ব্যবসার মূল উদ্দেশ্যই হলো মুনাফা অর্জন। তবে সেই মুনাফা কতটুকু হওয়া উচিত, একজন ব্যবসায়ী কত শতাংশ লাভ করতে পারবেন এবং ইসলাম এ বিষয়ে কোনো সীমা নির্ধারণ করেছে কি না—এসব প্রশ্ন অনেকের মনেই আসে।
ইসলাম ব্যবসাকে বৈধ ও উৎসাহিত করেছে। তবে মুনাফা অর্জনের ক্ষেত্রেও ন্যায়, সততা এবং মানবিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে মুনাফা শুধু অর্থ উপার্জনের বিষয় নয়, বরং এটি নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গেও জড়িত।
আরও পড়ুন- মুদারাবা কী? ইসলামে যৌথ ব্যবসার এই পদ্ধতির ১০ গুরুত্বপূর্ণ শর্ত
ব্যবসা ও মুনাফার পরিচয়
ইসলামী পরিভাষায় ব্যবসা হলো কোনো বৈধ পণ্য বৈধ পদ্ধতিতে ক্রয় করে তা বৈধ উপায়ে মুনাফার জন্য বিক্রি করা, শর্ত হলো পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে উভয়ের সম্মতি ও সন্তুষ্টি থাকবে।
আর মুনাফা বলা হয়, মূল্যের সেই অতিরিক্ত অংশ, যা ক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি হয়। শরিয়তে ব্যবসা তথা মুনাফায় পণ্য বিক্রি করা বৈধ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৭৫)
ব্যবসার উদ্দেশ্যই মুনাফা
ব্যবসা করার মূল উদ্দেশ্যই হলো মুনাফা করা।
পবিত্র কোরআনের আয়াত থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘তারাই হেদায়েতের বিনিময়ে ভ্রান্তি ক্রয় করেছে। সুতরাং তাদের ব্যবসা লাভজনক হয়নি, তারা সৎপথেও পরিচালিত নয়।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৬)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে, নামাজ আদায় করে, আমি তাদেরকে যে জীবিকা দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারাই আশা করে এমন ব্যবসার, যার ক্ষয় নেই।’
(সুরা : ফাতির, আয়াত : ২৯)
ব্যবসায় সম্মতি আবশ্যক
পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের সম্মতি আবশ্যক, বিশেষত যখন তার সঙ্গে বিক্রেতার মুনাফার প্রশ্ন জড়িত থাকে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না, কিন্তু তোমাদের পরস্পর সন্তুষ্ট হয়ে ব্যবসা করা বৈধ। আর তোমরা পরস্পরকে হত্যা কোরো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।’(সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)
মুনাফা আল্লাহর অনুগ্রহ
ব্যবসায় মুনাফা করা বা ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা অনুসন্ধান করাকে আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আর আল্লাহর অনুগ্রহ অপরিসীম।
আল্লাহ এ ক্ষেত্রে কোনো সীমা নির্ধারণ করে দেননি। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নামাজ সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে, আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা : জুমা, আয়াত : ১০)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে দেশভ্রমণ করবে এবং কেউ কেউ আল্লাহর পথে সংগ্রামে লিপ্ত হবে।’ (সুরা : মুজ্জাম্মিল, আয়াত : ২০)
মুনাফার সীমা নির্ধারিত নয়
