দুর্গাপূজার প্রতিমায় ফুটে ওঠে দেবীর রূপ, বছরের বাকি সময় কৃষিশ্রমিক কারিগরেরা

প্রকাশিত: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:১৬ অপরাহ্ণ
দুর্গাপূজার প্রতিমায় ফুটে ওঠে দেবীর রূপ, বছরের বাকি সময় কৃষিশ্রমিক কারিগরেরা

দুর্গাপূজার প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত কুড়িগ্রামের প্রতিমাশিল্পীরা।

শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে কুড়িগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমাশিল্পীরা। বাঁশ, খড়, দড়ি ও মাটির নিপুণ কারুকাজে ধীরে ধীরে প্রাণ পাচ্ছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। পূজামণ্ডপে দেবীর নান্দনিক রূপ ফুটিয়ে তুলতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রম করছেন তাঁরা। তবে উৎসবের এই বর্ণিল আয়োজনের আড়ালে রয়েছে প্রতিমাশিল্পীদের কঠিন জীবনসংগ্রাম, মৌসুমি আয় এবং বছরের অধিকাংশ সময় কৃষিশ্রমিক হিসেবে জীবনযাপনের বাস্তবতা।

সরেজমিনে ফুলবাড়ীসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার প্রতিমাশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বছরে মাত্র দুই থেকে তিন মাস তাঁদের কাজের চাপ থাকে। বছরের বাকি সময় জীবিকার তাগিদে অধিকাংশ শিল্পীকেই কৃষিকাজ বা অন্যের জমিতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতে হয়। প্রায় সব কারিগরই একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

ফুলবাড়ী উপজেলার প্রতিমাশিল্পী শ্রী তপন চন্দ্র মালি এ বছর ১০টি প্রতিমা তৈরি করেছেন। প্রতিটি প্রতিমা ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তিনি জানান, একটি প্রতিমা তৈরি করতে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। প্রতিটি প্রতিমার কাজে ১৫ থেকে ১৬ জন শ্রমিক অংশ নেন, ফলে পূজার মৌসুমে স্থানীয় অনেক মানুষেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

তপন চন্দ্র মালি বলেন, “প্রতিমা তৈরির কাজ বছরে কয়েক মাসই থাকে। পূজার মৌসুম শেষ হলে আবার কৃষিকাজে ফিরে যেতে হয়। এ কাজই আমাদের ঐতিহ্য, তাই কষ্ট হলেও ধরে রেখেছি।”

একই উপজেলার আরেক প্রতিমাশিল্পী শ্রী শ্যামল চন্দ্র এ বছর ৯টি প্রতিমা তৈরি করেছেন। তিনি জানান, গত বছরের তুলনায় মাটি, বাঁশ, খড়, রংসহ প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও বিক্রিমূল্য সেই অনুপাতে বাড়েনি।

তিনি বলেন, “ভালো মানের শক্ত মাটি কিনে আনতে হয়। একটি প্রতিমা তৈরি করতে প্রায় ১২ দিন সময় লাগে। সব খরচ বাদ দিলে প্রতিটিতে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকার মতো লাভ থাকে। কাজ শেষ হলে আবার কৃষিকাজ কিংবা অন্যের জমিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেই সংসার চালাতে হয়।”

নতুন প্রজন্মের কাছে এই শিল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন শ্যামল চন্দ্র। তিনি বলেন, “আমাদের সন্তানরাও যদি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই ঐতিহ্য টিকে থাকবে।”

স্থানীয়দের মতে, প্রতিমা নির্মাণ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের প্রস্তুতি নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। মৌসুমি এই শিল্পকে ঘিরে কয়েক মাসের জন্য বহু শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়। কিন্তু উৎসব শেষ হওয়ার পর সেই কর্মসংস্থান আর থাকে না। তখন অধিকাংশ কারিগর কৃষিশ্রমিক হিসেবে নতুন করে জীবনসংগ্রামে নামেন।

পূজামণ্ডপে যখন আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে দেবী দুর্গার প্রতিমা, তখন দর্শনার্থীদের চোখে ধরা পড়ে শিল্পের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে প্রতিমাশিল্পীদের দীর্ঘ পরিশ্রম, সীমিত আয়, অনিশ্চিত জীবিকা এবং শত প্রতিকূলতার মধ্যেও শতবর্ষের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার এক নীরব সংগ্রামের গল্প।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!

👍 আমাদের অফিসিয়াল Facebook Page