যে ৭টি গুনাহকে মানুষ গুনাহই মনে করে না

প্রকাশিত: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ১:৫৫ অপরাহ্ণ
যে ৭টি গুনাহকে মানুষ গুনাহই মনে করে না

৭টি গুনাহকে মানুষ গুনাহই মনে করে না

মানুষ সাধারণত বড় কোনো অপরাধের কথা শুনলেই গুনাহের কথা মনে করে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, শুধু বড় ও প্রকাশ্য অপরাধই নয়, মানুষের প্রতিদিনের কথাবার্তা, আচরণ ও অভ্যাসের মধ্যেও এমন অনেক কাজ রয়েছে, যেগুলোকে আমরা তুচ্ছ মনে করি অথচ সেগুলো গুনাহ হতে পারে। কখনো হাসতে হাসতে বলা একটি কথা, কখনো বন্ধুর সঙ্গে মজা, কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই না করে কোনো তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, আবার কখনো অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কৌতূহল—এসবের কিছু ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর বিষয় হতে পারে। কোরআনে এমন কিছু আচরণ থেকে স্পষ্টভাবে নিষেধ করা হয়েছে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসেও এসব বিষয়ে কঠোর সতর্কতা এসেছে।

এর মধ্যে প্রথমটি হলো গিবত বা পরনিন্দা। কারও অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো দোষ বা বিষয় আলোচনা করা, যা সে শুনলে অপছন্দ করবে, সেটিই গিবতের অন্তর্ভুক্ত। অনেকেই এটিকে সাধারণ আড্ডা, গল্প কিংবা “সত্য কথাই তো বলছি” বলে হালকা করে দেখেন। অথচ কোরআনে আল্লাহ তাআলা গিবতকে অত্যন্ত কঠিন উদাহরণের মাধ্যমে নিষেধ করেছেন। সুরা হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, কেউ যেন অন্যের গিবত না করে এবং এটিকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

গিবতের ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কথাটি সত্য হলেও তা গিবত হতে পারে। আর যদি কারও সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলা হয়, তাহলে সেটি আরও গুরুতর অন্যায়ের মধ্যে পড়ে। তাই বন্ধুবান্ধবের আড্ডায়, অফিসে, পারিবারিক আলোচনায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যে অন্যের ব্যক্তিগত দুর্বলতা নিয়ে কথা বলার আগে সতর্ক হওয়া দরকার।

দ্বিতীয় যে গুনাহকে অনেকেই গুরুত্ব দেন না, সেটি হলো চোগলখুরি বা নামিমাহ। একজনের কথা আরেকজনের কাছে এমনভাবে পৌঁছে দেওয়া, যার ফলে তাদের মধ্যে বিরোধ, সন্দেহ বা শত্রুতা সৃষ্টি হতে পারে, তা নামিমাহর অন্তর্ভুক্ত। অনেক সময় মানুষ বলে, “আমি তো শুধু কথাটা জানালাম”—কিন্তু সেই কথা জানানো যদি সম্পর্ক নষ্ট করে বা মানুষের মধ্যে বিরোধ তৈরি করে, তাহলে বিষয়টি আর সাধারণ কথাবার্তা থাকে না। সহিহ বুখারির হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দুই ব্যক্তির শাস্তির কথা উল্লেখ করেন; তাদের একজন নামিমাহ করত।

তৃতীয়টি হলো যাচাই না করে কথা বা খবর ছড়িয়ে দেওয়া। বর্তমান যুগে এই গুনাহের সুযোগ আরও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো পোস্ট দেখেই শেয়ার করা, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনেই অন্যকে বলা কিংবা “শুনেছি” ধরনের তথ্য যাচাই ছাড়াই ছড়িয়ে দেওয়া অনেকের কাছে স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু কোরআনে সুরা নূরের ১৫ নম্বর আয়াতে এমন কথাকে তুচ্ছ মনে করার বিরুদ্ধে সতর্ক করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মানুষ মুখে এমন কথা বলছিল যার কোনো জ্ঞান তাদের ছিল না এবং তারা সেটিকে হালকা মনে করেছিল, অথচ আল্লাহর কাছে তা ছিল গুরুতর।

চতুর্থটি হলো উপহাস করা ও অন্যকে ছোট করা। কাউকে তার চেহারা, শরীর, পোশাক, আর্থিক অবস্থা, শিক্ষা, পেশা, উচ্চারণ বা কোনো দুর্বলতা নিয়ে হাসাহাসি করা অনেকের কাছে নিছক মজা। কিন্তু কোরআনে একে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। সুরা হুমাজাহর শুরুতেই আল্লাহ তাআলা নিন্দাকারী ও বিদ্রূপকারীর ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মজা করার উদ্দেশ্য থাকলেও অন্য মানুষ অপমানিত হলে সেটিকে হালকা করে দেখা ঠিক নয়। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তির শারীরিক বৈশিষ্ট্য বা এমন কোনো বিষয় নিয়ে হাসাহাসি করা, যা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তা মানুষের মর্যাদাকে আঘাত করে। ইসলাম মানুষের সম্মান রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে।

পঞ্চমটি হলো অহংকার ও অন্যকে তুচ্ছ মনে করা। অহংকার অনেক সময় খুব সূক্ষ্মভাবে মানুষের মধ্যে ঢুকে যায়। বেশি টাকা, ভালো চাকরি, শিক্ষা, সৌন্দর্য, বংশ, সামাজিক অবস্থান কিংবা ধর্মীয় জ্ঞান—যেকোনো বিষয় নিয়ে মানুষ মনে করতে পারে সে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) অহংকারের সংজ্ঞা দিয়েছেন সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছ মনে করা হিসেবে। সহিহ মুসলিমে এসেছে, যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না—এ বক্তব্যের মাধ্যমে অহংকারের ভয়াবহতা বোঝানো হয়েছে।

