সুন্দরবনে জেলেদের নতুন আতঙ্ক, ‘চাঁদার কার্ড’ না থাকলেই টার্গেটের অভিযোগ

প্রকাশিত: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:১৫ অপরাহ্ণ
সুন্দরবনে জেলেদের নতুন আতঙ্ক, ‘চাঁদার কার্ড’ না থাকলেই টার্গেটের অভিযোগ

সুন্দরবনে জেলে অপহরণের ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সুন্দরবনে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বনদস্যুদের তৎপরতা। দস্যুদের কথিত চাঁদার ‘কার্ড’ না থাকলেই জেলেদের টার্গেট করা হচ্ছে—এমন অভিযোগের মধ্যেই মাত্র দুই দিনে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ২১ জেলেকে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। অস্ত্রের মুখে জেলেদের তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলের জেলে, মহাজন ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

সর্বশেষ শনিবার রাতে পূর্ব সুন্দরবনের ভাঙ্গা, আমবাড়ীয়া, নারিকেলবাড়ীয়া ও ঝাপসি এলাকার ভদ্রা নদীতে পৃথকভাবে এসব অপহরণের ঘটনা ঘটে। এর আগে একই সময়ে সুন্দরবনের আরও কয়েকটি এলাকা থেকে ছয় জেলেকে অপহরণ করা হয় বলে জানা গেছে।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ রেজাউল করিম চৌধুরী অপহরণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাতে সাগরসংলগ্ন ভাঙ্গা, আমবাড়ীয়া ও নারিকেলবাড়ীয়া এলাকায় মাছ ধরার সময় অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র ব্যক্তিরা জেলেবহরে হামলা চালায়। বিভিন্ন নৌকা থেকে ১৫ জেলেকে জোরপূর্বক একটি ট্রলারে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। শরণখোলা রেঞ্জের দুবলা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মিল্টন রায় এ তথ্য জানিয়েছেন।

অপহৃত ১৫ জনের মধ্যে ১২ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন—খুলনার আরিফ (২৫), সগীর (৩৪), মিঠু (৩০) ও ফেরদাউস (২৮); বরগুনার পাথরঘাটা ও তালতলী এলাকার ইব্রাহিম (৩৫), ইমরান (২৫), মোস্তাফিজুর (৩৫), আলামিন (২৮), হানিফ (৩৮) ও মারুফ (৪৯)। এছাড়া মোংলার উলুকাটা চিলা এলাকার মাসুদ ইজারদার (২৮) ও ইমদাদুল ইজারদার (৩০) রয়েছেন।

বন বিভাগের অনুমতিপত্র বা ‘পাশ’ নিয়েই এসব জেলে সুন্দরবনের খালে চরপাটা, পোকা জাল ও বড়শি দিয়ে মাছ ধরছিলেন বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

তবে স্থানীয় জেলে-মহাজনদের অভিযোগ, সুন্দরবনে মাছ ধরার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে দস্যুদের কথিত চাঁদার নতুন ব্যবস্থা। তাদের দাবি, নির্ধারিত চাঁদা পরিশোধের ‘কার্ড’ থাকা নৌকাগুলো তুলনামূলকভাবে নিরাপদে চলাচল করতে পারলেও কার্ডবিহীন নৌকার জেলেদের টার্গেট করা হচ্ছে। অনেক মহাজন প্রতি ‘গোনে’ প্রায় ৫ হাজার টাকা করে চাঁদা দিয়ে কথিত ওই কার্ড সংগ্রহ করেন বলেও তারা দাবি করেছেন।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, কার্ড না থাকা জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মোংলার এক জেলে মহাজন জানান, শনিবার রাতে কথিত করিম-শরীফ বাহিনীর সদস্যরা ঝাপসি এলাকার ভদ্রা নদী থেকে মাসুদ ও ইমদাদুলকে তুলে নিয়ে যায়। একইভাবে মেহেরআলী এলাকা ও শ্যালা নদীর মুখসহ আরও কয়েকটি স্থান থেকে কথিত ‘বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী’র সদস্যরা জেলেদের জিম্মি করে নিয়ে গেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

পরপর অপহরণের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—সুন্দরবনে দীর্ঘদিন পর দস্যু তৎপরতা আবার কীভাবে সংগঠিত হচ্ছে এবং কারা এর নেপথ্যে রয়েছে। বিশেষ করে বন বিভাগের বৈধ ‘পাশ’ নিয়ে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ডিএফও মোহাম্মদ রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, ঘটনার পরপরই বিষয়টি এসআরবি, কোস্টগার্ড ও বন প্রতিমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়েছে। অপহৃত জেলেদের দ্রুত ও নিরাপদে উদ্ধারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এদিকে জেলে-মহাজনদের দাবি, শুধু উদ্ধার অভিযান নয়, সুন্দরবনে দস্যুদের কথিত চাঁদাবাজি ও অপহরণের পুরো চক্র শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে দস্যু আতঙ্কে সুন্দরবনে মাছ ধরার স্বাভাবিক কার্যক্রম আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page