মোবাইল ব্যবহারে কোন বিষয়গুলো ইসলামে সতর্ক করা হয়েছে?

প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ১:৪৩ অপরাহ্ণ
মোবাইল ব্যবহারে কোন বিষয়গুলো ইসলামে সতর্ক করা হয়েছে?

মোবাইল হোক উপকারী কাজে, গুনাহের কারণ নয়।

মোবাইল ফোন এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যোগাযোগ, শিক্ষা, ব্যবসা, সংবাদ, কোরআন-হাদিস পড়া কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য খোঁজা—অসংখ্য ভালো কাজে মোবাইল ব্যবহার করা যায়। কিন্তু একই যন্ত্রের অপব্যবহার মানুষের সময় নষ্ট করা, গুনাহে জড়িয়ে পড়া, অন্যের সম্মান নষ্ট করা এবং ইবাদতে অমনোযোগী হওয়ার কারণও হতে পারে। তাই ইসলামে মোবাইল ফোনকে আলাদাভাবে ভালো বা খারাপ বলা হয়নি; বরং এর মাধ্যমে মানুষ কী দেখছে, কী বলছে, কী ছড়াচ্ছে এবং কী কাজে সময় ব্যয় করছে—সেটিই মূল বিষয়।

মোবাইল ব্যবহারে প্রথম যে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি, তা হলো হারাম বা অশ্লীল কিছু দেখা। বর্তমানে একটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এমন ছবি, ভিডিও বা ওয়েবসাইটে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব, যা ইসলামে নিষিদ্ধ। কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। সুরা নূরের ৩০ নম্বর আয়াতে মুমিন পুরুষদের দৃষ্টি অবনত রাখার এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই মোবাইল হাতে থাকলেই যা সামনে আসে তা দেখা যাবে—এমন ধারণা একজন মুসলমানের জন্য সঠিক নয়।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গিবত ও পরনিন্দা। আগে মানুষ মুখোমুখি বসে অন্যের আলোচনা করত, এখন সেই একই কাজ অনেক সময় মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, ফেসবুক কমেন্ট বা ব্যক্তিগত চ্যাটে চলে আসে। কারও অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো দোষ বা বিষয় আলোচনা করা, যা সে জানলে অপছন্দ করবে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী গিবত। এমনকি কথাটি সত্য হলেও তা গিবত হতে পারে; আর সত্য না হলে তা অপবাদ বা মিথ্যা আরোপের আরও গুরুতর বিষয় হয়ে যায়। (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৯)।

তৃতীয় বিষয় হলো যাচাই না করে কোনো খবর, ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য দেখেই শেয়ার করে দেওয়া এখন খুব সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু একটি ভুল তথ্য একজন মানুষের সম্মান নষ্ট করতে পারে, পরিবারে সমস্যা তৈরি করতে পারে কিংবা সমাজে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। কোরআনে সংবাদ যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই কোনো পোস্টে লেখা আছে বা অনেক মানুষ শেয়ার করেছে—শুধু এ কারণে সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ, ধর্মীয় বক্তব্য বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংবাদ হলে উৎস যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।

চতুর্থ বিষয় হলো অন্যকে অপমান, উপহাস বা কটূক্তি করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই মনে করেন, কমেন্টে বা ইনবক্সে লেখা কথা সামনাসামনি বলা হয়নি বলে তার গুরুত্ব কম। কিন্তু ইসলামে কথার মাধ্যম পরিবর্তন হলে নৈতিক দায়িত্ব পরিবর্তন হয় না। কারও চেহারা, পোশাক, পরিবার, আর্থিক অবস্থা, উচ্চারণ কিংবা ব্যক্তিগত দুর্বলতা নিয়ে মজা করা বা অপমানজনক মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে। (সহিহ বুখারি: ৬০১৮)।

পঞ্চম বিষয় হলো অন্যের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা। কারও অনুমতি ছাড়া তার মোবাইল দেখা, ব্যক্তিগত মেসেজ পড়া, ব্যক্তিগত ছবি সংরক্ষণ বা অন্যের কথোপকথনের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে দেওয়া—এসবকে শুধু কৌতূহল বলে হালকা করে দেখা উচিত নয়। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তোমরা গুপ্তচরবৃত্তি করো না।” (সুরা হুজুরাত: ১২)। তাই কারও ব্যক্তিগত বিষয় জানার আগ্রহ থাকলেও তার গোপনীয়তার অধিকারকে সম্মান করা জরুরি।

ষষ্ঠ বিষয় হলো অশ্লীল বা অনৈতিক কথাবার্তা ও চ্যাটে জড়িয়ে পড়া। মোবাইলের ব্যক্তিগত চ্যাট অনেক সময় মানুষকে এমন কথা বলার সুযোগ দেয়, যা সামনাসামনি বলা হতো না। কিন্তু একা থাকা অবস্থায়ও একজন মুসলমানের আল্লাহর উপস্থিতির কথা মনে রাখা উচিত। অশ্লীল ভাষা, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা, অবৈধ সম্পর্কের দিকে নিয়ে যায় এমন যোগাযোগ কিংবা হারাম কাজে উৎসাহ দেয় এমন আলোচনা থেকে নিজেকে রক্ষা করা জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) ভালো কথা বলা অথবা নীরব থাকার শিক্ষা দিয়েছেন।

