২১ কোটি টাকার যন্ত্র কিনেও মোবাইল সেবার মান নিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি বিটিআরসি

প্রকাশিত: 24-05-2026 5:20 AM
২১ কোটি টাকার যন্ত্র কিনেও মোবাইল সেবার মান নিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি বিটিআরসি

দেশের মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো গ্রাহকদের কতটা মানসম্মত সেবা দিচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণের জন্য প্রায় ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির একটি মনিটরিং সিস্টেম কিনেছিল বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। তবে চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মোবাইল সেবার মান নিয়ে কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেনি সংস্থাটি। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিয়ে।

আরও পড়ুন-স্টারলিংককে নন-ফিল্টারড ডেটা সুবিধা দিতে যাচ্ছে বিটিআরসি

কল ড্রপ, ভয়েস কোয়ালিটি, ইন্টারনেটের গতি এবং নেটওয়ার্ক কভারেজ পরিমাপের জন্য জার্মানি থেকে আনা এই সিস্টেমটি ২০২২ সালের ৬ নভেম্বর উদ্বোধন করা হয়। ঢাকার আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি কার্যালয়ে উদ্বোধনের সময় কমিশন জানিয়েছিল, নতুন এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মোবাইল অপারেটরদের সেবার মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং গ্রাহকদের আরও উন্নত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, এই সিস্টেম কিনতে খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ ইউরো, যা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকার সমান। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয়ে কেনা এই প্রযুক্তির কার্যকর ফল এখনো দেখেননি গ্রাহকেরা। বরং মোবাইল ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, কল ড্রপ, দুর্বল নেটওয়ার্ক ও ধীরগতির ইন্টারনেট এখনো নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে আছে।

নথিপত্র অনুযায়ী, গত চার বছরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত তিনটি বড় ‘ড্রাইভ টেস্ট’ বা মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা চালিয়েছে বিটিআরসি। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্কের মান যাচাই করা হয়। তবে পরীক্ষায় পাওয়া ফলাফল নিয়ে বিটিআরসি ও মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। অপারেটরগুলোর দাবি, বিটিআরসির তথ্যের সঙ্গে তাদের নিজস্ব পরীক্ষার ফলাফলের বড় পার্থক্য রয়েছে।

বিটিআরসি এখন বলছে, সেবার মান পরিমাপের পদ্ধতি ও সূচক নিয়ে অপারেটরদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। একটি অভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণের পর চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নিয়মিত ড্রাইভ টেস্ট পরিচালনা করে থাকে। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে কল ড্রপের হার, ভয়েস কোয়ালিটি, ইন্টারনেটের গতি এবং নেটওয়ার্ক কভারেজ যাচাই করা হয়। এতে শুধু সেবার মান নির্ধারণই নয়, কোন এলাকায় নেটওয়ার্ক দুর্বল এবং কোথায় উন্নয়ন প্রয়োজন, সেটিও শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

নতুন সিস্টেম ব্যবহারের পর প্রথম বড় ড্রাইভ টেস্ট চালানো হয় গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ জুন পর্যন্ত। ঢাকা সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ ও সাভার এলাকায় এ পরীক্ষা পরিচালনা করা হয়। এতে সেবার মানের প্রায় ৪০টি সূচক যাচাই করা হয়।

পরীক্ষায় দেখা যায়, দেশের শীর্ষ মোবাইল অপারেটরগুলোর মধ্যে বিভিন্ন সূচকে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৮ কোটি ৬০ লাখ মোবাইল গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮ কোটি ৫৫ লাখ গ্রাহক নিয়ে শীর্ষে রয়েছে গ্রামীণফোন। পরীক্ষায় তারা ছয়টি সূচকে ব্যর্থ হয়। প্রায় ৫ কোটি ৭৪ লাখ গ্রাহক থাকা রবি ব্যর্থ হয় পাঁচটি সূচকে। অন্যদিকে বাংলালিংক ১৪টি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটক ২৬টি সূচকে অকৃতকার্য হয়।

বিশেষ করে ইন্টারনেট সেবার মানদণ্ড পূরণে একমাত্র টেলিটক ব্যর্থ হয়েছে বলে পরীক্ষায় উঠে আসে। আবার ঢাকায় কল ড্রপের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে বাংলালিংক। কেরানীগঞ্জ ও সাভারে কল সেটআপ টাইম এবং ভয়েস সেবার মান নিয়েও সব অপারেটর সমস্যায় ছিল বলে জানা যায়।

তবে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরই আপত্তি তোলে মোবাইল অপারেটরগুলো। অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব)–এর মাধ্যমে তারা বিটিআরসির কাছে আপত্তি জানায়।

