যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি লটারি থেকে বাংলাদেশ বাদ পড়লো? কারণ ও বিস্তারিত

reporter
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৫, ৫:০০ অপরাহ্ণ
যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি লটারি থেকে বাংলাদেশ বাদ পড়লো? কারণ ও বিস্তারিত

যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি লটারিতে বাংলাদেশ কেন অযোগ্য

যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন অনেক বাংলাদেশির দীর্ঘদিনের। সেই স্বপ্ন পূরণের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম হলো ডাইভারসিটি ইমিগ্র্যান্ট ভিসা (Diversity Visa–DV) প্রোগ্রাম, যা সাধারণভাবে ডিভি লটারি নামে পরিচিত। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ বা গ্রিন কার্ড দেওয়া হয়।

তবে অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশি নাগরিকরা এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারছেন না। প্রতি বছর ডিভি লটারির নিবন্ধন শুরু হলেই একটি প্রশ্ন সবচেয়ে বেশি ওঠে—বাংলাদেশ কি আবার ডিভি লটারিতে ফিরেছে, নাকি এখনো বাদ রয়েছে? যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনো ডিভি লটারি কর্মসূচির জন্য অযোগ্য দেশের তালিকায় রয়েছে।

ডিভি লটারি মূলত এমন দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য চালু করা হয়েছে, যেসব দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের মধ্যে বৈচিত্র্য বজায় রাখা। তাই যেসব দেশ থেকে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করেছেন, সেসব দেশের নাগরিকদের এই কর্মসূচির বাইরে রাখা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন অনুযায়ী, কোনো দেশ থেকে নির্ধারিত সময়ে প্রায় ৫০ হাজার বা তার বেশি ব্যক্তি নির্দিষ্ট অভিবাসন শ্রেণিতে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে প্রবেশ করলে সেই দেশকে পরবর্তী ডিভি কর্মসূচির জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা হতে পারে। এই মানদণ্ডের কারণেই বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ডিভি লটারির বাইরে রয়েছে।

বাংলাদেশ প্রথমবার ২০১৩ সালের পর ডিভি কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ে। এরপর থেকে প্রতি অর্থবছর প্রকাশিত যোগ্য ও অযোগ্য দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম অযোগ্য দেশের মধ্যেই রয়েছে। সর্বশেষ ডিভি-২০২৬ কর্মসূচির নির্দেশনাতেও বাংলাদেশকে অযোগ্য দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের পাশাপাশি আরও কয়েকটি দেশ বর্তমানে ডিভি লটারিতে অংশ নিতে পারে না। এর মধ্যে রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, চীন (হংকংসহ), দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, ব্রাজিল, কানাডা, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া, জ্যামাইকা, ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, হাইতি, ডোমিনিকান রিপাবলিক, এল সালভাদর, হন্ডুরাসসহ আরও কয়েকটি দেশ। এসব দেশ থেকেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীর সংখ্যা নির্ধারিত সীমার বেশি হওয়ায় তারা ডিভি কর্মসূচির বাইরে রয়েছে।

অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ায় ভবিষ্যতেও আর কখনো ডিভি লটারিতে আবেদন করা যাবে না। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। কোনো দেশের যোগ্যতা স্থায়ীভাবে বাতিল হয় না। যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর অভিবাসনের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে নতুন তালিকা প্রকাশ করে। ভবিষ্যতে যদি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের সংখ্যা নির্ধারিত সীমার নিচে নেমে আসে এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ হয়, তাহলে বাংলাদেশ আবারও যোগ্য দেশের তালিকায় ফিরে আসতে পারে।

তবে একটি বিষয় অনেকেই জানেন না। কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশে বসবাস করলেও নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে তিনি ডিভি লটারির জন্য যোগ্য হতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, যদি আবেদনকারীর জন্ম এমন একটি দেশে হয়ে থাকে, যা ডিভি কর্মসূচির জন্য যোগ্য, অথবা আইনে বর্ণিত বিশেষ ‘চার্জেবিলিটি’ (chargeability) নিয়ম প্রযোজ্য হয়, তাহলে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে। তবে এটি নির্ভর করে আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনের ওপর।

ডিভি লটারিতে অংশ নিতে না পারলেও বাংলাদেশিদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার একাধিক বৈধ পথ এখনো খোলা রয়েছে। দক্ষ পেশাজীবীরা কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসার মাধ্যমে আবেদন করতে পারেন। উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থী ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে পরবর্তীতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বা বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা নিকটাত্মীয় থাকলে পরিবারভিত্তিক অভিবাসনের সুযোগ রয়েছে। বিনিয়োগের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে বিনিয়োগভিত্তিক অভিবাসনের পথও খোলা রয়েছে।

ডিভি লটারি নিয়ে প্রতি বছরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ভুয়া বিজ্ঞাপন ও প্রতারণার ঘটনা দেখা যায়। অনেক ওয়েবসাইট বা ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ে ডিভি লটারিতে আবেদন করিয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণা করে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ডিভি লটারির আবেদন শুধুমাত্র সরকারি নির্ধারিত অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয় এবং আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সব তথ্য সেখানেই প্রকাশ করা হয়। তাই অচেনা ব্যক্তি, দালাল বা অননুমোদিত ওয়েবসাইটে কোনো ধরনের অর্থ বা ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিভি লটারি না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে যাওয়ার অন্যান্য পথ নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়াই বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত। ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা বৃদ্ধি, উচ্চশিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক মানের কর্মসংস্থানের যোগ্যতা তৈরি করলে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে অভিবাসনের সুযোগ অনেকটাই বাড়ে।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের ডিভি লটারি কর্মসূচিতে বাংলাদেশ এখনো অযোগ্য দেশের তালিকায় রয়েছে। এর মূল কারণ হলো গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অভিবাসীর সংখ্যা নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে। ফলে বর্তমানে বাংলাদেশি নাগরিকরা সাধারণ নিয়মে ডিভি লটারিতে আবেদন করতে পারছেন না। তবে পরিস্থিতি পরিবর্তন হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আবারও যোগ্য দেশের তালিকায় ফিরে আসতে পারে। ততদিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য বৈধ কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা বা পরিবারভিত্তিক অভিবাসনের সুযোগগুলোই বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন