কম বয়সে চুল পাকার পেছনে কোন ভিটামিন দায়ী?
ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি অল্প বয়সে চুল পাকার অন্যতম কারণ হতে পারে।
একসময় মানুষের ধারণা ছিল, বয়স বাড়লেই চুল সাদা হবে। সাধারণত ৪০ বা ৫০ বছরের পর চুল পাকা স্বাভাবিক বলে ধরা হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। এখন ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী অনেক তরুণ-তরুণীর মাথায়ও সাদা চুল দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি শুধু সৌন্দর্যগত পরিবর্তন নয়; অনেক ক্ষেত্রেই এটি শরীরের ভেতরে কোনো পুষ্টিগত ঘাটতি বা স্বাস্থ্যগত সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, অল্প বয়সে চুল পাকার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি হলো ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি। এই ভিটামিন শরীরে রক্ত তৈরি, স্নায়ুতন্ত্র সচল রাখা এবং চুলের গোড়ায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন শরীরে ভিটামিন বি১২-এর মাত্রা কমে যায়, তখন চুলের রঙ নির্ধারণকারী রঞ্জক পদার্থ মেলানিন উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। ফলে চুল সময়ের আগেই ধূসর বা সাদা হয়ে যেতে শুরু করে।
ভারতের চিকিৎসক ডা. শালিনী সিং সালুঙ্কে-সহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মতে, ভিটামিন বি১২-এর অভাবকে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ এটি শুধু চুল পাকার জন্য দায়ী নয়; দীর্ঘদিন ঘাটতি থাকলে ক্লান্তি, দুর্বলতা, হাত-পায়ে ঝিনঝিন ভাব, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, এমনকি স্নায়বিক জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
তবে শুধু ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতিই নয়, অল্প বয়সে চুল পাকার পেছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে। যেমন—বংশগত বৈশিষ্ট্য, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, ধূমপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, দূষণ, থাইরয়েডের সমস্যা এবং শরীরে আয়রন, কপার, ফলেট বা ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি। তাই কারও চুল যদি হঠাৎ দ্রুত সাদা হতে শুরু করে, তাহলে শুধু প্রসাধনী ব্যবহার না করে এর প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
চুলের রঙ নির্ভর করে মেলানোসাইট নামের বিশেষ কোষের ওপর। এই কোষগুলো মেলানিন তৈরি করে, যা চুলকে কালো, বাদামি বা অন্যান্য স্বাভাবিক রঙ দেয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেলানিন উৎপাদন কমে যায়, তাই চুল ধীরে ধীরে সাদা হয়। কিন্তু যদি কম বয়সেই এই কোষগুলোর কার্যকারিতা কমে যায়, তাহলে অকালেই চুল পেকে যেতে পারে।
এখানেই ভিটামিন বি১২-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ভিটামিন লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে সহায়তা করে। চুলের গোড়ায় রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ কমে গেলে সেখানে থাকা কোষগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে মেলানিন উৎপাদনও ধীরে ধীরে কমে যায়। তাই যাদের শরীরে দীর্ঘদিন ধরে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি থাকে, তাদের মধ্যে অকালপক্কতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
বর্তমান জীবনযাত্রাও এ সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। অনেকেই সকালে নাশতা বাদ দেন, ফাস্টফুড বেশি খান, পর্যাপ্ত ফলমূল ও পুষ্টিকর খাবার খান না। আবার দীর্ঘ সময় জেগে থাকা, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং অনিয়মিত জীবনযাপনও শরীরের পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট করে। এর ফলে শুধু চুল নয়, ত্বক, নখ এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা দীর্ঘদিন নিরামিষভোজী, তাদের মধ্যে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। কারণ এই ভিটামিনের প্রধান উৎস হলো প্রাণিজ খাবার। ডিম, মাছ, মাংস, কলিজা, দুধ, দই, পনির এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত খাবারে ভিটামিন বি১২ প্রচুর পরিমাণে থাকে। অন্যদিকে কঠোর নিরামিষভোজীদের জন্য ফর্টিফায়েড সিরিয়াল, ফর্টিফায়েড সয়া দুধ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হতে পারে।
অনেকেই মনে করেন, চুল সাদা হতে শুরু করলেই কালার বা ডাই ব্যবহার করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বাস্তবে এটি কেবল বাহ্যিক পরিবর্তন আনে; কিন্তু শরীরের ভেতরের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করে না। তাই চুল অকালেই সাদা হতে শুরু করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজন হলে রক্তে ভিটামিন বি১২-এর মাত্রা পরীক্ষা করা উচিত।