রবি এক বিবৃতিতে বলেছিল, ড্রাইভ টেস্টের ফলাফল নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে তারা আশাবাদী। অন্যদিকে গ্রামীণফোন জানায়, অপারেটরদের নিজস্ব ফলাফল এবং বিটিআরসির ফলাফলের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। তাই পরিমাপ পদ্ধতি নির্ধারণে বিটিআরসি, অ্যামটব এবং ড্রাইভ টেস্ট ভেন্ডরদের সমন্বয়ে কাজ চলছে।

এরপর আরও দুই দফা পরীক্ষা চালালেও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি বিটিআরসি। গত বছরের শেষের দিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচালিত এক পরীক্ষায় দেখা যায়, অপারেটরদের দাবিকৃত ফোর-জি কভারেজ এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।

টাঙ্গাইল, বগুড়া, গাইবান্ধা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও শেরপুরের বিভিন্ন শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিচালিত পরীক্ষায় পরিদর্শক দল দেখতে পায়, অনেক এলাকায় ফোর-জি সিগন্যাল খুবই দুর্বল কিংবা একেবারেই নেই। এছাড়া ঘন ঘন কল ড্রপ, ঘরের ভেতরে দুর্বল নেটওয়ার্ক এবং লোডশেডিংয়ের সময় নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ধরা পড়ে।

সবচেয়ে আলোচিত ফলাফল আসে চলতি বছরের ১৫ ও ১৬ এপ্রিল পরিচালিত সর্বশেষ পরীক্ষায়। এতে গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংক—তিন অপারেটরের ক্ষেত্রেই কল ড্রপের হার পাওয়া যায় ঠিক ২ দশমিক ৭০ শতাংশ। যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি। তবে আশ্চর্যজনকভাবে দীর্ঘদিন ধরে নেটওয়ার্ক দুর্বলতার অভিযোগ থাকা টেলিটকের কল ড্রপের হার দেখানো হয় শূন্য শতাংশ।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী বলেন, একই ধরনের ফলাফল কেন এসেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে চাই, যাতে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা যায়।”

এদিকে মোবাইল ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, বাস্তবে সেবার মান এখনো অনেক খারাপ। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকেরা জানিয়েছেন, ঘরের ভেতরে ঠিকমতো নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। কল ড্রপ এবং ধীরগতির ইন্টারনেটের সমস্যাও আগের মতোই রয়েছে।

ঢাকার বাসিন্দা মো. নাবিদ বলেন, “ঘন ঘন কল ড্রপ হয়। অনেক সময় আমি অপর প্রান্তের কথা শুনতে পাই, কিন্তু সে আমার কথা শুনতে পায় না। আবার কখনো দুজনই শুধু হ্যালো হ্যালো করতে থাকি।”

সার্কুলার রোডের বাসিন্দা নুমান আহমেদ জানান, তিনি রবি ও বাংলালিংক ব্যবহার করেন। কিন্তু ঘরের ভেতরে কোনো অপারেটরের নেটওয়ার্কই ঠিকভাবে কাজ করে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাসিন্দা শারমিন আহমেদ বলেন, প্রতি সপ্তাহেই তার দুই-তিনটি কল ড্রপ হয়। অনেক সময় বাধ্য হয়ে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে কল করেন, কিন্তু সেটিও সবসময় ভালোভাবে কাজ করে না।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারী জানিয়েছেন, বর্তমানে শিল্প খাত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে একটি অভিন্ন ও প্রমিত পরিমাপ পদ্ধতি তৈরির কাজ চলছে। মতপার্থক্য থাকায় এখনো ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। তবে শিগগিরই বিটিআরসির ওয়েবসাইটে ড্রাইভ টেস্টের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, “সিস্টেম চালুর চার বছর পরও চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে না পারাটা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতার অভাব তুলে ধরে।”

তিনি আরও বলেন, “জনগণের করের টাকায় এসব সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। তাই কেন সঠিকভাবে এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে না, তা তদন্ত হওয়া উচিত এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।”

সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার

আরও পড়ুন-ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের দাম কমালো বিটিআরসি, কম টাকায় বেশি স্পিড

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

📌 পোস্টটি শেয়ার করুন! 🔥

স্টাফ রিপোর্টার

স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে আমি 'টেক বাংলা নিউজ' (ssitbari.com)-এ নিয়মিত বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক ও আপডেটেড কনটেন্ট প্রকাশ করি। প্রযুক্তি, মোবাইল, গ্যাজেটসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় সহজ ও বোধগম্য ভাষায় পাঠকদের কাছে তুলে ধরা আমার লক্ষ্য। নির্ভরযোগ্য তথ্য, বিশ্লেষণ ও উপকারী টিপসের মাধ্যমে পাঠকদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করি।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now