁর বান্দার কথা শুনেন।

ঘুমের আগে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি অত্যন্ত পরিচিত দোয়া হলো—

بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ أَمُوتُ وَأَحْيَا

বাংলা উচ্চারণ: বিসমিকা আল্লাহুম্মা আমুতু ওয়া আহইয়া।

অর্থ: হে আল্লাহ! আপনার নামেই আমি মৃত্যুবরণ করি এবং জীবিত হই।

এই দোয়াটি সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে। ঘুমকে এক ধরনের সাময়িক মৃত্যু এবং জাগ্রত হওয়াকে নতুন জীবনের সঙ্গে তুলনা করে এই দোয়ায় বান্দা নিজের জীবন ও মৃত্যুকে আল্লাহর হাতে সঁপে দেয়।

ঘুম না এলে ইস্তিগফার করাও একটি সহজ আমল। বলা যায়—

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ

বাংলা উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহ।

অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।

এটি নির্দিষ্টভাবে “ঘুম আনার দোয়া” নয়। তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, তাঁকে স্মরণ করা এবং নিজের অন্তরকে শান্ত করার জন্য ইস্তিগফার করা যেতে পারে। একইভাবে “সুবহানাল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ”, “আল্লাহু আকবার” এবং দরুদ শরিফ পড়াও সাধারণ জিকির হিসেবে করা যায়।

ঘুমানোর আগে তাসবিহে ফাতেমি পড়ার কথাও সহিহ হাদিসে এসেছে। হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত ফাতেমা (রা.)-কে রাতে ঘুমানোর সময় ৩৩ বার “সুবহানাল্লাহ”, ৩৩ বার “আলহামদুলিল্লাহ” এবং ৩৪ বার “আল্লাহু আকবার” পড়তে শিখিয়েছিলেন। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)। এই জিকির ঘুমের আগে পড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল।

ঘুম না আসার সময় শুধু দোয়া পড়াই নয়, নিজের জীবনযাপনও বিবেচনা করা দরকার। রাতে দীর্ঘ সময় মোবাইলের স্ক্রিন দেখা, অতিরিক্ত চা-কফি পান করা, অনিয়মিত ঘুম, দিনের বেলা দীর্ঘ সময় ঘুমানো কিংবা বিছানায় গিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই সুন্নত আমলের পাশাপাশি ঘুমের জন্য উপযোগী একটি নিয়মিত পরিবেশ তৈরি করাও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।

রাতে বিছানায় শুয়ে যদি নানা চিন্তা মাথায় ঘুরতে থাকে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করে নিজের সমস্যাগুলো তাঁর কাছে তুলে ধরা যেতে পারে। “হাসবুনাল্লাহ” বা “আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট”—এমন অর্থবোধক জিকিরও মানুষকে আল্লাহর ওপর নির্ভরতার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট জিকিরকে ঘুমের নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ঘুম না আসার কারণে যদি কেউ দীর্ঘ সময় বিছানায় অস্থির হয়ে থাকেন, তাহলে ঘড়ির দিকে বারবার তাকিয়ে উদ্বেগ বাড়ানোর পরিবর্তে কিছুক্ষণ শান্তভাবে বসে জিকির বা কোরআন তিলাওয়াত করা যেতে পারে। আলো কমিয়ে পরিবেশ শান্ত রাখা এবং শরীরকে বিশ্রামের সুযোগ দেওয়াও সহায়ক হতে পারে।

তবে যদি দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যা থাকে, নিয়মিত ঘুম না হয়, দিনের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয় কিংবা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতার সঙ্গে ঘুমের সমস্যা চলতে থাকে, তাহলে বিষয়টিকে শুধু ইবাদতের ঘাটতি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। দোয়া ও চিকিৎসা একে অপরের বিকল্প নয়; বরং একজন মুসলমান আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।

সবশেষে বলা যায়, রাতে ঘুম না এলে আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। আল্লাহকে স্মরণ করুন, ঘুমের আগে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া ও জিকির পড়ুন, আয়াতুল কুরসি এবং সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ার অভ্যাস করুন। নিজের দুশ্চিন্তা আল্লাহর কাছে তুলে ধরুন এবং তাঁর ওপর ভরসা রাখুন। ঘুম কখন আসবে সেটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও আল্লাহর স্মরণে রাতের সেই সময়টুকুকে ইবাদতের সুযোগে পরিণত করা আমাদের হাতে রয়েছে।

রাতে ঘুম না এলে মোবাইলে অস্থিরভাবে সময় কাটানোর পরিবর্তে আল্লাহকে স্মরণ করুন। ঘুমের আগে “বিসমিকা আল্লাহুম্মা আমুতু ওয়া আহইয়া” পড়ুন, আয়াতুল কুরসি এবং সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে নিজের দুশ্চিন্তা তুলে ধরুন। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের সমস্যা হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরামর্শ নিন।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page