অনেকেই মনে করেন, ভিটামিন বি১২-ই একমাত্র কারণ যার অভাবে চুল অল্প বয়সে পেকে যায়। বাস্তবে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। চিকিৎসকদের মতে, ভিটামিন বি১২ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও শরীরে আয়রন, কপার, ফলেট, জিংক, ভিটামিন ডি এবং প্রোটিনের ঘাটতিও চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও রঙের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এসব পুষ্টি উপাদান চুলের গোড়া শক্ত রাখতে এবং নতুন কোষ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই দীর্ঘদিন অপুষ্টিতে ভুগলে বা একঘেয়ে খাদ্যাভ্যাস থাকলে চুলের রঙ ও গুণগত মান উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে তরুণদের মধ্যে ফাস্টফুড, কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। অন্যদিকে শাকসবজি, ফল, ডাল, মাছ, ডিম ও দুধের মতো পুষ্টিকর খাবার অনেকেই নিয়মিত খান না। ফলে শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি তৈরি হয়। এর প্রভাব প্রথমে চুল, ত্বক ও নখে দেখা দিতে পারে।
শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, মানসিক চাপও অকালে চুল পাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের উদ্বেগ, অতিরিক্ত কর্মচাপ বা পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবে শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই স্ট্রেস চুলের রঞ্জক কোষের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে মেলানিন উৎপাদন হ্রাস পায় এবং চুল ধীরে ধীরে সাদা হতে শুরু করে।
ধূমপান আরেকটি বড় ঝুঁকির কারণ। সিগারেটের ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান রক্তনালিকে সংকুচিত করে, যার ফলে চুলের গোড়ায় অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছানো কমে যায়। বিভিন্ন গবেষণায় ধূমপায়ীদের মধ্যে অকালে চুল পাকার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।
চিকিৎসকদের মতে, অল্প বয়সে হঠাৎ অনেক চুল সাদা হতে শুরু করলে সেটিকে শুধু সৌন্দর্যের সমস্যা হিসেবে না দেখে স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ অনেক সময় থাইরয়েডের সমস্যা, রক্তস্বল্পতা, অটোইমিউন রোগ বা ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি এর পেছনে কাজ করতে পারে। তাই প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করানো উচিত।
ভিটামিন বি১২-এর অভাবের আরও কিছু লক্ষণ
চুল পাকার পাশাপাশি ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতিতে আরও কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন—
- সবসময় ক্লান্ত লাগা ।
- দুর্বলতা ।
- মাথা ঘোরা ।
- হাত-পায়ে ঝিনঝিন অনুভূতি ।
- স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া ।
- মনোযোগের ঘাটতি ।
- জিহ্বা লাল হয়ে যাওয়া ।
এসব উপসর্গের এক বা একাধিক দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
কোন খাবারে সবচেয়ে বেশি ভিটামিন বি১২ পাওয়া যায়?
স্বাভাবিক খাদ্য থেকেই অধিকাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় ভিটামিন বি১২ পেতে পারেন। যেমন—
- গরু ও খাসির কলিজা ।
- সামুদ্রিক মাছ ।
- ইলিশ, রুই, কাতলা ও অন্যান্য মাছ ।
- ডিম ।
- মুরগির মাংস ।
- গরুর মাংস ।
- দুধ ।
- দই ।
- পনির ।
যারা নিরামিষভোজী, তারা ফর্টিফায়েড সিরিয়াল, ফর্টিফায়েড সয়া দুধ ও নিউট্রিশনাল ইস্ট খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। তবে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চুল ভালো রাখতে কী করবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু একটি ভিটামিন খেলেই চুলের সব সমস্যা দূর হবে না। বরং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সে জন্য—
- প্রতিদিন সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
- নিয়মিত ৭–৮ ঘণ্টা ঘুমান।
- মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন।
- ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান এড়িয়ে চলুন।
- প্রয়োজন ছাড়া বারবার চুলে কেমিক্যাল ব্যবহার করবেন না।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট খাবেন না।
অকালে চুল পাকা কি পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব?
চিকিৎসকদের মতে, যদি কারণটি বংশগত হয়, তাহলে সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব নাও হতে পারে। তবে যদি পুষ্টির ঘাটতি, জীবনযাপনের সমস্যা বা অন্য কোনো চিকিৎসাযোগ্য কারণ থাকে, তাহলে সময়মতো ব্যবস্থা নিলে চুলের আরও ক্ষতি কমানো সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করলে নতুন গজানো চুল তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, বাজারে প্রচলিত অনেক তেল, শ্যাম্পু বা হারবাল পণ্য অকালে চুল পাকা বন্ধ করার দাবি করলেও এর পক্ষে সবসময় শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কারণ নির্ণয় করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
সবশেষে বলা যায়, অল্প বয়সে চুল পেকে যাওয়া শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়; অনেক সময় এটি শরীরের ভেতরে চলতে থাকা পুষ্টিগত ঘাটতি বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যসমস্যার সংকেত হতে পারে। বিশেষ করে ভিটামিন বি১২-এর অভাব এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সমস্যাটি অবহেলা না করে প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করানো, সুষম খাদ্য গ্রহণ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!