সপ্তম বিষয় হলো অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার করে নামাজ ও ইবাদতে অবহেলা করা। মোবাইল নিজে সমস্যা নয়, কিন্তু যদি একটি মানুষ নামাজের সময়ও ভিডিও, গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা চ্যাটে ব্যস্ত থাকে এবং ইবাদতকে পিছিয়ে দেয়, তাহলে সেটি গুরুতর আত্মিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। একজন মুসলমানের উচিত মোবাইলকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা, মোবাইলের হাতে নিজের সময় ও ইবাদতের নিয়ন্ত্রণ তুলে না দেওয়া।

অষ্টম বিষয় হলো অন্যের সম্মান নিয়ে খেলাচ্ছলে পোস্ট বা ভিডিও তৈরি করা। কারও অনুমতি ছাড়া তার ছবি বা ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা অনেক সময় মানুষের জন্য বিব্রতকর বা ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত মুহূর্ত, পারিবারিক বিষয় বা কারও দুর্বল অবস্থার ছবি প্রকাশ করার আগে তার সম্মতি ও সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। ইসলামে মানুষের সম্মান ও গোপনীয়তার গুরুত্ব রয়েছে।

নবম বিষয় হলো সময় অপচয় করা। মোবাইল হাতে নিয়ে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যাওয়া এখন খুব পরিচিত অভিজ্ঞতা। প্রতিটি মিনিট সরাসরি গুনাহ নয়, কিন্তু একজন মানুষের জীবনের মূল্যবান সময় যদি কোনো উপকারী কাজ ছাড়াই নষ্ট হতে থাকে, তাহলে এটি অবশ্যই আত্মসমালোচনার বিষয়। একজন মুমিনের উচিত নিজের সময়ের হিসাব রাখা এবং মোবাইলকে প্রয়োজন ও উপকারের কাজে বেশি ব্যবহার করা।

দশম বিষয় হলো মিথ্যা, গুজব ও অপপ্রচার ছড়ানো। একটি পোস্ট, কমেন্ট বা ফরওয়ার্ডের মাধ্যমে খুব অল্প সময়ে হাজার মানুষের কাছে কোনো কথা পৌঁছে যেতে পারে। তাই মোবাইলে লেখা বা শেয়ার করা প্রতিটি কথার ব্যাপারে দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান কিংবা ধর্মীয় বিষয়ে অভিযোগ থাকলে প্রমাণ ছাড়া তা প্রচার করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইবাদতের সময় মনোযোগ রক্ষা করা। নামাজের মধ্যে ফোন বেজে ওঠা, বারবার নোটিফিকেশন দেখা বা নামাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফোনের দিকে ছুটে যাওয়া মানুষের মনকে ক্রমাগত দুনিয়াবি ব্যস্ততার মধ্যে আটকে রাখতে পারে। তাই নামাজের সময় ফোন নীরব রাখা এবং ইবাদতের জন্য কিছু সময় সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করা ভালো অভ্যাস।

তবে মোবাইলের ইতিবাচক ব্যবহারও অনেক। কোরআন পড়া, হাদিস শেখা, ইসলামি জ্ঞান অর্জন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, উপকারী শিক্ষা গ্রহণ, ব্যবসা পরিচালনা এবং মানুষের কল্যাণে তথ্য ছড়ানো—এসব ভালো কাজে মোবাইল গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে মোবাইল বর্জন করা উদ্দেশ্য নয়; বরং মোবাইলকে এমনভাবে ব্যবহার করা উচিত, যাতে এটি মানুষের জন্য উপকারের মাধ্যম হয়, গুনাহের দরজা না হয়।

মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি সহজ নীতি মনে রাখা যায়—আমি যা লিখছি, বলছি, দেখছি বা শেয়ার করছি, সেটি যদি প্রকাশ্যে করতে লজ্জা লাগে, তাহলে একান্ত ব্যক্তিগত অবস্থাতেও তা করা উচিত কি না, একবার ভেবে দেখা দরকার। কারণ একজন মুসলমানের নৈতিকতা শুধু মানুষের সামনে নয়, একা থাকলেও একই থাকার কথা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।” (সহিহ বুখারি: ৬০১৮)। এই ছোট হাদিসটি মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত কার্যকর একটি নীতি হতে পারে। কোনো কমেন্ট করার আগে, কোনো পোস্ট শেয়ার করার আগে কিংবা কাউকে মেসেজ পাঠানোর আগে নিজেকে প্রশ্ন করা যায়—এটি কি ভালো ও উপকারী কথা? যদি না হয়, তাহলে নীরব থাকাই উত্তম।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, মোবাইল একটি যন্ত্র মাত্র। এর মাধ্যমে জান্নাতের পথের কাজও করা যায়, আবার গুনাহের পথেও যাওয়া যায়। তাই মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিজের চোখ, কান, জিহ্বা, সময় ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। বিশেষ করে গিবত, অপবাদ, অশ্লীলতা, গুজব, গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং নামাজ-ইবাদতে অবহেলা থেকে নিজেকে রক্ষা করা একজন মুসলমানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

মোবাইল হাতে নেওয়ার আগে শুধু “কী দেখব?” নয়, “কী দেখা উচিত নয়?”—এই প্রশ্নটিও মনে রাখুন। কোনো কিছু দেখার, বলার বা শেয়ার করার আগে যাচাই করুন, কারও ক্ষতি হচ্ছে কি না ভাবুন এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির কথা স্মরণ করুন।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page