আল্লামা ইউসুফ আল কারজাভি (রহ.) বলেন, বেশির ভাগ আলেম এ বিষয়ে এক মত যে শরিয়ত ব্যবসা-বাণিজ্যে মুনাফার কোনো সীমা নির্ধারণ করে দেয়নি। সুতরাং একজন ব্যবসায়ী চাইলে ব্যবসায় শতভাগ লাভও করতে পারবে। তবে মালেকি মাজহাবের কোনো ইমাম বলেছেন, লাভের সীমা এক-তৃতীয়াংশে সীমাবদ্ধ থাকা উত্তম। যাঁরা লাভের সীমা নির্ধারিত নয় বলে মত দিয়েছেন, তাঁরা নিম্নোক্ত হাদিস দ্বারা প্রমাণ পেশ করেন। উরওয়া বারিকি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) একটি বকরি কিনে দেওয়ার জন্য তাঁকে একটি দিনার দিলেন। তিনি ওই দিনার দিয়ে দুটি বকরি কিনলেন। অতঃপর এক দিনার মূল্যে একটি বকরি বিক্রি করে দিলেন এবং নবী (সা.)-এর খিদমতে একটি বকরি ও একটি দিনার নিয়ে উপস্থিত হলেন। তা দেখে তিনি তার ব্যবসা-বাণিজ্যে বরকত হওয়ার জন্য দোয়া করলেন। অতঃপর তার অবস্থা এমন হলো যে ব্যবসার জন্য যদি মাটিও তিনি কিনতেন তাতেও তিনি লাভবান হতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৬৪২)
তবে নৈতিকতার সীমা রয়েছে
যদিও শরিয়ত মুনাফার নির্দিষ্ট হার নির্ধারণ করেনি, তবুও ইসলাম ব্যবসায় নৈতিকতার সীমা আরোপ করেছে।
বিশেষজ্ঞ আলেমদের মতে—
- নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে অতিরিক্ত লাভ করা অনুচিত
- সংকটকালে মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া যাবে না
- খাদ্যপণ্য ও জরুরি পণ্যে মানবিকতা বিবেচনা করতে হবে
- বিলাসপণ্যের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি লাভের সুযোগ রয়েছে
কখন সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?
ইসলামের সাধারণ নীতি হলো বাজারে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা চলবে এবং ব্যবসায়ীরা স্বাধীনভাবে মূল্য নির্ধারণ করবেন।
তবে যদি কোনো কারণে বাজার অস্বাভাবিক হয়ে যায়, কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় বা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে মূল্য চলে যায়, তাহলে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারে।
ইসলামি চিন্তাবিদ ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, জনস্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে সরকার ন্যায়সংগত মূল্য নির্ধারণ করতে পারে।
যেসব লাভ ইসলাম হারাম ঘোষণা করেছে
ইসলাম বৈধ মুনাফার অনুমতি দিলেও কিছু উপায়ে লাভ অর্জন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
১. হারাম পণ্যের ব্যবসা
মদ, জুয়া, মাদক বা শরিয়ত নিষিদ্ধ কোনো পণ্যের ব্যবসা থেকে অর্জিত লাভ হারাম।
২. প্রতারণার মাধ্যমে লাভ
পণ্যের ত্রুটি গোপন করে বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে লাভ করা বৈধ নয়।
৩. মজুদদারি
বাজারে সংকট সৃষ্টি করে অধিক লাভের আশায় পণ্য আটকে রাখা নিষিদ্ধ।
৪. সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি
ইচ্ছাকৃতভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে দাম বাড়ানো ইসলাম সমর্থন করে না।
৫. কালোবাজারি
অন্যায়ভাবে পণ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে অতিরিক্ত লাভ অর্জন করা হারাম।
ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ নীতি
ইসলাম ব্যবসায়ীকে লাভ করার স্বাধীনতা দিয়েছে, আবার একই সঙ্গে সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল থাকার নির্দেশও দিয়েছে।
তাই একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর লক্ষ্য হওয়া উচিত—বৈধ উপায়ে লাভ করা, ক্রেতার সঙ্গে সততা বজায় রাখা এবং মানুষের প্রয়োজনকে সম্মান করা। ইসলামের দৃষ্টিতে বরকতময় ব্যবসা শুধু বেশি লাভে নয়, বরং ন্যায় ও সততার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।
তথ্যসূত্রঃ পবিত্র কোরআন, সহিহ বুখারি, সুনানে আবি দাউদ, ইসলামি ফিকহ গ্রন্থ
আরও পড়ুন- মাত্র একবার পড়লেই বহু জিকিরের সমান সওয়াব, যে দোয়া শিখিয়েছিলেন রাসুল (সা.)










