সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বিদ্যুৎ দিতে পারছে না সরকার

reporter
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ২:৪৪ অপরাহ্ণ
সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বিদ্যুৎ দিতে পারছে না সরকার

বিদ্যুৎ সংকটে বাড়ছে লোডশেডিং

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে তার অর্ধেকের কাছাকাছি চাহিদাও পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ খাত। গ্যাস সংকট, কয়লাভিত্তিক পায়রা কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়া, ভারত থেকে আদানি বিদ্যুতের সরবরাহ হ্রাস এবং ব্যয়বহুল তেলচালিত কেন্দ্র পর্যাপ্তভাবে চালানোর মতো আর্থিক সক্ষমতার অভাবে সারা দেশে লোডশেডিং বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রামাঞ্চলের মানুষ।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দিবাগত রাত ১টায় দেশে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। ওই সময় ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় মাত্র ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ২৩ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) হিসাব বলছে, সোমবার ২৪ ঘণ্টায় গড় চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৪০৩ মেগাওয়াট এবং গড় লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৭২২ মেগাওয়াট। পরিমাণের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়েছে ঢাকা অঞ্চলে, আর ঘণ্টার হিসাবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি ছিল সিলেট, ময়মনসিংহ ও খুলনা অঞ্চলে। চট্টগ্রামে এদিন উল্লেখযোগ্য লোডশেডিং হয়নি।

আগস্টের শুরু থেকেই পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। ৩ আগস্ট সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট, পরদিন তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। মঙ্গলবার দুপুরেও ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে। অথচ তিন সপ্তাহ আগেও পরিস্থিতি এতটা খারাপ ছিল না। ২১ জুলাই মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার দিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল মাত্র ৪৮৮ মেগাওয়াট। সেই তুলনায় বর্তমান সর্বোচ্চ লোডশেডিং সাত গুণেরও বেশি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান সংকটের মূল কারণ জ্বালানি ঘাটতি এবং অর্থ ও ডলারের সংকট। বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, কিন্তু চালানোর মতো পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা ও তেল নেই। আবার তেলচালিত কেন্দ্র বেশি চালালে পিডিবির লোকসান ও সরকারের ভর্তুকির চাপ আরও বাড়বে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি গ্যাস। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বর্তমানে সেগুলো থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ। কিছুদিন আগেও এই উৎপাদন ছিল সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি।

সংকটের বড় ধাক্কা আসে ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর। দুর্ঘটনার আগে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট, যা পরে নেমে আসে প্রায় ২১৪ কোটি ঘনফুটে। টার্মিনাল আংশিক চালু হলেও এখনো আগের অবস্থায় ফেরেনি। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর গ্যাস সরবরাহও প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট থেকে কমে ৭০ কোটি ঘনফুটের আশপাশে নেমে আসে।

এর মধ্যেই নতুন চাপ তৈরি হয়েছে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে আমদানি করা একটি এলএনজি কার্গো সময়মতো টার্মিনালে যুক্ত হতে না পারায় গ্যাস সরবরাহ আবার কমে যায়। কয়েক দিন আগে ২৩৫ কোটি ঘনফুটে উঠলেও তা আবার প্রায় ২১০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে।

গ্যাসের ঘাটতি বাড়ায় এখন ভরসা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। দেশে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ৯৪৫ মেগাওয়াট, কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট। পায়রা কেন্দ্রের একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণে যাওয়ায় উৎপাদন কমে যায়। পরে ধীরে ধীরে বাড়ানো হলেও কেন্দ্রটির বিপুল বকেয়া নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সময়মতো বিল পরিশোধ না হলে কয়লা সরবরাহেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র থেকেও সরবরাহ কমেছে। স্বাভাবিক সময়ে বাংলাদেশে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এলেও এখন তা ৮০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমিত। প্রতিকূল আবহাওয়া ও কয়লা সরবরাহ সমস্যাকে এর কারণ হিসেবে জানিয়েছে আদানি কর্তৃপক্ষ।

রামপাল কেন্দ্রেও উৎপাদন কমেছে এবং বড়পুকুরিয়া কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুটি কারিগরি সমস্যায় বন্ধ রয়েছে। ফলে কয়লার ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েও প্রত্যাশিত বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।

এই ঘাটতি সামাল দিতে তেলচালিত কেন্দ্র চালানো হচ্ছে, কিন্তু এর ব্যয় অত্যন্ত বেশি। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ কয়েক গুণ বেশি। ফলে সন্ধ্যায় চাহিদা বেশি থাকলে উৎপাদন বাড়ানো হলেও গভীর রাতে অনেক কেন্দ্রের উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে মধ্যরাতের পরও লোডশেডিং বাড়ছে।

পিডিবির কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। তেলভিত্তিক বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর পাওনাই প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। বকেয়া না পাওয়ায় অনেক কেন্দ্র নতুন করে জ্বালানি কিনতে সমস্যায় পড়ছে। সীমিত জ্বালানি মজুত নিয়ে তারা উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে।

এর মধ্যেই গত জুনে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯.৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে ১৬.৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তবে বাড়তি আয়ের পরও বিপুল বকেয়া পুরোপুরি পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি।

বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি সাময়িকভাবে কিছুটা সহনীয় থাকলেও গরম বাড়লে সংকট আরও তীব্র হতে পারে। কারণ বৃষ্টির কারণে চাহিদা কিছুটা কম রয়েছে। তাপমাত্রা বাড়লে চাহিদা দ্রুত বেড়ে যাবে, তখন গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page