বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল আর্থিক সেবা খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। দেশের অন্যতম মোবাইল অপারেটর বাংলালিংকের মূল কোম্পানি ভিওন (VEON) এবার রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটক, মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নগদ এবং সরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠান বিটিসিএলের সঙ্গে অংশীদারিত্ব বা বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে।
আরও পড়ুন-টেলিটক বিক্রি নয়, নতুন বিনিয়োগকারী খুঁজছে সরকার
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভিওন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে টেলিটকের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং নগদে বিনিয়োগ বা অধিগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে তারা বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালে নগদে বিনিয়োগ বা অধিগ্রহণের বিষয়ে ভিওন এবং নগদের মধ্যে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছিল। সে সময় প্রায় ১.৫২ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রস্তাবও আলোচনায় ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। যদিও এ বিষয়ে বাংলালিংক বা ভিওনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
সম্প্রতি নতুন সরকারের বিনিয়োগবান্ধব সংস্কার উদ্যোগের পর আবারও বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা সামনে এনেছে ভিওন। প্রতিষ্ঠানটি প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমানের কাছে একটি চিঠি দিয়ে বাংলাদেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগ পরিকল্পনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরেছে। একইসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের আগ্রহও প্রকাশ করেছে তারা।
চিঠিতে ভিওন উল্লেখ করেছে, দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করা, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল অর্থনীতির উন্নয়নে তারা বিভিন্ন কৌশলগত উদ্যোগে অংশ নিতে আগ্রহী। এর মধ্যে টেলিটকের সঙ্গে সমন্বিত কার্যক্রম এবং ডাক বিভাগের মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নগদে বিনিয়োগ বা অংশীদারিত্বের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলালিংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইওহান বুসে জানিয়েছেন, এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। তবে টেলিকম খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছে ভিওন। তিনি বলেন, গত ২১ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে তাদের প্রতিষ্ঠান। অনুকূল নীতিগত পরিবেশ পেলে স্বল্পমেয়াদে আরও ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করতে আগ্রহী তারা।
নগদে বিনিয়োগের বিষয়ে ভিওনের আগ্রহের একটি বড় কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির বিশাল গ্রাহকভিত্তিকে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে নগদের সক্রিয় গ্রাহক প্রায় ৪ কোটি এবং দৈনিক গড় লেনদেন প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা। এছাড়া নগদের ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সও রয়েছে, যা ভবিষ্যতে ডিজিটাল আর্থিক সেবার বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে টেলিটকের সঙ্গে অংশীদারিত্বের বিষয়ে ভিওনের যুক্তি হলো, বাংলালিংকের ব্যবসায়িক দক্ষতা এবং টেলিটকের অবকাঠামো ও স্পেকট্রাম সম্পদের সমন্বয় হলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দ্রুত নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ সম্ভব হবে। এতে অবকাঠামোগত ব্যয়ও কমবে এবং ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি আরও বাড়বে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালে টেলিটক ও বাংলালিংকের মধ্যে শুরু হওয়া ন্যাশনাল রোমিং ও নেটওয়ার্ক শেয়ারিং পাইলট প্রকল্পকে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে টেলিটক বিক্রির বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, টেলিটক বিক্রির কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। তবে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও শক্তিশালী করতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা চলছে।
সরকারের মতে, যদি ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ আনা যায়, তাহলে টেলিটককে দেশের বেসরকারি বড় অপারেটরগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তোলা সম্ভব হবে।
শুধু টেলিটক বা নগদ নয়, সরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠান বিটিসিএলের সঙ্গেও অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা খুঁজছে ভিওন। তাদের পরিকল্পনায় রয়েছে বিটিসিএলের ফাইবার নেটওয়ার্ক এবং বাংলালিংকের মোবাইল নেটওয়ার্ক ও টফি প্ল্যাটফর্মকে একত্র করে সমন্বিত ডিজিটাল সেবা চালুর সুযোগ তৈরি করা।
বিশ্লেষকদের মতে, ভিওনের এই আগ্রহ বাস্তবে রূপ পেলে বাংলাদেশের টেলিকম ও ফিনটেক খাতে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। একইসঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং ডিজিটাল সেবার মানোন্নয়নের সুযোগও তৈরি হবে।
তবে সবকিছুই নির্ভর করছে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার অগ্রগতির ওপর। ফলে টেলিটক, নগদ এবং ভিওনকে ঘিরে আগামী মাসগুলোতে দেশের প্রযুক্তি খাতে আরও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা দেখা যেতে পারে।
আরও পড়ুন-টেলিটক স্বাগতম প্যাকেজে ৬০ মিনিট, ৫ জিবি ডাটা ও কম কলরেট সুবিধা





