রাজ্জাক নেই ৯ বছর, তবু বাংলা চলচ্চিত্রে শেষ হয়নি তাঁর রাজত্ব

বিনোদন প্রতিনিধি
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ৮:০৮ অপরাহ্ণ
রাজ্জাক নেই ৯ বছর, তবু বাংলা চলচ্চিত্রে শেষ হয়নি তাঁর রাজত্ব

নায়করাজ রাজ্জাকের প্রয়াণের নয় বছর পরও বাংলা চলচ্চিত্রে অমলিন তাঁর স্মৃতি ও অবদান।

রাজা নেই, সিংহাসন আছে। রাজ্যও আছে, নেই সেই রাজকীয় উপস্থিতি। দেখতে দেখতে নায়করাজ রাজ্জাকহীন নয়টি বছর পার হয়ে গেল। অথচ বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা যেন সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়েছে। পর্দায় তাঁর হাসি, সংলাপ, অভিব্যক্তি কিংবা কোনো গানের দৃশ্য সবকিছুতেই আজও ফিরে আসে বাংলা চলচ্চিত্রের এক স্বর্ণালি সময়ের স্মৃতি।

আজ ২১ আগস্ট নায়করাজ রাজ্জাকের নবম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৭ সালের এই দিনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কিংবদন্তি এই অভিনেতা। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তাঁর মৃত্যুতে শুধু একজন জনপ্রিয় নায়ককে হারায়নি দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গন; হারিয়েছে এমন একজন শিল্পীকে, যিনি প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে অভিনয়, নির্মাণ ও প্রযোজনার মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন।

রাজ্জাকের চলচ্চিত্রজীবন শুধু একজন নায়কের সাফল্যের গল্প নয়। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় দর্শকের সামনে নতুনভাবে ধরা দিয়েছিল। ষাটের দশকের মাঝামাঝি ঢাকাই চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন দর্শকের প্রিয় মুখ। এরপর একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমায় অভিনয় করে নিজের অবস্থানকে নিয়ে যান অনন্য উচ্চতায়।

নায়ক হিসেবে রাজ্জাকের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর অভিনয়ের স্বাভাবিকতা। রোমান্টিক চরিত্রে যেমন তিনি দর্শককে মুগ্ধ করেছেন, তেমনি সামাজিক ও পারিবারিক গল্পেও তাঁর অভিনয় পেয়েছে প্রশংসা। তাঁর সংলাপ বলার ধরন, চোখের অভিব্যক্তি এবং চরিত্রের আবেগকে ধারণ করার ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে রাজ্জাক ও কবরীর জুটি বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁদের অভিনীত বহু সিনেমা দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। পর্দায় তাঁদের রসায়ন বাংলা চলচ্চিত্রের রোমান্টিক জুটির অন্যতম জনপ্রিয় উদাহরণ হয়ে আছে। একইভাবে শাবানা, ববিতা, সুচন্দা, সুজাতা ও অন্যান্য জনপ্রিয় অভিনেত্রীর সঙ্গেও রাজ্জাকের জুটি দর্শকের কাছে প্রশংসিত হয়েছে।

শুধু অভিনয়েই থেমে থাকেননি নায়করাজ। সময়ের সঙ্গে তিনি নির্মাতা ও প্রযোজক হিসেবেও কাজ করেছেন। চলচ্চিত্র নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব অনেক শিল্পীকে অনুপ্রাণিত করেছে। নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি তিনি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদেরও সুযোগ করে দিয়েছেন।

রাজ্জাকের অভিনয়জীবনের দীর্ঘ পথচলায় অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা এসেছে তাঁর ঝুলিতে। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননাসহ বিভিন্ন স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত দর্শকের ভালোবাসা। কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও তাঁর অভিনীত সিনেমা, চরিত্র ও গান নিয়ে দর্শকের আগ্রহই প্রমাণ করে সেই ভালোবাসার গভীরতা।

২০১৭ সালের ২১ আগস্ট তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। সহকর্মী, নির্মাতা, শিল্পী ও সাধারণ দর্শক—সবাই হারানোর বেদনা প্রকাশ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি প্রজন্মের চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়েরও যেন সমাপ্তি ঘটে।

তবে শিল্পীর মৃত্যু তাঁর সৃষ্টির সমাপ্তি নয়। রাজ্জাকের ক্ষেত্রেও সেটিই সত্য। তাঁর অভিনীত সিনেমাগুলো এখনো টেলিভিশনে প্রচারিত হয়, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দর্শক দেখে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর অভিনয়ের দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে। নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও তাঁর অভিনয় পরিচিত হয়ে উঠছে পুরোনো সিনেমার মাধ্যমে।

আজ তাঁর নবম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই প্রশ্নটি শুধু তাঁকে কত বছর আগে হারিয়েছি, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো—এত বছর পরও কেন তিনি দর্শকের মনে এতটা জীবন্ত? উত্তরটি হয়তো তাঁর অভিনয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। তিনি যে চরিত্রগুলো পর্দায় সৃষ্টি করেছিলেন, সেগুলো সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়নি; বরং নতুন দর্শকের কাছে নতুন করে আবিষ্কৃত হয়েছে।

নায়করাজ রাজ্জাক নেই, কিন্তু তাঁর অভিনয় আছে, তাঁর সিনেমা আছে, আছে অগণিত দর্শকের স্মৃতি। তাই বাংলা চলচ্চিত্রের সেই ‘রাজা’ শারীরিকভাবে না থাকলেও তাঁর রাজত্ব এখনো অটুট। তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়েই তিনি বারবার ফিরে আসেন একটি সংলাপে, একটি হাসিতে, একটি দৃশ্যে কিংবা কোনো পুরোনো সিনেমার পর্দায়।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page