তবে সুন্দর পোশাক পরা বা নিজের চেহারা-পরিচ্ছন্নতার প্রতি যত্ন নেওয়াকে অহংকার বলা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে যখন ভালো পোশাক ও ভালো জুতা পছন্দ করার বিষয়টি জিজ্ঞেস করা হয়, তখন তিনি পরিষ্কার করেছেন যে অহংকার হলো সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে তুচ্ছ করা।

ষষ্ঠটি হলো অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় খুঁজে বেড়ানো। কারও মোবাইল দেখা, ব্যক্তিগত মেসেজ পড়ার চেষ্টা করা, গোপন বিষয় অনুসন্ধান করা কিংবা অন্যের এমন বিষয় খুঁজে বের করা যা প্রকাশ্যে জানা নেই—অনেক সময় কৌতূহল থেকে মানুষ এসব করে থাকে। কিন্তু কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন, “তোমরা গুপ্তচরবৃত্তি করো না।” (সুরা হুজুরাত: ১২)।

বর্তমান সময়ে এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারও অনুমতি ছাড়া তার ফোন দেখা, ব্যক্তিগত ছবি বা কথোপকথন অন্যের কাছে পাঠানো কিংবা কারও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অনুসন্ধান চালানোকে শুধু “কৌতূহল” বলে বৈধ মনে করা ঠিক নয়। মানুষের গোপনীয়তা ও সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

সপ্তমটি হলো পবিত্রতার ব্যাপারে অবহেলা করা, বিশেষ করে প্রস্রাবের ছিটা থেকে শরীর ও কাপড়কে রক্ষা না করা। অনেক মানুষ বিষয়টিকে খুব ছোট মনে করেন। কিন্তু সহিহ হাদিসে এ ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুতর সতর্কতা এসেছে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেন, তাদের একজন প্রস্রাব থেকে নিজেকে যথাযথভাবে রক্ষা করত না এবং অন্যজন নামিমাহ করত।

এখানে বিষয়টি শুধু পরিচ্ছন্নতার নয়; নামাজের জন্য পবিত্রতা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীর বা কাপড়ে অপবিত্রতা লেগে থাকলে তা যথাযথভাবে পরিষ্কার করার ব্যাপারে সতর্ক হওয়া জরুরি। তাই টয়লেট ব্যবহারের পর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিকে কখনোই তুচ্ছ মনে করা উচিত নয়।

এই সাতটি বিষয়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, এগুলোর বেশিরভাগই মানুষের কথা, আচরণ ও দৈনন্দিন অভ্যাসের সঙ্গে জড়িত। গিবত করার সময় মানুষ অনেক সময় আনন্দ পায়, চোগলখুরি করার সময় নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, গুজব ছড়ানোর সময় মনে হয় শুধু একটি খবর জানানো হচ্ছে, আর কাউকে নিয়ে হাসাহাসি করার সময় সেটিকে নিছক বিনোদন হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, কোনো কাজকে ছোট মনে করার আগে দেখতে হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) সে কাজ সম্পর্কে কী বলেছেন।

এ কারণেই একজন মুমিনের জন্য নিজের প্রতিদিনের আচরণ পর্যালোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। আজ আমি কারও গিবত করেছি কি না, কারও ব্যক্তিগত বিষয় অন্যের কাছে বলেছি কি না, যাচাই না করে কোনো তথ্য ছড়িয়েছি কি না, কাউকে অপমান করেছি কি না, নিজের অবস্থান নিয়ে অহংকার করেছি কি না—এসব প্রশ্ন নিজেকে করা দরকার।

ভুল হয়ে গেলে হতাশ হওয়ারও কারণ নেই। আল্লাহ তাআলা তাওবার দরজা খোলা রেখেছেন। সুরা হুজুরাতের গিবতের আয়াতের শেষেও আল্লাহ নিজেকে তাওবা গ্রহণকারী ও পরম দয়ালু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাই কোনো গুনাহ বুঝতে পারলে তা ছেড়ে দেওয়া, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে পুনরায় না করার চেষ্টা করা উচিত। আর যদি কারও অধিকার নষ্ট হয়ে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি অনুযায়ী সেই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষতি সংশোধনের চেষ্টাও করতে হবে।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, বড় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার পাশাপাশি ছোট মনে হওয়া গুনাহ থেকেও সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ মানুষ অনেক সময় বড় অপরাধ থেকে দূরে থাকে, কিন্তু প্রতিদিনের কথাবার্তা ও আচরণের মাধ্যমে অজান্তেই এমন কাজে জড়িয়ে পড়ে যা আল্লাহর কাছে গুরুতর। তাই নিজের জিহ্বা, চোখ, কান, হাত ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করা একজন মুমিনের দৈনন্দিন আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

গুনাহ শুধু বড় অপরাধের নাম নয়। গিবত, চোগলখুরি, যাচাইহীন কথা ছড়ানো, উপহাস, অহংকার, অন্যের গোপনীয়তা অনুসন্ধান এবং পবিত্রতার ব্যাপারে অবহেলার মতো বিষয় থেকেও নিজেকে বাঁচাতে হবে। আজ থেকেই নিজের কথাবার্তা ও আচরণ একটু খেয়াল করুন—হয়তো এমন কোনো অভ্যাস আছে, যেটিকে আপনি এতদিন গুনাহই মনে করেননি।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page