রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট দিচ্ছে সরকার

প্রকাশিত: রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২:০৫ অপরাহ্ণ
রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট দিচ্ছে সরকার

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট দিচ্ছে সরকার

৩১৭

সৌদি আরব–এর বিভিন্ন শহরে অবস্থানরত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৭ হাজার ৩৯৪ জন রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট প্রদান করা হয়েছে, আর আরও ৫১ হাজার ৬৯৮ জনকে পাসপোর্ট দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত আইনি ও নীতিগত প্রশ্নে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন-পাসপোর্ট ভিসা জালিয়াতিতে বাংলাদেশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ড ইউনূসের সতর্কবার্তা

কতজন রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে

সরকারি সূত্র জানায়, চলমান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে—

  • ১৭ হাজার ৩৯৪ জন রোহিঙ্গার হাতে ইতোমধ্যে পাসপোর্ট হস্তান্তর করা হয়েছে।

  • ২০ হাজার ৯৯০ জনের পাসপোর্ট বর্তমানে প্রিন্ট পর্যায়ে রয়েছে।

  • ২১ হাজার ৬৪৮ জনের বায়োমেট্রিক সম্পন্ন হয়েছে।

  • ফি পরিশোধ না করায় ১৪১ জনের পাসপোর্ট প্রিন্ট আটকে আছে।

প্রথম দফায় ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১৮ হাজার রোহিঙ্গার হাতে পাসপোর্ট হস্তান্তর করা হয়। এসব পাসপোর্টের তথ্য সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছেও সরবরাহ করা হয়েছে।

কেন এই সিদ্ধান্ত নিতে হলো সরকারকে

সরকারি একাধিক সূত্র জানায়, মূলত সৌদি সরকারের কূটনৈতিক চাপেই রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এগোতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ। এই সিদ্ধান্তের সূচনা হয় আগের সরকারের সময়েই, তবে সরকারবিরোধী আন্দোলনের কারণে প্রক্রিয়াটি থেমে যায়।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সৌদি দূতাবাস বিষয়টি নিয়ে পুনরায় সক্রিয় হয় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে পাসপোর্ট প্রদানের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়।

কী ধরনের পাসপোর্ট পাচ্ছেন রোহিঙ্গারা

সূত্র জানায়, রোহিঙ্গারা একটি বিশেষ ক্যাটাগরির পাসপোর্ট পেয়েছেন। তবে সেটি ঠিক কোন আইনি শ্রেণিভুক্ত—তা সরকারিভাবে স্পষ্ট করা হয়নি। পাসপোর্টের পাশাপাশি প্রত্যেককে একটি করে ট্রাভেল ডকুমেন্ট দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে তারা সৌদি আরব ছাড়াও অন্য দেশ ভ্রমণ করতে পারবেন।

নাগরিকত্ব না দিয়েই কি পাসপোর্ট সম্ভব

এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় ধোঁয়াশা। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন স্পষ্ট করে বলেছেন, সৌদি সরকারের অনুরোধে ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে পাসপোর্ট দেওয়া হলেও তাদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না।

কিন্তু আইন বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন—
নাগরিকত্ব ছাড়া কি বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়া সম্ভব
জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্ম সনদ ছাড়া কোন আইনি প্রক্রিয়ায় পাসপোর্ট ইস্যু করা হলো

এ বিষয়ে সরকার এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতামত কী বলছে

পাসপোর্ট ও অভিবাসন সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করা একাধিক বিশেষজ্ঞ বলছেন, বাংলাদেশে স্পেশাল পাসপোর্ট নামে আলাদা কোনো ক্যাটাগরি নেই। বাংলাদেশি পাসপোর্ট মানেই আন্তর্জাতিকভাবে ওই ব্যক্তিকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে সরাসরি পাসপোর্ট না দিয়ে ট্রাভেল পারমিট বা আইডেন্টিটি সার্টিফিকেট দেওয়া যেত। এটি পাসপোর্ট নয়, তবে ভ্রমণের জন্য ব্যবহারযোগ্য এবং শরণার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ডকুমেন্ট। এতে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতা এড়ানো সম্ভব হতো।

সৌদিতে রোহিঙ্গা সংকট ও বাংলাদেশের ওপর চাপ

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পরিচয় ব্যবহার করে সৌদি আরবে যান। অনেকে সেখানে গিয়ে পাসপোর্ট হারান বা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আর নবায়ন করতে পারেননি।

ফলে তারা অনিয়মিত হয়ে পড়েন এবং কেউ কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। এতে সৌদি কর্তৃপক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে বাংলাদেশকে জানায়—
রোহিঙ্গাদের দ্রুত পাসপোর্ট না দিলে সৌদিতে বৈধভাবে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকদেরও ফেরত পাঠানো হতে পারে।

এই হুমকির পরই ঢাকায় একটি কূটনৈতিক নোট পাঠানো হয় এবং বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

সরকারের অবস্থান

চাপের কথা স্বীকার করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, দেশের স্বার্থ বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে পাসপোর্ট দেওয়া মানেই নাগরিকত্ব দেওয়া নয়।

অন্যদিকে, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এটিএম আবু আসাদ বলেন, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নতুন নয় এবং বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে চান না।

উপসংহার

সৌদি আরবে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত কূটনৈতিক বাস্তবতার ফল হলেও এটি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইন ও শরণার্থী নীতির ক্ষেত্রে এক বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। নাগরিকত্ব ছাড়া পাসপোর্ট দেওয়ার বিষয়টি সরকার স্পষ্ট না করলে ভবিষ্যতে এটি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ক্ষেত্রেই জটিলতা তৈরি করতে পারে—এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তথ্যসূত্র-mzamin.com

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page